সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, “জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি দেওয়া হবে না।”
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে ১১ দলীয় ঐক্যের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় জোটের সমন্বয়ক ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জুনায়েদসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, “সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের পরিবর্তে জুলাই জাতীয় সনদে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংস্কার করতে হবে। সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিএনপির উদ্যোগে বিশেষ কমিটি গঠনের শুরু থেকেই ১১ দলীয় ঐক্য এর বিরোধিতা করে আসছে।”
তিনি বলেন, “বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনার সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও এর বিরোধিতা করেছিলেন। সংস্কারের পথ এড়িয়ে সংশোধনের নামে এই কমিটি গঠনকে কনসেপচুয়ালি প্রত্যাখ্যান করছি।”
সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগটি চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই আলোচনায় ছিল। ২৯ এপ্রিল সরকারদলীয় পক্ষ থেকে এ ধরনের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে বিরোধী দল থেকে সদস্য না দেওয়ায় ১৩ জুলাই ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
গোলাম পরওয়ার জানান, বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে ১১ দলীয় ঐক্য ওই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
তিনি বলেন, “১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে ধারণাগতভাবে সমর্থন না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফাতেও সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম এবং গণভোটেরও লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ও সংবিধানের সংস্কার। তাই এখন ওই প্রক্রিয়া থেকে সরে শুধু সংসদীয় সংশোধনের পথে যাওয়া উচিত নয়।”
গোলাম পরওয়ার বলেন, “২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, বৈধ ভোটের ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে। ওই গণভোটে জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছিল।”
তার ভাষ্য, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে মত দেয়নি; বরং সংস্কার বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকেও অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’এ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জাতীয় সংসদের সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়েছে।”
গোলাম পরওয়ারের দাবি, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। একই সময়ে জামায়াত ও তাদের শরিক দলগুলোর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ওই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের প্রস্তাব তাদের দেওয়া হয়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও ওই পরিষদের শপথ নেওয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, “জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে একই প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংসদ বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে গঠিত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের ক্ষমতার ভিত্তি জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা বা ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’।”
তিনি বলেন, “সংবিধান সংসদ সৃষ্টি করে, সংসদ সংবিধান সৃষ্টি করে না।”
রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ উল্লেখ করে বলেন, “জনগণ গণভোটের মাধ্যমে যদি একটি নির্দিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়া অনুমোদন করে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা উচিত।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









