সরকার বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় যেভাবে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, তা এখন জাতির কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। তবে বিকল্প পরিকল্পনা ও সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা দেখার জন্য জনগণের হাতে অপেক্ষা করার মতো বেশি সময়ও নেই।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর ইতোমধ্যে ছয় মাস পার হয়েছে। এই সময়ে জনগণের দাবি, জনস্বার্থ, মানুষের অধিকার, দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে ১১ দলীয় ঐক্য কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ও চেতনা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার ও বিচারের যে দাবি উঠেছিল, সংসদে ১১ দলের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই এসব বিষয়ে ভূমিকা রেখে আসছেন। সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত জানতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। জনগণের দেওয়া সেই রায় সরকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকার শুরুতেই জনগণের রায় উপেক্ষা করেছে অভিযোগ করে হামিদুর রহমান বলেন, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে যে শপথ নেওয়ার কথা ছিল, সেটিও উপেক্ষা ও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তার মতে, এটি গণতন্ত্রের ওপর চপেটাঘাত এবং গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা।
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও তেল সংকটের কথা তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, জ্বালানি সংকটের কারণে সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকরাও সমস্যায় পড়েছেন।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিষয়টি সংসদে আলোচনার জন্য তোলা হলেও সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সরকার কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সংকট মোকাবিলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ১০টি প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার সেগুলোর কোনোটি আমলে নেয়নি।
বরং তেল সংকটের অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অথচ নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি না করা। এখানেও সরকার তাদের কমিটমেন্ট রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান।
গ্যাস সংকটের প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা বলেন, গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় ১২০০ বেকারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর এসেছে।
তিনি বলেন, তারা বিজিএমইএ সভাপতির সঙ্গেও দেখা করেছেন। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা পরিচালনা করা যাচ্ছে না। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এর প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। অর্ডার বাতিল হয়ে গেলে তা পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে হামিদুর রহমান বলেন, ইন্টারিম সরকারের সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ে অনেক সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য আরও দ্রুত বেড়েছে।
বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, বাজার মনিটরিং এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫১৮টি শিশু অপহরণের মামলা হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
এ সময় রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে নিজ বাসায় হত্যার ঘটনা উল্লেখ করেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত নানা ঘটনার পাশাপাশি বিরোধী দলের ওপর হামলার অভিযোগও তুলে ধরেন। এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বহরে হামলা এবং জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া একটি স্কুল কমিটি দখল করতে গিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকার দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধের কথা বললেও বাস্তবে এর কোনোটি বন্ধ হয়নি বলে মন্তব্য করেন হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি বলেন, এক কথায় দেশের জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে এবং মানুষ নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে দেশে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।
এই সংকট সমাধানে রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে সমবেতভাবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সরকার বিরোধী দলের কোনো প্রস্তাবই আমলে নিচ্ছে না।
সংসদে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ১১ দলীয় ঐক্য রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
হামিদুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে প্রথম লংমার্চ শেষ হয়েছে। সেখানে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মানুষের সাড়া পাওয়া গেছে।
আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সকাল ৭টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জমায়েত হবে। সকাল ৮টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার উদ্বোধনী সভা শেষে লংমার্চ শুরু হবে। পথে পাঁচটি পথসভা হবে। এরপর রংপুর জেলা স্কুল মাঠে গিয়ে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, ১১ দলের ছয় দফা দাবি এখন সাত দফায় রূপান্তরিত হয়েছে। দেশে দুর্নীতি প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চলছে এবং দুর্নীতি, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণে নতুন করে এ দাবি যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচার দৃশ্যমান করার দাবিও রয়েছে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হওয়া লংমার্চ গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধা হয়ে রংপুরে গিয়ে শেষ হবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাগপার প্রধান মুখপাত্র ও সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, নেজামে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল মিয়াজী, এবি পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন, বিডিপির মহাসচিব নাঈম নিজামুদ্দিন নাঈম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইউসুফ আলীসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









