মহাবিশ্বে প্রাণের সন্ধান করতে গিয়ে মানুষ সাধারণত আকাশের দিকে তাকায়। দূরের গ্রহে পানি আছে কি না, তাপমাত্রা কেমন, নক্ষত্রটি কেমন—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়। কিন্তু জীবনের রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেল পৃথিবীর গভীর অন্ধকারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির নিচে কার্লসবাড ক্যাভার্নস ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে ১১৯টি গুহা। চার থেকে ১১ মিলিয়ন বছর আগে সালফিউরিক অ্যাসিড চুনাপাথর ক্ষয় করে এসব গুহা তৈরি করে। সবচেয়ে পরিচিত কার্লসবাড ক্যাভার্নের বিশাল ‘বিগ রুম’ প্রায় ১ হাজার ২২০ মিটার লম্বা ও ১৯১ মিটার চওড়া। প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ সেখানে যান।
২০১৮ সালে গুহাবিজ্ঞানী হ্যাজেল বার্টন ও জীবাণুবিজ্ঞানী লার্স বেরেন্ডট গুহার এমন এক অংশে পৌঁছান, যেখানে সম্পূর্ণ অন্ধকার। বেরেন্ডট টর্চ জ্বালাতেই দেখা গেল, পাথরের দেয়ালজুড়ে উজ্জ্বল সবুজ অণুজীবের আস্তরণ। পরীক্ষায় জানা গেল, এগুলো সায়ানোব্যাকটেরিয়া। সাধারণত এই অণুজীব সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাবার তৈরি করে। কিন্তু গুহার ভেতরে সূর্যের আলো নেই। তারা তাহলে বেঁচে আছে কীভাবে?
গবেষকেরা দেখলেন, এসব অণুজীবের রয়েছে বিশেষ ধরনের ক্লোরোফিল—ডি ও এফ। এগুলো মানুষের চোখে অদৃশ্য নিকট-অবলোহিত আলো ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করতে পারে। সহজ করে বললে, আমরা যেখানে অন্ধকার দেখি, তাদের কাছে সেখানে প্রয়োজনীয় আলো আছে। গুহার চুনাপাথর মানুষের চোখে দেখা আলো শুষে নেয়। কিন্তু নিকট-অবলোহিত আলো তুলনামূলকভাবে সহজে ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে অন্ধকার অংশে এই আলোর ঘনত্ব গুহার প্রবেশপথের তুলনায় ৬৯৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। আর সেখানেই বিশেষ ক্লোরোফিল ব্যবহারকারী অণুজীবের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।

গবেষকেরা কার্লসবাডের অন্য গুহাগুলোতেও একই ধরনের সালোকসংশ্লেষণকারী অণুজীব পেয়েছেন। তাঁদের ধারণা, কিছু অণুজীব প্রায় ৪৯ মিলিয়ন বছর ধরে এমন সুরক্ষিত পরিবেশে থাকতে পারে।
অন্ধকারে জীবন টিকে থাকার ধারণা অবশ্য নতুন নয়। ১৮৯০ সালে সের্গেই ভিনোগ্রাদস্কি দেখিয়েছিলেন, কিছু অণুজীব সূর্যের আলো ছাড়াই রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে শক্তি পেতে পারে। ১৯৯৬ সালে হিদেয়াকি মিয়াশিতা এমন সামুদ্রিক সায়ানোব্যাকটেরিয়া আবিষ্কার করেন, যা দৃশ্যমান ও নিকট-অবলোহিত—দুই ধরনের আলো ব্যবহার করতে পারে। ২০১৮ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকেরাও ইয়েলোস্টোন ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু পাথরে এমন অণুজীব খুঁজে পান।
এই আবিষ্কার পৃথিবীর বাইরের প্রাণের সন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সাধারণত এমন গ্রহ খোঁজেন, যেখানে তরল পানি থাকতে পারে। নক্ষত্রের এমন অঞ্চলকে বলা হয় ‘গোল্ডিলকস জোন’। কিন্তু আমাদের ছায়াপথে সূর্যের মতো জি-টাইপ নক্ষত্রের চেয়ে লাল বামন বা এম-টাইপ নক্ষত্র অনেক বেশি। এসব নক্ষত্র নিকট-অবলোহিত আলো বেশি ছড়ায়।
তাহলে এমন নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা কোনো গ্রহে, মানুষের চোখে অদৃশ্য আলো ব্যবহার করে, জীবন কি টিকে থাকতে পারে আগে ধারণা ছিল, সালোকসংশ্লেষণের কার্যকর সীমা প্রায় ৭০০ ন্যানোমিটার। কার্লসবাডের অণুজীব দেখিয়েছে, ক্লোরোফিল-এফ ব্যবহার করে এই সীমা প্রায় ৭৮০ ন্যানোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দূরের গ্রহের বায়ুমণ্ডলও পরীক্ষা করতে পারে। কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মতো উপাদান পাওয়া গেলে তা জীবনের সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে, যদিও একে একা প্রমাণ বলা যায় না।
হ্যাজেল বার্টনের পরবর্তী প্রশ্ন তাই খুব সহজ: সবচেয়ে কম আলোতে এবং সবচেয়ে দীর্ঘ তরঙ্গের আলোতে জীবন সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর বদলে দিতে পারে প্রাণের সন্ধানের মানচিত্র। কারণ কার্লসবাডের অন্ধকার গুহা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা যে আলো দেখতে পাই না, তার অর্থ এই নয় যে সেখানে আলো নেই। আর আমরা যে জীবন কল্পনা করতে পারি না, তার অর্থ এই নয় যে মহাবিশ্বে তার অস্তিত্ব অসম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









