রাতে ঘুমানোর আগে ফোনটা চার্জে বসানো এখন প্রায় প্রতিদিনের অভ্যাস। সকালে বের হওয়ার আগে চার্জ কত শতাংশ আছে, সেটাও একবার দেখে নেওয়া হয়। আর বৈদ্যুতিক গাড়ি হলে উৎকণ্ঠাটা আরও বেশি—গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে যাবে না তো?
এই দুশ্চিন্তার নামই এখন ‘রেঞ্জ অ্যাংজাইটি’। কিন্তু যে ব্যাটারি আমাদের ফোন, ল্যাপটপ কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়িকে শক্তি দেয়, তার মৌলিক প্রযুক্তিতে বহু বছর ধরেই বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এবার সেই জায়গাতেই বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে চলছে নানা পরীক্ষা। লক্ষ্য—এমন ব্যাটারি তৈরি করা, যা কয়েক মিনিটেই চার্জ হবে, অনেক বেশি শক্তি ধরে রাখবে এবং বছরের পর বছর ব্যবহারের পরও খুব বেশি ক্ষমতা হারাবে না।
এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে ‘সলিড-স্টেট ব্যাটারি’।
আজকের বেশির ভাগ ব্যাটারির ভেতরে এমন এক তরল পদার্থ থাকে, যার মধ্য দিয়ে ব্যাটারির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চার্জ বহনকারী ক্ষুদ্র কণা চলাচল করে। সলিড-স্টেট ব্যাটারিতে সেই তরলের বদলে ব্যবহার করা হয় কঠিন পদার্থ—সিরামিক, কাচ বা বিশেষ ধরনের পলিমার। শুনতে সামান্য পরিবর্তন মনে হলেও এর প্রভাব বড় হতে পারে।
প্রথমত, একই আকারের ব্যাটারিতে আরও বেশি শক্তি রাখা সম্ভব। এটাকেই বলা হয় ‘এনার্জি ডেনসিটি’ বা শক্তি ধারণের ঘনত্ব। বর্তমানের উন্নত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে এই হার প্রায় ৩০০ ওয়াট-ঘণ্টা প্রতি কেজি। নতুন সলিড-স্টেট ব্যাটারির লক্ষ্য ৩৫০-এর বেশি; পরীক্ষাগারে তৈরি কিছু নমুনা ৫০০ ওয়াট-ঘণ্টা প্রতি কেজির কাছাকাছিও পৌঁছেছে।
সহজ করে বললে, একই ওজনের ব্যাটারি যদি বেশি শক্তি ধরে রাখতে পারে, তাহলে বৈদ্যুতিক গাড়ি একবার চার্জে আরও বেশি দূর যেতে পারবে। মোবাইল ফোনও হয়তো বারবার চার্জে বসাতে হবে না।
নিরাপত্তার দিক থেকেও সুবিধা আছে। বর্তমান ব্যাটারির ভেতরের তরল উপাদান দাহ্য। সেটি বাদ দিতে পারলে আগুন লাগার ঝুঁকি কমতে পারে। পাশাপাশি সলিড-স্টেট ব্যাটারি তুলনামূলক ধীরে ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু হিসাব বলছে, কয়েক দশক ব্যবহারের পরও এগুলো তাদের মূল ক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ ধরে রাখতে পারে।
তবে ব্যবহারকারীর কাছে হয়তো সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হবে চার্জ দেওয়ার সময়।
একটি ব্যাটারি যদি অনেকক্ষণ চলে, সেটি ভালো। কিন্তু যদি কয়েক মিনিটেই চার্জ হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘ ব্যাটারি জীবনের প্রয়োজনীয়তাও অনেকটা কমে যায়। নতুন ব্যাটারির নকশায় লিথিয়াম-মেটাল অ্যানোডের মতো আরও কার্যকর উপাদান ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে দ্রুত চার্জ দেওয়া সম্ভব হতে পারে, আবার ব্যাটারিও তুলনামূলক কম ক্ষয় হবে।
ফলে ভবিষ্যতে এমন ফোন দেখা যেতে পারে, যা পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে পুরোপুরি চার্জ হয়ে যাবে।

গাড়ির ক্ষেত্রেও পরীক্ষা চলছে। টয়োটা জানিয়েছে, ২০২৭ সালের দিকে তারা এমন ব্যাটারি বাজারে আনার লক্ষ্য রাখছে, যা একবার চার্জে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার চলতে পারবে এবং মাত্র ১০ মিনিটে পুরো চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা থাকবে। স্যামসাংও এমন একটি ব্যাটারি দেখিয়েছে, যা প্রায় ৯ মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ নিতে পারে এবং দীর্ঘ পথ চলার ক্ষমতা দিতে পারে। এলজি ও বিভিন্ন স্টার্টআপও এই প্রতিযোগিতায় আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি প্রযুক্তিটি এত ভালো হয়, তাহলে এখনো আমাদের গাড়ি বা ফোনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না কেন? কারণ ব্যাটারির ভেতরে একটি ছোট কিন্তু বড় সমস্যা আছে। ভাবুন, দুটি দেয়াল টেপ দিয়ে জোড়া লাগাতে হবে। কিন্তু একটি দেয়ালের গায়ে যদি অসংখ্য ক্ষুদ্র বালুকণা লেগে থাকে, তাহলে টেপ যতই চাপ দিয়ে লাগানো হোক, কোথাও না কোথাও ফাঁক থেকে যাবে। ফলে টেপ ঠিকমতো আটকে থাকবে না।
সলিড-স্টেট ব্যাটারির সমস্যাটাও অনেকটা এমন। বর্তমান ব্যাটারির ভেতরের তরল উপাদানটি দুই অংশের মাঝের জায়গা পূরণ করে নেয়। পৃষ্ঠ খানিকটা অসমান হলেও তরল সেখানে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কঠিন পদার্থ তা পারে না। ব্যাটারির ভেতরের দুই অংশকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখলে সেগুলো আসলে পুরোপুরি মসৃণ নয়। ফলে কঠিন পদার্থ ও সেই পৃষ্ঠের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র ফাঁক তৈরি হতে পারে। এতে শক্তি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, ব্যাটারি কম দক্ষ হয়ে পড়ে এবং দ্রুত ক্ষয় হতে পারে।
এই সমস্যার সমাধানেই এখন গবেষণার বড় অংশ ব্যস্ত। সলিড-স্টেট প্রযুক্তি পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই ব্যাটারিতে আরও কিছু পরিবর্তন আসছে। নতুন ধরনের উপাদান ব্যবহার করে ব্যাটারির ভেতরে চার্জ চলাচল আরও সহজ করার চেষ্টা চলছে। প্যানাসনিক এমন পরীক্ষামূলক ব্যাটারি তৈরি করেছে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ হতে মাত্র তিন মিনিট সময় নেয়।
ব্যাটারির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। কারণ অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা—দুই অবস্থাই ব্যাটারির জন্য ক্ষতিকর। আধুনিক ব্যাটারিতে থাকা ‘ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা বিএমএস এখন নানা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাপমাত্রা, চার্জের গতি ও ব্যাটারির ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে প্রতিবার চার্জে ব্যাটারির ক্ষমতা আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। আরেকটি সম্ভাবনাময় উপাদান হলো ‘সিলিকন’। ব্যাটারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সিলিকন ব্যবহার করে আরও বেশি শক্তি জমা রাখার চেষ্টা চলছে।
ব্যাটারির পরিবেশগত দিক নিয়েও কাজ হচ্ছে। গবেষকেরা সূর্যমুখীর বীজের খোসার মতো জৈব বর্জ্য ব্যবহার করেও ব্যাটারি তৈরির পরীক্ষা করেছেন। কিছু পরীক্ষামূলক ব্যাটারি ১ হাজারবার পর্যন্ত চার্জ নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এর মধ্যে আরও অদ্ভুত একটি ধারণা সামনে এসেছে—‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা এমন একটি কার্যকর পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছেন, যা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নীতি ব্যবহার করে শক্তি জমা রাখতে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে ছাড়তে পারে। সাধারণ ব্যাটারি বড় হলে অনেক সময় দক্ষতা কমে যায়। কোয়ান্টাম ব্যাটারির ক্ষেত্রে ধারণাটি উল্টো—আকার বাড়লে এর কর্মক্ষমতাও বাড়তে পারে।
এখানে কোয়ান্টাম জগতের ‘সুপারপজিশন’ ও ‘এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’-এর মতো অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে খুব দ্রুত, এমনকি দূর থেকে তার ছাড়াই ব্যাটারি চার্জ করার সম্ভাবনাও দেখা হচ্ছে। তবে এটি এখনো গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে। তাহলে এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের হাতে কবে আসবে?
বাস্তবসম্মত হিসাব বলছে, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম বাণিজ্যিক সলিড-স্টেট ব্যাটারি বৈদ্যুতিক গাড়িতে দেখা যেতে পারে। শুরুতে এগুলো সম্ভবত দামি গাড়িতেই থাকবে। কারণ নতুন প্রযুক্তির উৎপাদন খরচ বেশি। পরে উৎপাদন বাড়লে দাম কমতে পারে।
মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ছোট যন্ত্রে এই প্রযুক্তি পৌঁছাতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে। ছোট আকারে ব্যাটারি বানানো, খরচ কমানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে।
তবে পরিবর্তনের দিকটি স্পষ্ট। এত দিন ব্যাটারির উন্নতি হয়েছে ধীরে ধীরে—একটু বেশি চার্জ, একটু বেশি ব্যাকআপ, একটু দ্রুত চার্জ। সামনে হয়তো সেই গতিটাই বদলে যাবে। একদিন বৈদ্যুতিক গাড়িতে পেট্রল ভরার মতো সময়েই চার্জ নেওয়া সম্ভব হতে পারে। ফোন হয়তো একবার চার্জ দিয়ে কয়েক দিন চলবে। আর আরও দূরের ভবিষ্যতে এমন যন্ত্রও আসতে পারে, যেগুলো ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোনো তার ছাড়াই চার্জ নেবে। ব্যাটারির এই বিপ্লব তাই শুধু ব্যাটারির গল্প নয়। এটি বদলে দিতে পারে আমরা কীভাবে গাড়ি চালাই, ফোন ব্যবহার করি, ভ্রমণ করি—এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভ্যাসও।
চার্জার খুঁজে বেড়ানোর দিন হয়তো একদিন সত্যিই শেষ হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









