কম্পিউটার ভিশন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ছবি ও দৃশ্য বিশ্লেষণের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপ প্রম্পট এআইয়ের প্রযুক্তি ও দক্ষ কর্মীদের একটি অংশ অধিগ্রহণের বিষয়ে অ্যাপল চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার প্রম্পট এআইয়ের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা এক সর্বজনীন কর্মীসভায় সম্ভাব্য এই লেনদেনের কথা কর্মীদের জানান। সভায় বলা হয়, যাঁরা অ্যাপলে যোগ দেবেন না, তাঁদের বেতন কমিয়ে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের খোলা পদগুলোতে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সিএনবিসি ওই সভার অডিও রেকর্ডিং শুনেছে।
প্রম্পট এআইয়ের কর্মীসংখ্যা মাত্র ১১। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অ্যাপলের পাশাপাশি ইলন মাস্কের এক্সএআই ও নিউরালিংকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রম্পট এআইকে অধিগ্রহণের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিল।
প্রম্পট এআই প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরই প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলারের একটি সিড বিনিয়োগ পায়। বিনিয়োগটির নেতৃত্বে ছিল এআইএক্স ও অ্যাবস্ট্রাক্ট ভেঞ্চারস। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান নির্বাহী তেতে শিয়াও এবং প্রেসিডেন্ট ট্রেভর ড্যারেল। শিয়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে পরিচিত গবেষক এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পিএইচডি করেছেন। ড্যারেল ছিলেন বার্কলি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ বা বিএআইআর ল্যাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
শিয়াও ও ড্যারেল এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেননি। অ্যাপলও কোনো মন্তব্য করেনি। এক্সএআই ও নিউরালিংকের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রম্পট এআইয়ের কর্মকর্তারা কর্মীদের আরও জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কিছু অর্থ ফেরত পাবেন, তবে তাঁদের পুরো বিনিয়োগ উঠে আসবে না। একই সঙ্গে কর্মীদের আপাতত অ্যাপলের নাম প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চাকরি খোঁজা কিংবা নিজেদের পরিস্থিতির কথা বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের জানানোর সময়ও তাঁদের বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছে।

প্রম্পট এআইয়ের প্রধান পণ্য ছিল ‘সিমোর’ নামের একটি অ্যাপ। এটি বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্যামেরাগুলোকে আরও উন্নত কিছু কাজ করার ক্ষমতা দিত। ক্যামেরার সামনে থাকা নির্দিষ্ট মানুষ, পোষা প্রাণী, অন্যান্য প্রাণী কিংবা বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত করতে পারত এই প্রযুক্তি। বাড়ির আশপাশে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটলে ব্যবহারকারীকে সতর্কবার্তা পাঠানো হতো। এমনকি ক্যামেরার সামনে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে লিখিত বর্ণনা দেওয়া বা ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও ছিল অ্যাপটির।
কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শিয়াও বলেন, প্রম্পট এআইয়ের প্রযুক্তি এবং সিমোর অ্যাপ ভালোভাবেই কাজ করছিল। সমস্যা ছিল ব্যবসায়িক মডেলে। তাই সিমোর বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যবহারকারীদের জানানো হবে, তাঁদের তথ্য মুছে ফেলা হবে এবং গোপনীয়তা সুরক্ষিত রাখা হবে।
সিলিকন ভ্যালির বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের শীর্ষ প্রতিভা নিজেদের দলে টানতে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের ‘অ্যাকুইহায়ার’ চুক্তি করছে। অর্থাৎ পুরো কোম্পানি কেনার বদলে মূলত তার দক্ষ কর্মী ও প্রযুক্তিকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এর একটি কারণ হিসেবে এআই গবেষণা ও উন্নয়নের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ এড়িয়ে চলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রম্পট এআইয়ের সঙ্গে অ্যাপলের সম্ভাব্য চুক্তির আকার অবশ্য সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় এআই চুক্তির তুলনায় অনেক ছোট। যেমন, মেটা ১৪৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিল স্কেল এআইয়ে। সেই চুক্তির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও মেটায় যোগ দেন। আবার গুগল ২৪০ কোটি ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে উইন্ডসার্ফের প্রধান নির্বাহী ও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে; ওই চুক্তিতে প্রযুক্তির লাইসেন্সিংয়ের অর্থও ছিল।
বড় অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অ্যাপল ঐতিহাসিকভাবেই বেশ সংযত। প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দীতে কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ ছিল ২০১৪ সালে বিটস ইলেকট্রনিকস কেনার জন্য প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তি। সাধারণত অ্যাপল অপেক্ষাকৃত ছোট দল ও প্রযুক্তি নীরবে অধিগ্রহণ করে এবং পরে সেগুলো নিজেদের বিভিন্ন পণ্যে নতুন সুবিধা তৈরির কাজে ব্যবহার করে।

এআই ক্ষেত্রে অ্যাপলের অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর হওয়ার একটি কারণ হিসেবে কয়েকজন বিশ্লেষক বড় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণে কোম্পানিটির অনীহাকে উল্লেখ করেছেন। চলতি বছরে অ্যাপলের শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বড় শেয়ারবাজার সূচকগুলোর তুলনায় কোম্পানিটির পারফরম্যান্স পিছিয়ে রয়েছে এবং প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
অ্যাপলের জেনারেটিভ এআই উদ্যোগ ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’ও এখন পর্যন্ত সমালোচকদের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। এর কিছু সুবিধা চালু করতেও দেরি হয়েছে। তবে কম্পিউটার ভিশনের ক্ষেত্রে অ্যাপলের প্রযুক্তিগত সাফল্য রয়েছে—বিশেষ করে মিশ্র বাস্তবতার হেডসেট ভিশন প্রোর ক্ষেত্রে। আইফোনেও এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর তোলা ছবিতে থাকা মানুষ, প্রাণী কিংবা বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত করতে পারে।
প্রম্পট এআইয়ের প্রযুক্তি ও কর্মীদের একটি অংশ অ্যাপলের স্মার্ট-হোম বা হোমকিট বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ছোট একটি স্টার্টআপের এই সম্ভাব্য অধিগ্রহণ শুধু কয়েকজন কর্মীকে অ্যাপলের দলে নেওয়ার ঘটনা নয়; বাড়ির ক্যামেরা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও এআইকে একসঙ্গে আরও বুদ্ধিমান করে তোলার অ্যাপলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গেও এটি যুক্ত হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









