কথিত রয়েছে,জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকাকে স্বাধীন করেছেন, আব্রাহাম লিংকন দিয়েছেন গণতন্ত্রের ভিত্তি, আর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকাকে সত্যিকারের সভ্যতার পথে নিয়ে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই কৃষ্ণাঙ্গরা পেয়েছে শ্বেতাঙ্গদের সমান নাগরিক অধিকার, আর শ্বেতাঙ্গ সমাজ মুক্তি পেয়েছে বর্ণবাদের অভিশপ্ত অহংকার থেকে। তিনি না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি অংশ হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক বর্ণবাদী ব্যবস্থার মতোই রয়ে যেত।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের জন্ম ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায়। তাঁর বাবা মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র ও মা আলবার্টা উইলিয়ামস কিং উভয়েই ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সমাজসচেতন মানুষ। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল মাইকেল লুথার কিং, পরবর্তীতে তাঁর কিশোর বয়সে তিনি নিজেই এই নাম পালটে বাবার নাম অনুসারে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র রাখেন। কিং ছিলেন একজন ব্যাপটিস্ট যাজক, মানবাধিকার কর্মী এবং আফ্রিকান-আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্টের অবিসংবাদিত নেতা। খ্রিস্টান বিশ্বাস থেকে অনুপ্রাণিত অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমেই তিনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলেন।
শৈশব থেকেই বর্ণবাদের নির্মম বাস্তবতা তাঁকে স্পর্শ করে। ছোটবেলায় এক শ্বেতাঙ্গ বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার ঘটনাই তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। অসাধারণ মেধাবী কিং দুইবার শ্রেণি লাফিয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মোরহাউস কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি লাভ করেন।
১৯৫৪ সালে তিনি ডেক্সটার অ্যাভিনিউ ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক হিসেবে দায়িত্ব নেন। যদিও শুরুতে তিনি যাজক হতে চাননি, তবু এখান থেকেই নাগরিক অধিকার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় নেতৃত্বের সূচনা হয়। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘মার্চ অন ওয়াশিংটন ফর জব অ্যান্ড ফ্রিডম’এ লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে দেওয়া তাঁর “I Have a Dream” ভাষণ মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃত।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কারণে তাঁকে জীবনে ২৯ বার কারাবরণ করতে হয়। তবুও অহিংস পথ থেকে তিনি একচুলও সরে যাননি। ১৯৬৪ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে অহিংস আন্দোলন ও বিশ্বশান্তিতে অবদানের জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।
১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মেম্ফিসে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তাঁর মৃত্যু আন্দোলন থামাতে পারেনি বরং তাঁর আদর্শ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
আজ মার্টিন লুথার কিং শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি চেতনা। নোবেল পুরস্কার নয়, মানবতার বিজয়ই ছিল তাঁর জীবনের চূড়ান্ত স্বপ্ন, যে স্বপ্ন আজও পৃথিবীকে পথ দেখায়।



সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









