হাজার হাজার বছর আগে মানুষেরা গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত, চিহ্ন তৈরি করত। এতদিন বিজ্ঞানীরা এসব প্রাচীন মানুষের পরিচয় জানতে হাড়, দাঁত, মাটি বা গুহায় পাওয়া বিভিন্ন বস্তু থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এবার এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা সরাসরি গুহার দেয়াল এবং প্রাচীন শিলাচিত্র থেকে মানুষের ডিএনএ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই আবিষ্কার প্রাচীন মানুষের জীবন, গুহাচিত্র এবং মানব ইতিহাস গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে তারা নিশ্চিতভাবে গুহার ছবি আঁকা ব্যক্তির ডিএনএ খুঁজে পেয়েছেন। বরং তারা এমন একজন মানুষের জেনেটিক চিহ্ন পেয়েছেন, যিনি কোনো এক সময় ওই দেয়ালের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তিনি শিল্পী হতে পারেন, আবার তার সহকারী বা পরে আসা কোনো দর্শনার্থীও হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের অনুসন্ধানকারী ও গুহাচিত্র বিশেষজ্ঞ জেনেভিভ ভন পেটজিঙ্গার বলেন, “২০ হাজার, ৩০ হাজার বা ৪০ হাজার বছর আগে কোনো মানুষ যে দেয়ালে হাত রেখেছিল, সেখান থেকে আজ তার ডিএনএ পাওয়া সম্ভব—এটা অবিশ্বাস্য।”
গুহার দেয়াল থেকে ডিএনএ সংগ্রহের অভিযান
এই গবেষণাটি করেছে FIRST-ART নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল। দলের প্রধান গবেষক আলবা বসোমস মেসা, জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভল্যুশনারি অ্যানথ্রোপলজির একজন গবেষক। গবেষক দল স্পেন ও পর্তুগালের ১১টি গুহায় অভিযান চালায়। তারা ২৪টি শিলাচিত্র এলাকা থেকে মোট ৫৪টি নমুনা সংগ্রহ করে।
এসব নমুনার মধ্যে ছিল—
মানুষের হাতের ছাপ
বিভিন্ন রেখা ও বিন্দুর চিহ্ন
গুহার দেয়ালে আঁকা রঙের অংশ
দেয়ালের এমন জায়গা যেখানে কোনো ছবি ছিল না
নমুনা সংগ্রহের সময় বিজ্ঞানীরা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। দূষণ এড়াতে তারা দুই স্তরের গ্লাভস ও মুখোশ ব্যবহার করেন। জীবাণুমুক্ত বিশেষ যন্ত্র দিয়ে দেয়ালের খুব ছোট অংশ সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নমুনাটি পাওয়া যায় পর্তুগালের এসকোরাল গুহায়। সেখানে একটি ছোট লাল রঙের বিন্দু ছিল, যেটিকে “প্যানেল ১১” বলা হয়।
এই লাল রঙের অংশের ওপর ক্যালসাইট নামের একটি খনিজ স্তর তৈরি হয়েছিল। গুহায় স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হওয়া এই খনিজ স্তর অনেকটা কাচের আবরণের মতো কাজ করে। এটি ভেতরের উপাদানকে হাজার বছর ধরে সংরক্ষণ করতে পারে।
এই নমুনা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা প্রাচীন মানুষের ডিএনএ পান। ধারণা করা হচ্ছে, এটি এমন একজন হোমো স্যাপিয়েন্সের ডিএনএ, যিনি অন্তত ৪ থেকে ৫ হাজার বছর আগে বেঁচে ছিলেন। তবে গবেষকদের ধারণা, এটি আরও পুরোনো হতে পারে—সম্ভবত ১২ হাজার থেকে ৫০ হাজার বছর আগের।
তবে ওই ব্যক্তি নারী না পুরুষ, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। গবেষণায় প্রাণীর ডিএনএর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এর ফলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ডিএনএ সরাসরি কোনো মানুষের সংস্পর্শ থেকেই এসেছে। তবে ডিএনএটি রঙের ভেতর ছিল, নাকি পরে তৈরি হওয়া ক্যালসাইট স্তরে আটকে ছিল—এখনো তা নিশ্চিত নয়।
শুধু আঁকা ছবি নয়, খালি দেয়ালেও মিলেছে ডিএনএ
গবেষকরা ছবিহীন গুহার দেয়াল থেকেও মানুষের ডিএনএ পেয়েছেন। স্পেনের কোভারন গুহা থেকে পাওয়া দুটি নমুনায় একজন পুরুষ ও একজন নারীর ডিএনএ পাওয়া যায়।
এসব নমুনাও সম্ভবত হাজার হাজার বছর আগের। একটি নমুনা থেকে জানা যায়, এটি প্রায় ১ হাজার বছরের বেশি পুরোনো, আর অন্যটি অন্তত ২ হাজার বছরের পুরোনো।
নারীর নমুনায় প্রাণীর ডিএনএর চিহ্নও পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি হয়তো সরাসরি মানুষের সংস্পর্শ থেকে নয়; বরং মাটি বা অন্য কোনো উপায়ে দেয়ালে পৌঁছাতে পারে।
শিল্পীকে কি চিহ্নিত করা সম্ভব?
এই আবিষ্কার অনেক সম্ভাবনা তৈরি করলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই গুহাচিত্রের আসল শিল্পীকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ কোনো একজন ব্যক্তি গুহার দেয়ালে হাত রাখলেই তার ডিএনএ সেখানে থাকতে পারে। তিনি শিল্পী নাও হতে পারেন।
তবে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা হয়তো জানতে পারবেন—
কারা এসব গুহায় বসবাস করত
তারা নারী না পুরুষ ছিলেন
কোন মানবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন
তারা কীভাবে জীবনযাপন করতেন
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিওজেনেটিক বিশেষজ্ঞ পেরে গেলাবার্ট বলেন, “শুধু মানুষের জৈবিক লিঙ্গ শনাক্ত করাও গুহাচিত্র গবেষণায় নতুন পথ খুলে দেয়।”
প্রাচীন ইতিহাস গবেষণায় নতুন যুগ
গুহাচিত্র গবেষণায় এতদিন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—এসব ছবি কারা এঁকেছিল? তারা কি আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স), নাকি নিয়ান্ডারথাল?
নতুন এই ডিএনএ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করতে পারে। স্পেনের প্রত্নতত্ত্ববিদ হিপোলিতো কোলাদো গিরালদো বলেন, এই গবেষণা শিলাচিত্র ও প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেছে।
তবে কিছু বিজ্ঞানী সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ ৫৪টি নমুনার মধ্যে মাত্র কয়েকটিতে সফলভাবে মানুষের প্রাচীন ডিএনএ পাওয়া গেছে। অনেক নমুনায় মানুষ ও প্রাণীর ডিএনএ মিশ্রিত ছিল, যা প্রাকৃতিক দূষণ বা পানি চলাচলের কারণে হতে পারে। আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি এখনো কিছুটা ধ্বংসাত্মক। অর্থাৎ দেয়ালের সামান্য অংশ কেটে নিতে হয়। তাই ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ পদ্ধতি তৈরির চেষ্টা চলছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
গবেষকরা এখন এমন গুহা খুঁজছেন যেখানে এই প্রযুক্তি আরও ভালোভাবে ব্যবহার করা যাবে। তারা আশা করছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে আরও মানুষের ডিএনএ পাওয়া সম্ভব হবে।
জেনেভিভ ভন পেটজিঙ্গার বলেন, “এখন আমরা জানি যে দেয়াল বা রঙের স্তর থেকেও ডিএনএ পাওয়া সম্ভব। তাই শুধু আরও নমুনা সংগ্রহ নয়, আরও বেশি মানুষকে এই পদ্ধতি শেখানো দরকার।”
এই আবিষ্কার হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের হাজার হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ করে দেবে। গুহার নীরব দেয়ালগুলো এখন হয়তো বলতে শুরু করবে প্রাচীন মানুষের হারিয়ে যাওয়া গল্প।
সূত্র : ন্যাচারাল জিওগ্রাফি আর্থ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









