১৯৪৩ সালের এপ্রিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়। সুইজারল্যান্ডের শান্ত শহর বাসেলে এক রসায়নবিদ তার গবেষণাগারে ব্যস্ত ছিলেন একেবারেই নিয়মিত কাজে। কিন্তু সেই দিনের একটি ঘটনাই পরবর্তীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সংস্কৃতি সবকিছুকে নাড়িয়ে দেবে, এ কথা তখন কে জানত?
ড. আলবার্ট হফম্যান, পেশায় একজন সুইস রসায়নবিদ, কাজ করছিলেন এরগট নামের এক ছত্রাক নিয়ে, যা থেকে ওষুধ তৈরি করে প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ বন্ধের উপায় খোঁজা হচ্ছিল। এই গবেষণার অংশ হিসেবেই তিনি তৈরি করেছিলেন এক রাসায়নিক যৌগ, লাইসারজিক অ্যাসিড ডাইইথাইলামাইড, সংক্ষেপে এলএসডি। প্রথমে এটি ছিল শুধুই একটি পরীক্ষামূলক পদার্থ।
কিন্তু ১৬ এপ্রিল ১৯৪৩-এ ঘটে অদ্ভুত এক ঘটনা। গবেষণার সময় অজান্তেই সামান্য পরিমাণ এলএসডি তার শরীরে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অনুভব করতে থাকেন এক অচেনা মানসিক অবস্থা। স্বপ্নময়, রহস্যময়, যেন প্রকৃতির সঙ্গে গভীর একাত্মতা। এই অভিজ্ঞতা তাকে বিস্মিত করে, আবার কৌতূহলীও করে তোলে।
তিন দিন পর, ১৯ এপ্রিল তিনি সচেতনভাবে খুব অল্প মাত্রায় এলএসডি গ্রহণ করেন- মাত্র ০.২৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু যা তিনি সামান্য ভেবেছিলেন, সেটিই হয়ে ওঠে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরে অস্বস্তি শুরু হয়। তিনি সাইকেলে চড়ে বাসার দিকে রওনা দেন, আর সেই যাত্রাই ইতিহাসে জায়গা করে নেয় 'বাইসাইকেল ডে' হিসেবে।
ফিরতি পথে তার দৃষ্টিতে শুরু হয় ভয়াবহ বিকৃতি। চারপাশ যেন রঙ বদলাতে থাকে, আকৃতি বিকৃত হয়ে যায়, বাস্তবতা ভেঙে পড়ে। বাসায় পৌঁছে তার মনে হয়, তিনি যেন উন্মাদ হয়ে গেছেন। ঘরের চেয়ারও তার কাছে জীবন্ত বলে মনে হচ্ছিল। এমনকি এক প্রতিবেশী, যিনি তাকে দুধ দিতে এসেছিলেন, তাকেও তার কাছে মনে হয়েছিল ডাইনি।
এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা প্রায় ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়। পরে ধীরে ধীরে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন। তবে এই 'ভয়ঙ্কর' অভিজ্ঞতাই ছিল এক নতুন যুগের সূচনা।
পরবর্তীতে হফম্যান বুঝতে পারেন, এলএসডি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সাইকেডেলিক পদার্থ। সামান্য পরিমাণই মানুষের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তার কর্মস্থল স্যান্ডোজ কোম্পানি এটি 'ডেলিসিড' নামে মনোরোগ চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার শুরু করে। অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মনে করতেন, এটি মানুষের অবচেতন মনে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
তবে খুব দ্রুতই এই পদার্থ গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের হাতে। ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এলএসডি হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অংশ। লেখক, শিল্পী, তরুণ সমাজ- অনেকে এটিকে 'চেতনা প্রসারের' মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু এর সঙ্গে বাড়তে থাকে 'ব্যাড ট্রিপ' ভয়, আতঙ্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষতির ঝুঁকিও।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ এলএসডিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে। বর্তমানে প্রায় সব দেশেই এটি অবৈধ, যদিও সীমিত গবেষণার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
ড. হফম্যান নিজে কখনো তার আবিষ্কারকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি মনে করতেন, সঠিক পরিবেশ ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন- এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি পদার্থ, যার ব্যবহার হতে হবে দায়িত্বশীল ও সচেতনভাবে।
২০০৮ সালে ১০২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, এলএসডি তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি দিয়েছে- 'বাস্তবতা একটিমাত্র নয়, এর বহু মাত্রা রয়েছে।'
আজও ১৯ এপ্রিল বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে 'বাইসাইকেল ডে' পালিত হয় একটি অদ্ভুত সাইকেল যাত্রার স্মরণে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









