মানুষ পৃথিবীকে বুঝতে গিয়ে একটি সহজ নিয়মে অভ্যস্ত হয়েছে—সময় বাড়লে কাজও প্রায় একই অনুপাতে বাড়বে। আপনি এক ঘণ্টা হাঁটলে যতটা পথ যাবেন, দুই ঘণ্টায় তার প্রায় দ্বিগুণ পথ যাবেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনে এই ধারণা বেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এই নিয়ম আর ঠিকমতো কাজ করে না।
কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি সরলরেখায় এগোয় না। এর পেছনে কাজ করছে এমন কিছু প্রযুক্তি, যেগুলো নিজেদের ক্ষমতা ক্রমেই দ্রুত বাড়িয়ে তুলছে।
২০১০ সালে আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ শুরু করার সময় থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্নত মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রায় এক লাখ কোটি গুণ বেড়েছে। তখনকার প্রাথমিক ব্যবস্থায় যেখানে প্রায় ১০¹⁴ ফ্লপস ব্যবহার করা হতো, আজকের সবচেয়ে বড় মডেলগুলোতে সেই সংখ্যা ১০²⁶ ফ্লপসেরও বেশি।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বোঝা সহজ নয়। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান অগ্রগতির পেছনে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার বিস্তার একটি মৌলিক কারণ।
তবু সংশয়বাদীরা বারবার বলছেন, এই অগ্রগতির সামনে খুব শিগগিরই একটি দেয়াল এসে দাঁড়াবে। কেউ বলছেন, মুরের সূত্রের গতি কমে গেছে। কেউ বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের মজুত সীমিত। আবার কেউ মনে করছেন, এত কম্পিউটিং চালানোর মতো শক্তি পাওয়া যাবে না।
কিন্তু সমস্যাটিকে শুধু একটি প্রযুক্তির দৃষ্টিতে দেখলে পুরো ছবিটা পাওয়া যায় না। হার্ডওয়্যার, মেমোরি, নেটওয়ার্ক এবং সফটওয়্যারের একাধিক পরিবর্তন একই সময়ে ঘটছে। আর এই পরিবর্তনগুলো একে অন্যকে শক্তিশালী করছে।
ধরুন, একটি ঘরে হাজার মানুষ ক্যালকুলেটর হাতে বসে আছে। কয়েক বছর আগে কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়ানোর অর্থ ছিল সেই ঘরে আরও মানুষ ও আরও ক্যালকুলেটর যোগ করা। কিন্তু যদি তাদের অনেকেই হিসাবের ফলের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে, তাহলে নতুন মানুষ যোগ করলেই কাজের গতি সমান হারে বাড়বে না।
আজকের প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধু ক্যালকুলেটরের সংখ্যা বাড়ানো নয়। লক্ষ্য হলো—প্রতিটি ক্যালকুলেটরকে প্রায় সবসময় কাজে ব্যস্ত রাখা এবং তাদের এমনভাবে যুক্ত করা, যেন তারা একটি বিশাল একক যন্ত্র হিসেবে কাজ করে।
এখানে তিনটি বড় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, কম্পিউটিং চিপ অনেক দ্রুত হয়েছে। মাত্র ছয় বছরে এনভিডিয়ার চিপের কাঁচা কর্মক্ষমতা সাত গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে তা ছিল ৩১২ টেরাফ্লপস, আজ তা ২ হাজার ২৫০ টেরাফ্লপস। মাইক্রোসফটের মাইয়া ২০০ চিপও প্রতি ডলারে আগের তুলনায় বেশি কর্মক্ষমতা দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, তথ্য এখন প্রসেসরের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারে। উচ্চ-ব্যান্ডউইথ মেমোরি বা এইচবিএম প্রযুক্তি চিপগুলোকে স্তরে স্তরে সাজিয়ে তথ্য সরবরাহের গতি বাড়িয়েছে। এর সর্বশেষ প্রজন্ম এইচবিএম৩ আগের প্রজন্মের তুলনায় তিন গুণ বেশি ব্যান্ডউইথ দেয়।
তৃতীয়ত, আলাদা আলাদা চিপকে এখন এমনভাবে যুক্ত করা যাচ্ছে যে তারা একটি বিশাল কম্পিউটারের মতো কাজ করতে পারে। এনভিলিংক ও ইনফিনিব্যান্ডের মতো প্রযুক্তি লাখো নয়, বরং কয়েক লাখ জিপিইউকে একই ব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করতে পারে। কয়েক বছর আগে এমন ক্ষমতা প্রায় অকল্পনীয় ছিল।
এর ফল খুব দ্রুত বোঝা যায়। ২০২০ সালে আটটি জিপিইউতে একটি ভাষা মডেল প্রশিক্ষণ দিতে ১৬৭ মিনিট সময় লাগত। এখন আধুনিক সমতুল্য হার্ডওয়্যারে একই ধরনের কাজ চার মিনিটেরও কম সময়ে করা সম্ভব।
শুধু মুরের সূত্রের হিসাব ধরলে এই সময়ে প্রায় পাঁচ গুণ উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে উন্নতি হয়েছে প্রায় ৫০ গুণ।
২০১২ সালে অ্যালেক্সনেট নামের যে চিত্র শনাক্তকরণ মডেল আধুনিক গভীর শিক্ষার বিস্ফোরণের সূচনা করেছিল, সেটি প্রশিক্ষণে মাত্র দুটি জিপিইউ ব্যবহার করা হয়েছিল। আজকের সবচেয়ে বড় কম্পিউটিং ক্লাস্টারগুলোতে এক লাখেরও বেশি জিপিইউ ব্যবহার করা হচ্ছে। আর প্রতিটি জিপিইউ পুরোনো প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
তবে গল্পটি শুধু হার্ডওয়্যারের নয়। সফটওয়্যারও একই সময়ে বদলে যাচ্ছে।
এপক এআইয়ের গবেষণা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট মাত্রার কর্মক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রায় প্রতি আট মাসে অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। মুরের সূত্রে যেখানে ১৮ থেকে ২৪ মাসে দ্বিগুণ হওয়ার কথা বলা হতো, এখানে পরিবর্তনের গতি আরও বেশি।
সম্প্রতি কিছু মডেল চালানোর খরচও বার্ষিক হিসাবে সর্বোচ্চ ৯০০ গুণ পর্যন্ত কমেছে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু শক্তিশালী হচ্ছে না, তার ব্যবহারও দ্রুত সস্তা হয়ে উঠছে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই গতি কোথায় গিয়ে থামবে?
শীর্ষস্থানীয় গবেষণাগারগুলো বছরে প্রায় চার গুণ হারে তাদের কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে সবচেয়ে উন্নত মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রতিবছর প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট কম্পিউটিং ক্ষমতা ১০ কোটি এইচ১০০-সমমানের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি।
সবকিছু একসঙ্গে হিসাব করলে, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ কার্যকর কম্পিউটিং ক্ষমতা আরও প্রায় এক হাজার গুণ বাড়তে পারে। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর আরও ২০০ গিগাওয়াট কম্পিউটিং ক্ষমতা অনলাইনে আনার সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। এটি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির সম্মিলিত সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহারের কাছাকাছি।
এত বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার অর্থ কী?
সম্ভবত এর অর্থ হলো, আমরা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগোচ্ছি, যা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেবে না। বরং নিজে থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারবে। এ ধরনের আধা-স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দিনের পর দিন কোড লিখতে পারে, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে কোনো প্রকল্প পরিচালনা করতে পারে, ফোনে কথা বলতে পারে, চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মতো জটিল কাজ সামলাতে পারে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো একজন সহকারী নয়, বরং একদল ডিজিটাল কর্মীর মতো কাজ করবে। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে, সহযোগিতা করবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ সম্পন্ন করবে।
এটি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন হবে না। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলো প্রায়ই ঘটে তখন, যখন মানুষ কোনো কাজ করার নতুন উপায় আবিষ্কার করে। কৃষি মানুষের খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতি বদলে দিয়েছিল। শিল্পবিপ্লব মানুষের শারীরিক শ্রমের ক্ষমতা বাড়িয়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবার মানুষের জ্ঞানভিত্তিক কাজের ওপর একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এর সবচেয়ে বড় বাধা হলো শক্তি।
একটি ফ্রিজের আকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা র্যাক প্রায় ১২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। এটি প্রায় ১০০টি বাড়ির ব্যবহারের সমান। কিন্তু এখানেও প্রযুক্তির আরেকটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। গত ৫০ বছরে সৌরবিদ্যুতের খরচ প্রায় ১০০ গুণ কমেছে। গত তিন দশকে ব্যাটারির দাম কমেছে ৯৭ শতাংশ। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য যে বিপুল শক্তি প্রয়োজন, সেই শক্তি সরবরাহের প্রযুক্তিও একই সময়ে দ্রুত সস্তা ও উন্নত হচ্ছে। এখান থেকেই পরিষ্কার জ্বালানির ওপর নির্ভর করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্প্রসারণের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হচ্ছে।
এখন আমরা এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছি, যখন ১০০ বিলিয়ন ডলারের কম্পিউটিং ক্লাস্টার, ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের অবকাঠামো এবং গুদামঘরের আকারের সুপারকম্পিউটার আর কল্পকাহিনি নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এসব প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের শেষ কোথায়, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে আমাদের পরিচিত সরলরৈখিক যুক্তি দিয়ে বিচার করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমরা এমন একটি প্রযুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যার শক্তি শুধু একটি যন্ত্রের উন্নতির কারণে বাড়ছে না। চিপ দ্রুত হচ্ছে, তথ্য দ্রুত পৌঁছাচ্ছে, হাজার হাজার যন্ত্র একসঙ্গে কাজ করছে, সফটওয়্যার আরও দক্ষ হচ্ছে এবং শক্তির খরচও কমছে।
এই সব পরিবর্তন একে অন্যকে ত্বরান্বিত করছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামনে কোনো দেয়াল নেই—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, দেয়াল কোথায়, সেটি এখনো আমরা জানি না।
যা জানা যাচ্ছে, তা হলো কম্পিউটিং ক্ষমতার বিস্ফোরণ এখনো থামেনি। বরং আমরা সম্ভবত তার একেবারে শুরুতেই দাঁড়িয়ে আছি।
সূত্র: লেখাটি ‘এমআইটি টেকনোলজি রিভিয়্যু’তে ৮ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত (www.technologyreview.com)
পরিচিতি
মুস্তাফা সুলেমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জগতের একজন পরিচিত উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদ। তিনি ২০১০ সালে ডেমিস হাসাবিস ও শেন লেগের সঙ্গে ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পরে গুগলের সঙ্গে যুক্ত হয়। ডিপমাইন্ডে সুলেমান প্রযুক্তি ও ব্যবসার বিভিন্ন দিক সামলানোর পাশাপাশি এআইয়ের বাস্তব ব্যবহার নিয়ে কাজ করেন।
২০১৯ সালে তিনি ডিপমাইন্ড থেকে সরে যান এবং পরে গুগলে এআই-সম্পর্কিত কাজে যুক্ত হন। ২০২২ সালে তিনি রিড হফম্যান ও কারেন সিমোনিয়ানের সঙ্গে ইনফ্লেকশন এআই প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করতে পারে—এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করা।
২০২৪ সালে সুলেমান মাইক্রোসফটে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি মাইক্রোসফট এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সেখানে তিনি কোপাইলটসহ মাইক্রোসফটের বিভিন্ন এআই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সুলেমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিয়মিত লেখেন ও কথা বলেন। প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর সামাজিক প্রভাব ও ঝুঁকি নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। ২০২৩ সালে প্রকাশিত তার বই ‘দ্য কামিং ওয়েভ’-এ এআইসহ নতুন প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের সমাজ ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









