কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তিখাতেই নয়, বৈশ্বিক সামরিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তন আনছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং এআইভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা। ফলে ঐতিহ্যবাহী সামরিক-শিল্প জোট (Military-Industrial Complex) ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ‘মিলিটারি-টেক’ বা এআইনির্ভর সামরিক শিল্পে। বিশ্বের বিভিন্ন সরকার এই খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, আর সেই অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাতে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ১৫ বছরের জন্য ২ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২.৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি চুক্তি করেছে রেথিয়ন ইউকের নেতৃত্বাধীন ওমনিয়া ট্রেনিং কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার সেনাকে এআই ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একই সময়ে ন্যাটো তাদের উন্নত বিমান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ডেটা প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ডুরিল, প্যালান্টির এবং ফ্রান্সের এথিয়া এসএএসকে। অ্যান্ডুরিলের ‘ল্যাটিস’ সফটওয়্যার বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক চিত্র তৈরি করতে সক্ষম।
বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় ২.৮৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) সামরিক নেটওয়ার্কে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিশ্বের শীর্ষ আটটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে। লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি ‘এআই-ফার্স্ট’ বাহিনীতে রূপান্তর করা।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) সামরিক এআই শিল্পকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে—ডিফেন্স প্রাইমস বা ঐতিহ্যবাহী প্রতিরক্ষা ঠিকাদার, নিওপ্রাইমস বা প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ, বিগ টেক এবং ফাউন্ডেশনাল মডেল প্রোভাইডার।
ডিফেন্স প্রাইমস বা ঐতিহ্যবাহী প্রতিরক্ষা ঠিকাদার
লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স (সাবেক রেথিয়ন), নর্থরপ গ্রুম্যান, বিএই সিস্টেমস ও জেনারেল ডাইনামিকসের মতো প্রতিষ্ঠান বহু দশক ধরে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করছে। এখন তারা এসব অস্ত্র ব্যবস্থায় এআই যুক্ত করছে।
লকহিড মার্টিন তাদের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানে এমন একটি এআই প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাচ্ছে, যা বৈরী বিমান দ্রুত শনাক্ত করতে পাইলটকে সহায়তা করবে। এল৩হ্যারিস তাদের নজরদারি ক্যামেরায় এআই ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্তের ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শিল্ড এআই যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের জন্য স্বয়ংক্রিয় এআই পাইলট তৈরি করছে।
নিওপ্রাইমস বা প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ
এই শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সফটওয়্যার, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম প্যালান্টির। প্রতিষ্ঠানটি পেন্টাগনের ‘প্রজেক্ট মেভেন’-এর অন্যতম অংশীদার। এই প্রকল্পে এআই ব্যবহার করে স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোনের ভিডিও ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল–ইরান সংঘাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এক পর্যায়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় এক হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার দাবি করা হয়।
অ্যান্ডুরিলের ‘ল্যাটিস’ প্ল্যাটফর্মও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এটি ড্রোন, সেন্সর টাওয়ার ও স্বয়ংক্রিয় যানবাহনকে একক কমান্ড ব্যবস্থার আওতায় এনে যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করে এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিগ টেক
গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস), ওরাকল, এনভিডিয়া, স্পেসএক্স, ওপেনএআই ও রিফ্লেকশনের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সামরিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের ক্লাউড অবকাঠামোর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী এসব প্রতিষ্ঠান সামরিক বাহিনীর জন্য নিরাপদ কম্পিউটিং, এআই মডেল, ডেটা বিশ্লেষণ এবং উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দিচ্ছে।
পেন্টাগনের সাম্প্রতিক চুক্তির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন গোপন নেটওয়ার্কে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য, সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমে দ্রুত ও নিরাপদভাবে এআই প্রযুক্তি সংযুক্ত করা।
ফাউন্ডেশনাল মডেল প্রোভাইডার
এই শ্রেণিতে রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান, যারা মূল এআই মডেল তৈরি করে, যা পরে বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক এবং ইউরোপের মিস্ত্রাল এআই এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
চীনের সামরিক খাতও এআই উন্নয়নে দ্রুত এগোচ্ছে। দেশটির গবেষকেরা মেটার লামা মডেলের ভিত্তিতে ‘চ্যাটবিট’ নামে একটি সামরিক এআই টুল তৈরি করেছেন, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য নকশা করা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, চীনের বার্ষিক সামরিক এআই ব্যয় প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
সম্প্রতি পেন্টাগন আলিবাবা, বাইদু, বিওয়াইডি, নিও, রোবোসেন্স ও ইউনিট্রিকে চীনা সামরিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যুক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সাবেক বাইদু, আলিবাবা ও টেনসেন্ট কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি ছোট এআই কোম্পানিও লক্ষ্য নির্ধারণ, নজরদারি ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কয়েক বছর আগেও অনেক এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রযুক্তি সামরিক কাজে ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। তবে ২০২৪ সালে ওপেনএআই সামরিক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। একই বছর অ্যানথ্রপিক ও প্যালান্টির সামরিক খাতে অংশীদারত্ব শুরু করে, যদিও পরবর্তীতে সেই সম্পর্ক আইনি বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, বরং তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিই সামরিক সাফল্যের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে। ফলে বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা শিল্পে এআইকে ঘিরে প্রতিযোগিতা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









