দীর্ঘদিন ধরে মঙ্গল গ্রহকে একটি ঠান্ডা, নিষ্ক্রিয় এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে প্রায় স্থির গ্রহ বলে মনে করা হতো। তবে নতুন এক গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলছেন, মঙ্গলের পৃষ্ঠের প্রায় ২৪ কিলোমিটার নিচে একসময় বিশাল গলিত শিলা (ম্যাগমা) ব্যবস্থা লুকিয়ে ছিল, যা কোটি কোটি বছর ধরে গ্রহটির ভূত্বককে বদলে দিয়েছে। সম্প্রতি গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার অ্যাস্ট্রোনোমি-এ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নাসার ইনসাইট (InSight) মিশনের সংগ্রহ করা ভূকম্পন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের অভ্যন্তরে একটি রহস্যময় ভূতাত্ত্বিক স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। বহু বছর ধরে এই স্তরটি বিজ্ঞানীদের কাছে ধাঁধা হয়ে ছিল। নতুন গবেষণা বলছে, এই স্তরের উৎপত্তি সম্পর্কে জানা গেলে মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাই বদলে যেতে পারে।
এই তথ্য এসেছে উল্কাপিণ্ডের আঘাত এবং মার্সকোয়েক বা মঙ্গলের ভূমিকম্পে তৈরি হওয়া ভূকম্পীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ২০১৮ সালে নাসার ইনসাইট ল্যান্ডার প্রথমবারের মতো মঙ্গলে একটি কার্যকর সিসমোমিটার বা ভূকম্পন মাপার যন্ত্র স্থাপন করে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মঙ্গলের অভ্যন্তরীণ গঠন অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান।
ভূকম্পীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে একটি ভিন্নধর্মী স্তর শনাক্ত করেন। আগের গবেষণায়ও এই স্তরের অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছিল, কিন্তু এর দুই পাশে কী ধরনের শিলা রয়েছে, তা জানা যায়নি।
এই রহস্যের সমাধানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান বিভাগের গবেষকেরা শত শত সম্ভাব্য খনিজ গঠনের সঙ্গে ভূকম্পনের তথ্য তুলনা করেন। তারা তাপগতিবিদ্যার মডেল এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন ধরনের শিলা ভূকম্পীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিলে যায়, তা নির্ণয় করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, উপরের স্তরে রয়েছে ম্যাফিক শিলা, যেখানে সিলিকার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এর নিচে রয়েছে আল্ট্রাম্যাফিক শিলা, যা লোহা ও ম্যাগনেশিয়ামে সমৃদ্ধ হলেও সিলিকার পরিমাণ কম।
মঙ্গলের নিচে ছিল বিশাল ম্যাগমার প্রবাহ
গবেষকদের মতে, একসময় মঙ্গলের ভূত্বকের নিচে বিপুল পরিমাণ গলিত শিলা জমা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ম্যাগমা ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়। ভারী খনিজগুলো নিচে জমা হতে থাকে, আর হালকা গলিত অংশ ওপরে উঠে আসে।
এই প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর কিছু আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের নিচে দেখা যাওয়া ম্যাগমা ব্যবস্থার সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা আগে ধারণা করেছিলেন, চলমান টেকটোনিক প্লেট না থাকায় মঙ্গলে এমন জটিল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, এই শিলাস্তর মঙ্গলের উত্তর গোলার্ধজুড়ে শত শত, এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি বিচ্ছিন্ন ম্যাগমা কক্ষ নয়; বরং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত বিশাল ম্যাগমার পথ ও ভাণ্ডারের একটি নেটওয়ার্ক।
বিজ্ঞানীরা এই ব্যবস্থাকে ট্রান্সক্রাস্টাল ম্যাগমাটিজম নামে অভিহিত করেছেন। এত দিন পর্যন্ত এমন প্রক্রিয়া শুধু পৃথিবীতেই ঘটে বলে মনে করা হতো। গবেষকদের মতে, এটি বর্তমানে সক্রিয় কোনো ম্যাগমার স্তর নয়; বরং অতীতে গড়ে ওঠা বিশাল ম্যাগমা ব্যবস্থার চিহ্ন।
মঙ্গল সম্পর্কে বদলে যেতে পারে প্রচলিত ধারণা
এই আবিষ্কার মঙ্গলকে একটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা 'স্ট্যাগন্যান্ট-লিড' গ্রহ হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। যদিও মঙ্গলে পৃথিবীর মতো টেকটোনিক প্লেট নেই, তবুও দীর্ঘ সময় ধরে গলন, শিলার ওপরে ওঠা এবং উপাদানের রূপান্তরের মাধ্যমে সেখানে জটিল ভূত্বক তৈরি হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের প্রক্রিয়ার ফলে ভূ-পৃষ্ঠের তুলনামূলক কাছাকাছি এলাকায় বিভিন্ন ধাতু ও মূল্যবান খনিজের ঘনত্বও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
প্রাণের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন
মঙ্গলের অভ্যন্তরে এত বড় ম্যাগমা নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব গ্রহটির অতীতের বাসযোগ্যতা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু করেছে। কারণ ভূতাত্ত্বিক পুনঃচক্রায়ন বা জিওলজিক্যাল রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পানি, গ্যাস এবং অন্যান্য পরিবর্তশীল উপাদান স্থানান্তরিত হয়। এসব উপাদানই স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর এবং জলবায়ু গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এত দিন পর্যন্ত এমন প্রক্রিয়া মূলত টেকটোনিক প্লেটসমৃদ্ধ গ্রহের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গবেষণা বলছে, আকারে ছোট এবং বাইরে থেকে নিষ্ক্রিয় মনে হলেও মঙ্গলের মতো গ্রহগুলোও তাদের ইতিহাসের একটি পর্যায়ে এমন জটিল অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম ছিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









