চাঁদে ঘুরে আসার পর এবার পৃথিবীতেই চাঁদের আদলে একটি শহর গড়ে তোলার প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। স্পেনের মাদ্রিদে পরিকল্পিত এই শহরে থাকতে পারে ১২ হাজার বিলাসবহুল আবাসন, হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিপণিবিতান ও বিনোদনকেন্দ্র। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। তবে এখনো মেলেনি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকারী।
চাঁদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যার হয়েছে, তিনি এবার পৃথিবীতেই চাঁদের একটি সংস্করণ তৈরি করতে চান। কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের নতুন উদ্যোগ এমনই এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যার নাম ‘মুন’। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেখানে তৈরি হবে বিশাল এক কৃত্রিম চাঁদ। সেটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে আবাসিক এলাকা, হোটেল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিপণিবিতান ও বিনোদনকেন্দ্র নিয়ে একটি আধুনিক শহর।
২০২৬ সালের এপ্রিলে নাসার আর্টেমিস-২ অভিযানে অংশ নিয়ে চাঁদের চারপাশে ঘুরে আসেন হ্যানসেন। তিনিই প্রথম অ-মার্কিন নভোচারী হিসেবে এই অভিযানে চাঁদের কক্ষপথে যাওয়ার ইতিহাস গড়েন। সেই অভিজ্ঞতার মাত্র ছয় মাস পর তিনি যুক্ত হয়েছেন কানাডার প্রতিষ্ঠান মুন ওয়ার্ল্ড রিসোর্টসের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি চাঁদের বিশাল প্রতিরূপ এবং তাকে ঘিরে একটি পর্যটন, আবাসন ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে চায়।
অটোয়া থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সংবাদমাধ্যম এল পাইসকে হ্যানসেন বলেন, ‘এই প্রকল্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা একটি মহাকাশ অভিযানের মতোই। এটি অসাধারণ কিছু হতে যাচ্ছে।’

হ্যানসেনের ভাষায়, মানুষ এখানে বিশাল এক চাঁদের দৃশ্যের সামনে বসবাস, কাজ ও বিনোদনের সুযোগ পাবে। প্রকল্পের কৃত্রিম চাঁদের ভেতরে তৈরি করা হবে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে দর্শনার্থীরা চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটার অভিজ্ঞতা পাবেন। প্রায় ১০টি ফুটবল মাঠের সমান জায়গাজুড়ে থাকবে এই অভিজ্ঞতার আয়োজন। উদ্যোক্তাদের দাবি, চাঁদের বাস্তব পরিবেশের যতটা সম্ভব কাছাকাছি একটি কৃত্রিম চন্দ্রভূমি তৈরি করা হবে। পর্যটনের পাশাপাশি সেখানে নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করার সুযোগও থাকবে।
নভোচারী থেকে চাঁদের শহরের দূত
হ্যানসেনের মহাকাশ-অভিজ্ঞতা এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ। ৫০ বছর বয়সী এই নভোচারী ও পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজের পাইলট ৩২ বছর কানাডার বিমানবাহিনীর রিজার্ভে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সেই দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। এর আগে ১৭ বছর কাজ করেছেন কানাডার মহাকাশ সংস্থায়।
এখন তিনি মুন ওয়ার্ল্ড রিসোর্টসের উপদেষ্টা, পরামর্শক বোর্ডের সদস্য এবং প্রকল্পটির দূত হিসেবে কাজ করবেন। তার দায়িত্বের মধ্যে থাকবে চাঁদের পৃষ্ঠের অনুকরণে তৈরি অভিজ্ঞতা ও কৃত্রিম চন্দ্রঘাঁটির পরিকল্পনা, নভোচারী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, মহাকাশ পর্যটন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি ও মহাকাশশিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
একই সময়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তাঁকে মহাকাশবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবেও নিয়োগ দিয়েছেন। কানাডাকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়া এবং নতুন চন্দ্র অর্থনীতিতে দেশটির অংশগ্রহণ বাড়ানো এই দায়িত্বের অন্যতম লক্ষ্য।
হ্যানসেন অবশ্য জানিয়েছেন, মুন প্রকল্পে তার ভূমিকা ব্যক্তিগত পর্যায়ে। এই কাজের জন্য তিনি পারিশ্রমিক পাবেন, যদিও কত অর্থ পাবেন তা প্রকাশ করেননি। তার মতে, প্রকল্পটির পেছনে দক্ষ একটি দল কাজ করছে। প্রকৌশলগত দিক থেকেও পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে হয়েছে তার।
১২ হাজার বাড়ি, ২৪টি টাওয়ার
মুন প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছেন কানাডাভিত্তিক দুই উদ্যোক্তা সান্দ্রা ম্যাথিউস ও মাইকেল হেন্ডারসন। ম্যাথিউস প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি এবং হেন্ডারসন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
ম্যাথিউসের ভাষায়, এটি কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; বরং ভবিষ্যতের একটি ‘স্মার্ট সিটি’ বা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নগরীর নকশা। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ইউরোতে প্রায় ৪৪০ কোটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শহরটিতে ২৪টি সুউচ্চ ভবনে থাকবে প্রায় ১২ হাজার বিলাসবহুল আবাসন। পাশাপাশি থাকবে হোটেল, বিপণিবিতান, পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা বিনোদনকেন্দ্র। বাসিন্দারা চাইলে এমন অ্যাপার্টমেন্টেও থাকতে পারবেন, যেখান থেকে দেখা যাবে বিশাল কৃত্রিম চাঁদ।
তবে এই শহরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হবে চাঁদের প্রতিরূপ। সেখানে দর্শনার্থীরা চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটার মতো অভিজ্ঞতা পাবেন। ৯০ মিনিটের এই অভিজ্ঞতার জন্য টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ৫০০ ডলার। হোটেলের ভাড়াও হবে পাঁচ তারকা হোটেলের সমপর্যায়ের। কৃত্রিম চাঁদের নিচের অংশে থাকবে দোকানপাট, সম্মেলনকেন্দ্র, কনসার্ট আয়োজনের জায়গা এবং সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণা ও সেবাকেন্দ্র। সব মিলিয়ে এটি হবে পর্যটন, আবাসন, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনোদনের সমন্বয়ে তৈরি একটি বিশাল নগর প্রকল্প।
উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, শহরটিতে বছরে প্রায় এক কোটি পর্যটক আসতে পারবেন। থাকবে চার হাজার হোটেলকক্ষ এবং মোট ২২ লাখ বর্গমিটার নির্মিত স্থাপনা।
মাদ্রিদ কেন?
প্রকল্পটির সম্ভাব্য স্থান হিসেবে স্পেনকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে মাদ্রিদকে তারা বিনিয়োগকারীদের সামনে পরিকল্পনাটি তুলে ধরার জন্য আদর্শ জায়গা মনে করছেন। মাদ্রিদে একটি প্রদর্শনীকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে প্রকল্পের পূর্ণ আকারের কিছু নমুনা, স্থাপত্য নকশা, ত্রিমাত্রিক মডেল এবং ভার্চ্যুয়াল ট্যুরের ব্যবস্থা থাকবে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা এসব দেখে বুঝতে পারবেন, বাস্তবে শহরটি কেমন হতে পারে।
মাদ্রিদই যে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির নির্মাণস্থল হবে, তা অবশ্য নিশ্চিত নয়। সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া ও বার্সেলোনাকেও সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত স্পেনের কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। মুন ওয়ার্ল্ড রিসোর্টসের ওয়েবসাইটে ১২টি দেশের ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের নাম অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরামর্শক, বিমা, পরিবহন ও শরীরচর্চাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা ইতিমধ্যে কয়েক মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছেন। তবে সুনির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ জানাননি ম্যাথিউস। আগামী আট মাসের মধ্যে নকশা তৈরির কাজ শেষ করতে আরও অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে তাদের।এরপর একটি উপযুক্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রথম কৃত্রিম চাঁদের শহর নির্মাণের স্বত্ব বিক্রি বা লাইসেন্স দেওয়া হবে। নির্মাণের দায়িত্ব নেবে সেই প্রতিষ্ঠান। উদ্যোক্তাদের ধারণা, নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রায় পাঁচ বছর লাগতে পারে।
তাদের পরিকল্পনা শুধু একটি শহর তৈরি করেই থেমে থাকবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন ১০টি শহর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। ম্যাথিউস উদাহরণ হিসেবে লেখক জে কে রাওলিংয়ের কথা বলেছেন। হ্যারি পটার বইয়ের স্বত্ব থেকে চলচ্চিত্র ও থিম পার্ক তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। একইভাবে মুন প্রকল্পের নকশা ও ধারণার স্বত্ব একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হবে। তবে তাঁর দাবি, এটি কোনো থিম পার্ক নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ নগর প্রকল্প।
দুই দশকের পুরোনো স্বপ্ন
মুন প্রকল্পের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। এর দুই প্রতিষ্ঠাতা ২০০০ সালেই প্রথম এমন একটি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তখনকার নকশা ও সম্ভাব্য ব্যয়ও অনেকটা বর্তমান পরিকল্পনার মতোই ছিল।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। তখন পরিকল্পিত কৃত্রিম চাঁদের ব্যাস ছিল ২৭১ মিটার। আকারের দিক থেকে এটি লাস ভেগাসের বিখ্যাত স্পিয়ার ভবনের প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি। এরপর ২০০৪ সালে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপে প্রকল্পটি তৈরির কথা ভাবা হয়। ২০১৬ সালে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা ভ্যালিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। সম্প্রতি আবুধাবিকেও সম্ভাব্য স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন উদ্যোক্তারা। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে মাদ্রিদ। তবে আগের জায়গাগুলোর মতো এখানেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ভবিষ্যতের শহর, নাকি কেবল উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন?
বিশ্বের অনেক শহরেই এখন আবাসনসংকট, জনসংখ্যার চাপ ও পরিবেশগত সমস্যা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নতুনভাবে একটি শহর তৈরির ধারণা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু একটি বিশাল কৃত্রিম চাঁদ নির্মাণ, তার চারপাশে ১২ হাজার বাড়ি তৈরি এবং বছরে এক কোটি পর্যটক আকর্ষণ করা—সবই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল কাজ।
এ ধরনের প্রকল্পের জন্য শুধু অর্থ থাকলেই হয় না। প্রয়োজন উন্নত প্রকৌশল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশগত বিবেচনা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ। সবচেয়ে বড় কথা, পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিও প্রমাণ করতে হবে। অটোয়া থেকে হ্যানসেন অবশ্য আশাবাদী। তার মতে, এই মুহূর্তে প্রকল্পটি বুঝতে হলে দূরদর্শী হতে হবে। কারণ এত বড় কিছু কল্পনা করার জন্যও কল্পনাশক্তি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘এখন শুধু স্বপ্নদর্শীদেরই স্বাগত জানানো হচ্ছে। কারণ এত বিশাল একটি প্রকল্প কল্পনা করতে হলে আপনাকে স্বপ্নদর্শী হতে হবে। কিন্তু যে পৃথিবীতে আরও বেশি আবাসন ও নতুন নির্মাণ প্রয়োজন, সেখানে এটি মানুষের বসবাসের নতুন ধরনের একটি মডেল হতে পারে। আর এমন শহর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ১০টি পর্যন্ত গড়ে উঠতে পারে।’
চাঁদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে পৃথিবীতে চাঁদের শহর তৈরির স্বপ্ন—ভাবনাটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। তবে স্বপ্ন আর বাস্তব নির্মাণের মধ্যে যে দীর্ঘ পথ, মুন প্রকল্পকে এখন সেই পথই পাড়ি দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









