সরকার গঠনের মাত্র ৬ দিনের মাথায় ৬ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগের ঘটনায় রাজনীতির মাঠে নতুন আলোচনা-সমালোচনা এখন তুঙ্গে। ‘গণতান্ত্রিকভাবে’ নির্বাচিত বিএনপি সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে একে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবেই দেখছে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল হওয়া জামায়াতে ইসলামী। দলটি মনে করছে, সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের অকল্পনীয় উত্থান দেখে সামনের যেকোনো বড় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ মনে করেই বিএনপি কৌশলে এখন এ ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটছে। বিশেষ করে তারা বর্তমান সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ায় গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের মতোই ভোটবিহীন পন্থায় ক্ষমতায় থাকার পথ বেছে নিচ্ছে বলেও মনে করছে জামায়াত।
জানা গেছে, দায়িত্ব নেয়ার পরপরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘যত দ্রুত সম্ভব’ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বিএনপি মহাসচিবের কথার তিন দিনের মাথায়ই তারই দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উনয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি করপোরেশন-১ শাখা) থেকে গত রোববার রাতে নতুন প্রশাসকদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয়।
এতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আগের প্রশাসকদের সরিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যাদের সবাই বিএনপির নেতা। বিএনপি তড়িঘড়ি করে ছয় সিটিতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের সমালোচনা করে সোমবারই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ছয় সিটি কর্পোরেশনে সরকারদলীয় পদধারীদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। এটি নৈতিকভাবে অত্যন্ত গর্হিত এবং জনগণের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল।
তিনি বলেন, সরকারের এ পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং একই সঙ্গে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ। এজন্য দলটির পক্ষ থেকে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মন্তব্য করে প্রশাসক হিসেবে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল করে অনতিবিলম্বে সিটি কর্পোরেশনসহ সর্বস্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি করা হয়।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশন আইনে বলা ছিল, মেয়র পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটি করপোরেশনের মেয়ররা পলাতক কিংবা আত্মগোপনে চলে গেলে প্রশাসক বসান অন্তর্বর্তী সরকার। এসব প্রশাসক বসানোকে বৈধতা দেয়ার জন্য অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/উপজেলা পরিষদ কিংবা ইউপি প্রশাসকদের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ নেই। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো জাতীয় সংসদে অনুমোদন দেয়ার আগে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল হালিম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘নতুন সংসদের অধিবেশন ও কার্যক্রম শুরুর আগেই ক্ষমতাসীন সরকার আগের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই বিনা ভোটের পথে হাঁটছে। তারাও জনগণের মতামতকে ভয় পেয়ে ভিন্ন পথে জনপ্রতিনিধি বানানোর পথ খুঁজছে। ছয় সিটি করপোরেশনে বিএনপি দলীয় ছয় নেতাকে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে তারা সেটিই প্রমাণ করেছে।’ জনগণকে সাথে নিয়ে বিএনপির নতুন এ ‘ষড়যন্ত্র’কে রুখে দেয়া হবে মন্তব্য করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, এ নিয়োগ বাতিলে আমরা দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সরকার যদি আমাদের এ দাবি আমলে না নেয় তাহলে প্রয়োজনীয় সব করনীয় শিগগিরই জানানো হবে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েই সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়রদের পদচ্যুত করেছিল। এরপর প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে ‘প্রশাসক’ নিয়োগ দেয়া। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর এখন ‘রাজনৈতিক’ প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হলো। এর মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ডেপুটি মেয়র আবদুস সালামকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি এখন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন। এ ছাড়া তিনি সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ডিএসসিসির প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় শাহজাহান মিয়াকে। গত নভেম্বরে এ পদে নিয়োগ পান মো. মাহমুদুল হাসান। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাহমুদুল হাসানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ডিএসসিসির প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম।
একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খানকে। শফিকুল ইসলাম খান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিএনসিসির মেয়র ছিলেন আতিকুল ইসলাম। ২০১৯ সালে তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন তিনি। এরই প্রেক্ষিতে অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্তির পর এ মাসের শুরুর দিকে সুরাইয়া আখতার জাহানকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব। নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এখন এ পদে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন শফিকুল ইসলাম খান। একইভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে খুলনা সিটি করপোরেশন, গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকারকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ও যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসভাপতি আবদুল কাইয়ুুম চৌধুরীকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ সবগুলো সিটিতেই নিজেদেও দলীয় প্রার্থী দিতে কাজ শুরু করেছে জামায়াত। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিজেদের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকে বিকল্প রেখে দলটি তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর প্রাথমিক প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করেছে বলে জানা গেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









