মেক্সিকো ও দক্ষিণ টেক্সাসের নদীগুলোতে বসবাসকারী একটি ছোট মাছ দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে আসছে। ‘অ্যামাজন মলি’ নামে পরিচিত এই মাছের বিশেষত্ব হলো এদের পুরো প্রজাতিই স্ত্রীলিঙ্গের। আরো অবাক করা বিষয়, প্রায় এক লাখ বছর ধরে কোনো পুরুষ সদস্য ছাড়াই তারা টিকে আছে এবং বংশবৃদ্ধি করে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, যৌন প্রজনন ছাড়া কোনো প্রাণী দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে না। কারণ যৌন প্রজননের মাধ্যমে জিনের বৈচিত্র্য তৈরি হয় এবং ক্ষতিকর জিনগত পরিবর্তন দূর হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু অ্যামাজন মলির অস্তিত্ব সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অ্যামাজন মলি প্রজননের সময় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রজাতির পুরুষ মাছের সাহায্য নেয়। তবে পুরুষের শুক্রাণু শুধু ডিমের বিকাশ শুরু করার সংকেত দেয়। সন্তান তৈরিতে পুরুষের কোনো জিন অংশ নেয় না। ফলে জন্ম নেয় শুধু স্ত্রী মাছ, যারা মায়ের প্রায় হুবহু অনুলিপি বা ক্লোন। জীববিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘গাইনোজেনেসিস’।

কেন যৌন প্রজনন গুরুত্বপূর্ণ?
বিজ্ঞানীদের মতে, যৌন প্রজননের মাধ্যমে দুই অভিভাবকের জিন একত্রিত হয়ে নতুন জিনগত সমন্বয় তৈরি করে। এতে ক্ষতিকর মিউটেশন বা জিনগত ত্রুটি দূর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে অযৌন প্রজননে একই জিন বারবার পরবর্তী প্রজন্মে চলে যায়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিকর মিউটেশন জমতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মুলারের র্যাচেট’। দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনো প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, অ্যামাজন মলির মতো অযৌন প্রজাতিগুলোর টিকে থাকার কথা নয়।
নতুন গবেষণায় মিলল রহস্যের সূত্র
জার্মানির লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এডওয়ার্ড রাইসমেয়ার ও তার সহকর্মীরা সম্প্রতি অ্যামাজন মলির জিনোম বিশ্লেষণ করে নতুন তথ্য পেয়েছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই মাছের শরীরে ‘জিন কনভার্সন’ নামে একটি প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয়। এর মাধ্যমে ডিএনএর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অন্য একটি সুস্থ জিনের অনুলিপি ব্যবহার করে নিজেকে মেরামত করতে পারে। গবেষকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘কপি-পেস্ট’ ব্যবস্থা। যৌন প্রজনন না থাকলেও এই প্রক্রিয়া ক্ষতিকর মিউটেশন দূর করতে সাহায্য করছে এবং জিনোমকে সুস্থ রাখছে।

দুই প্রজাতির সংমিশ্রণ থেকে জন্ম
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় এক লাখ বছর আগে একটি স্ত্রী আটলান্টিক মলি ও একটি পুরুষ সেইলফিন মলির সংকরায়ণের মাধ্যমে অ্যামাজন মলির জন্ম হয়। ফলে শুরু থেকেই এদের জিনোমে দুটি ভিন্ন প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য ছিল। এই বৈচিত্র্যই পরবর্তীতে জিন কনভার্সন প্রক্রিয়াকে কার্যকর রাখতে সহায়তা করেছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
অ্যামাজন মলি একা নয়। ‘বিডেলয়েড রোটিফার’ নামে অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের প্রাণীও কোটি কোটি বছর ধরে পুরুষ ছাড়াই টিকে আছে। তারা পরিবেশ থেকে অন্য জীবের ডিএনএ গ্রহণ করতে পারে, যা তাদের অভিযোজন ও বেঁচে থাকার ক্ষমতা বাড়ায়। তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, এসব প্রজাতি কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে জিনগত সুস্থতা বজায় রাখছে।

মানবস্বাস্থ্যের গবেষণায়ও গুরুত্ব
গবেষকদের মতে, অ্যামাজন মলির জিনগত মেরামত ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা গেলে তা মানবস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ক্যানসারের মতো অনেক রোগই জিনগত মিউটেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রকৃতি কীভাবে এসব ত্রুটি মোকাবিলা করে, তা বোঝা ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে।
একসময় যে মাছকে বিবর্তন তত্ত্বের ব্যতিক্রম বলে মনে করা হতো, আজ সেটিই বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলছে- জিনোম সুস্থ রাখার জন্য যৌন প্রজননই কি একমাত্র পথ, নাকি প্রকৃতির কাছে আরো বিকল্প কৌশল রয়েছে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









