রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা সাধারণত তারা দেখি। কখনো ছুটে যাওয়া উল্কা, কখনো চাঁদ—মহাকাশ আমাদের কাছে বিস্ময় আর কৌতূহলের জায়গা। কিন্তু সেই আকাশেই এখন তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার স্যাটেলাইট, বাড়ছে সামরিক তৎপরতা, পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি কোম্পানির প্রভাব। মহাকাশ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা একসময় পৃথিবীর জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এমন আশঙ্কাই করছেন পদার্থবিজ্ঞানী ও মহাকাশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ লরা গ্রেগো। তাঁর সতর্কবার্তা বেশ কঠিন—মানুষ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা ভুল সিদ্ধান্তে সভ্যতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে তাঁর মতে, চাইলে এই ঝুঁকি কমানোর পথ এখনো খোলা আছে।

গ্রেগো যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের গবেষক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মহাকাশ, অস্ত্র ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, মহাকাশ নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণাও দ্রুত বদলে যাবে। এখন পর্যন্ত মহাকাশ মানে ছিল রাতের আকাশে তারা দেখা। কিন্তু ভবিষ্যতে আকাশে এত বেশি স্যাটেলাইট থাকবে যে সেই দৃশ্যও বদলে যেতে পারে।
স্পেসএক্স ইতিমধ্যে হাজার হাজার স্টারলিংক স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠিয়েছে। আরও বড় স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে পৃথিবীর কক্ষপথ যেমন বদলে যাবে, তেমনি বাড়বে নিরাপত্তার প্রশ্নও।

মহাকাশে যুদ্ধের ছায়া
মহাকাশকে পুরোপুরি শান্তির জায়গা ভাবার সুযোগ নেই। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ ছিল প্রযুক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক শক্তিরও প্রদর্শন। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের রকেট প্রযুক্তির সঙ্গে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মহাকাশের সামরিক গুরুত্বও অনেক। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সেনাবাহিনী যোগাযোগ করে, আবহাওয়ার তথ্য পায়, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং সামরিক তৎপরতার ওপর নজর রাখে। ড্রোন পরিচালনাতেও অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট সংকেত গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা হলো, স্যাটেলাইটগুলো নিজেরাও খুব বেশি সুরক্ষিত নয়। সংকেত বন্ধ করে দেওয়া, ভুয়া সংকেত পাঠানো কিংবা সাইবার হামলা চালিয়ে এগুলো অকার্যকর করা সম্ভব। সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেনের ড্রোন ঠেকাতে স্টারলিংকের সংকেত জ্যাম করার চেষ্টা করেছে বলেও খবর এসেছে।
একটি ছোট টুকরোও হতে পারে বিপজ্জনক
কোনো দেশ এখনো প্রকাশ্যে অন্য দেশের স্যাটেলাইট ধ্বংস করে নতুন সীমা অতিক্রম করেনি। কিন্তু বড় মহাকাশ শক্তিগুলো স্যাটেলাইট অচল করার প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে।
কোনো স্যাটেলাইটকে বিস্ফোরিত না করেও তার সেন্সর নষ্ট করা, তাকে ঘুরিয়ে দেওয়া বা বিকিরণের মাধ্যমে অকার্যকর করা সম্ভব। তবে কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করে ফেললে বিপদ আরও বড়। কারণ এতে তৈরি হওয়া ধাতব টুকরোগুলো প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকবে। এমনকি মার্বেলের মতো ছোট একটি টুকরোও অন্য স্যাটেলাইটে আঘাত করে বড় ক্ষতি করতে পারে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ঝুঁকি পারমাণবিক অস্ত্রে
গ্রেগোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পারমাণবিক অস্ত্র। আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র একটি দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছাতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নিতে পারে। আর স্যাটেলাইট সেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সংকেত শনাক্ত করতে পারে।
সমস্যা হলো, কোনো হামলার সংকেত পাওয়ার পর একজন রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় থাকতে পারে ‘১০ মিনিটেরও কম’। ক্ষেপণাস্ত্র সত্যিই ছোড়া হয়েছে, নাকি ভুল সংকেত—এই সিদ্ধান্ত নিতে হয় অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে।
গ্রেগোর ভাষায়, এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তও সভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কোনো ভুল সতর্কবার্তার পর পাল্টা পারমাণবিক হামলা হলে একের পর এক প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হতে পারে।
তাঁর আশঙ্কা আরও বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আরও কমিয়ে দিলে এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
কার মহাকাশ?
মহাকাশের জন্য ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে। এতে কোনো দেশ মহাকাশ বা চাঁদের মতো কোনো মহাজাগতিক বস্তুর মালিকানা দাবি করতে পারবে না। মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনও নিষিদ্ধ। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানির দ্রুত বিস্তারের মতো বর্তমান বাস্তবতা সেই সময়ের চুক্তিতে পুরোপুরি কল্পনা করা হয়নি।
এখানেই গ্রেগোর আরেকটি বড় প্রশ্ন—মহাকাশের মালিক কে?
স্পেসএক্সের মতো কোম্পানি যখন হাজার হাজার স্যাটেলাইট পরিচালনা করে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা করে, তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কতটা হওয়া উচিত, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।

গ্রেগোর মতে, প্রযুক্তি আইন ও আন্তর্জাতিক নীতির চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগে প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, পরে মানুষ ভাবছে এর পরিণতি কী হতে পারে।
তিনি মনে করেন, মহাকাশ কোনো কোম্পানি বা দেশের একার সম্পদ নয়। পৃথিবীর মতো মহাকাশও মানবজাতির যৌথ সম্পদ। তাই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
পৃথিবীকে ভুলে নয়
মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের স্বপ্ন যতই আকর্ষণীয় হোক, গ্রেগোর কাছে পৃথিবী এখনো অনেক বেশি মূল্যবান। মঙ্গল কঠিন, শীতল ও প্রতিকূল। চাঁদও মানুষের বসবাসের জন্য অত্যন্ত কঠিন জায়গা।
তাই মহাকাশ জয়ের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পৃথিবীকে রক্ষা করাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তার চিন্তার কেন্দ্রে আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়াই তাঁর বড় আশা।
মহাকাশে মানুষ কত দূর যেতে পারবে—তার চেয়ে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘যত দূরই যাই, পৃথিবীকে কি নিরাপদ রাখতে পারব?’ গ্রেগোর সতর্কবার্তা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









