ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জন করে প্রথমবারের মতো সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাওয়া নিম্নকক্ষের পাশাপাশি উচ্চকক্ষেও বাজিমাত দলটির। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুললেও ফলাফল মেনে নিয়ে কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে। অপরদিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি জোট। সবঠিক থাকলে আগামীকাল মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। আর নতুন এই মন্ত্রিসভাকে চাপে রাখতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট!
জানা গেছে, নির্বাচন পরবর্তী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ও ১১ দলের শীর্ষ নেতারা আলাদা আলাদা বৈঠক করে। এতে নির্বাচন পরবর্তী বিরোধী দলের ভূমিকায় ১১ দলের অবস্থান কেমন হবে? সংসদ এবং মাঠে তারা কি ভূমিকা রাখবে। সরকারের সাথে কেমন সম্পর্ক হবে। নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির বিষয়ে আইনিভাবে কিভাবে মোকাবিলা করবে।
এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। অবশ্য শনিবার রাতেই নিজের ফেসবুক পেইজে এ তথ্য জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ- ২ (দিরাই শাল্লা) আসন থেকে নির্বাচন করে হেরে যাওয়া জামায়াত ইসলামীর আলোচিত প্রার্থী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করব ইনশাআল্লাহ। একই কথা জানিয়েছেন, ঢাকা-১৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) ও জামায়াত নেতা মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) তার ফেসবুক পোস্টেও ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠনের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও একই কথা জানিয়েছেন। গতকাল রোববার সকালে ফেসবুকের এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এখনো সংসদ সদস্যদের শপথ হয়নি। সরকার মন্ত্রিসভা গঠন করেনি। সংবিধানের অনেক কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জনের বিষয় রয়েছে। ধীরে ধীরে এসব হোক। পরে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সবকিছুই হবে। জামায়াত এবং এনসিপির একাধিক নেতা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তাদের ব্যক্তিগত মতামত। দলীয় সিদ্ধান্ত নয়, তা হলে মিডিয়াকে অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে।
জানা গেছে, ওয়েস্টমিন্সটার সরকার পদ্ধতির ছায়া মন্ত্রিসভা এবারই প্রথম বাংলাদেশে গঠিত হতে যাচ্ছে। জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের শরিকরাও এ মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন। থাকবেন টেকনোকেট কয়েকজন সদস্য।
এতে নেতৃত্ব দেবেন দলের আমির শফিকুর রহমান অথবা নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। এ মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের (কুমিল্লা-১১), নায়েবে আমীর মো. মুজিবুর রহমান (রাজশাহী-১), সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪), নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সাইফুল আলম মিলন (ঢাকা-১২), শাহজাহান চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালী-২), সৈয়দ জয়নুল আবেদীন (ঢাকা-৪), মো. আব্দুল বাতেন (ঢাকা-১৬), ব্যারিস্টার মো. মাহবুবুল আলম (কুড়িগ্রাম-৩), মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান (পাবনা-১), শেখ মনজুরুল হক (রাহাদ) , মো. গোলাম রছুল (যশোর-৪), মো. আবুল কালাম আজাদ (খুলনা-৬), মো. রুহুল আমিন (চুয়াডাঙ্গা-২), মো. মতিয়ার রহমান (ঝিনাইদহ-৩), মীর আহমাদ বিন কাসেম (ঢাকা-১৪), আলফারুক আব্দুল লতীফ (নীলফামারী-২), মো. কামরুল হাসান (ময়মনসিংহ-৬), মো. গোলাম রব্বানী (রংপুর-৫), মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ (শেরপুর-১), মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক (সাতক্ষীরা-২)।
এছাড়াও নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত ৩ জন টেকনোকেট কোটায় ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন। তারা হলেন- দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনালের হামিদুর রহমান আজাদ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। ছায়া মন্ত্রিসভায় ১১ দলীয় জোটের শরীক থেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। এছাড়াও খেলাফত মজলিশের আমীর মাওলানা মামুনুল হক ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থান পাবে বলে জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা এবং তালিকা চূড়ান্ত নয়। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার আকার ও পরিধি দেখেই জামায়াত জোট তাদের ছায়া মন্ত্রিসভার আকার নির্ধারণ করবে।
জানা গেছে, ছায়া মন্ত্রিসভা হচ্ছে ওয়েস্টমিন্সটার সরকার পদ্ধতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এখানে সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার নেতৃত্বে বিরোধী দল থেকে একদল জ্যৈষ্ঠ সদস্য একটা মন্ত্রিসভা গঠন করেন যেটা সরকারের মন্ত্রিসভার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এখানে, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রীর বিপরীতে একজন ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য থাকেন যিনি সরকারের মন্ত্রীদের কাজকে বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োজনে বিকল্প পথ তুলে ধরেন। অধিকাংশ দেশে ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যকে ছায়া মন্ত্রী বলা হয়ে থাকে। একজন ছায়া মন্ত্রীর কাজের পরিধি তাকে দল ও সমর্থকের কাছে প্রসিদ্ধ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যদি তিনি উচ্চ পদস্থ কোন দফতরে কাজ করেন। অবশ্য, ছায়া মন্ত্রীরা বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পান না। কিন্ত জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে যে সুবিধা পাওয়ার সেটাই পেয়ে থাকেন। একজন ছায়া মন্ত্রীর দল ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে তিনি যেই দফতরের ছায়া মন্ত্রী ছিলেন, সেই দফতর নাও পেতে পারেন।
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন জোট-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির প্রদর্শন করেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হওয়া এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জোটগত হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত। বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে এবং জোটগতভাবে ২১২টিতে জয় পেয়েছে। তবে ৬৮টি আসনে জামায়াতের একক জয় দলটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কারণ, ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে পেয়েছিল ৩টি আসন।
১৯৯১ সালে ১৮টি, ২০০১ সালে ১৭টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। সে তুলনায় এবারের ফল দলের জন্য ঐতিহাসিক মোড়। ১৭ বছর পর জামায়াত নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গড়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও জোটগত ৭৭ আসন প্রাপ্তিকে জামায়াতের বড় উত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। জামায়াতে ইসলামী অতীতে রাজধানী ঢাকায় একটি আসনও পায়নি।
কিন্তু এবার ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছে—ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬। এ ছাড়া জোটের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে। এ ছাড়া ঢাকার আরও পাঁচটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭—এই আসনগুলোতে জামায়াত বা জোটের প্রার্থীরা হেরেছেন কম ভোটের ব্যবধানে। এর মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে ৩ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে আর ঢাকা-৭ আসনে ৬ হাজার ১৮৩ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক আসনে হারলেও দলটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









