পাঁচ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর দেশে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের ‘যুদ্ধ’কে। শ্বেতপত্র কমিটি এবং ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা) অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। এই বিশাল অংকের অর্থ যা দেশের কয়েক বছরের জাতীয় বাজেটের সমান।
‘অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র কমিটি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯-২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এই পাচারের সিংহভাগই হয়েছে ব্যাংক লুটপাট, বড় বড় সরকারি প্রকল্পের আড়ালে দুর্নীতি এবং আমদানি-রপ্তানিতে ‘ওভার-ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে। এই টাকা ফিরিয়ে আনতে সরকার এখন বিশ্বব্যাপী এক সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। এখন এ অভিযান শুধু ঘরোয়া তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই এবং কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লষ্টিরা বলছেন, এই টাকা ফরেত আনতে কত দিন, মাস, বছর লাগে তা বলা যাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচার হওয়া অর্থের সিংহভাগই পাঁচটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পাড়ি জমিয়েছে। পাচারকৃত অর্থের সবচেয়ে নিরাপদ স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে লন্ডন। সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ অনেক প্রভাবশালীর শত শত বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের সন্ধান মিলেছে সেখানে। এরপর দিতীয় স্থান-সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই)। সেখানে রিয়েল এস্টেট খাতে গোল্ডেন ভিসার আড়ালে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এরপর আমেরিকা ও কানাডার অবস্থান। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এবং টরন্টোর ‘বেগম পাড়ায়’ বাংলাদেশি মালিকানাধীন সম্পদের পরিমাণ এখন গোয়েন্দা সংস্থার নখদর্পণে। এরপর সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের অবস্থান। এ দুটি দেশ মূলত ব্যাংকিং চ্যানেল এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ লুকাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
জানা যায়, ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়, তার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে মাত্র গুটি কয়েক পরিবার এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। সরকার বর্তমানে এই ৩০ ব্যক্তিকে ‘প্রাইমারি টার্গেট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা হলেন- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। লন্ডনে তার ৩৬০টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য ইতোমধ্যে প্রমাণিত। এরপর সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। আমেরিকায় তার ‘রিয়েল এস্টেট’ সাম্রাজ্য ও সিঙ্গাপুরে পাওয়ার সেক্টরের কমিশনের টাকা পাচারের অভিযোগ। এরপর সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক অফশোর কোম্পানি। এরপর সাবেক অর্থমন্ত্রী ও তার ঘনিষ্ঠ বৃত্ত। পলিসি মেকিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যাংকের টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপ (সাইফুল আলম ও তার পরিবার)- সিঙ্গাপুর ও সাইপ্রাসে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি পাচারের অকাট্য প্রমাণ আছে। বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধাররা সালমান এফ রহমান। ঋণের নামে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বিদেশে পাচারের অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। এরপর সামিট গ্রুপের কর্ণধার আজিজ খান গং। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বিশাল অংকের লভ্যাংশ পাচারের অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। নাসা গ্রুপ ও এসএ গ্রুপের বিরুদ্ধে তৈরি পোশাক খাতের আড়ালে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে আরো আছেন- চৌধুরী নাফিজ সারাফাত এবং বড় বড় ব্যাংকের ৫ সাবেক চেয়ারম্যান।
জানা গেছে, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী ছাড়া অর্থ পাচারে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা হলেন- সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবার। দুবাই ও আমেরিকায় রিসোর্ট ও সম্পদ গড়ার অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। এরপর আছেন সাবেক এনবিআর সদস্য মতিউর রহমান। ছাগলকাণ্ডে আলোচিত এই কর্মকর্তার আমেরিকা ও মালয়েশিয়ায় কয়েকশ কোটি টাকা সম্পদের হদিস মিলেছে। এরপর সাবেক সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা- তারা মূলত পাচারের ‘সিস্টেম’ দিতেন এবং বিনিময়ে কমিশন বিদেশে নিতেন। বাকি ৭ জন কাস্টমস, ভ্যাট এবং সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই তালিকায় আছেন; যাদের সন্তানদের নামে বিদেশে সম্পদের পাহাড়ের খোঁজ মিলেছে।
টাকা পাচারের কৌশল
ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং: আমদানিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি দেখিয়ে অতিরিক্ত ডলার বিদেশে পাঠানো হতো। রপ্তানির সময় দাম কম দেখিয়ে বাকি টাকা অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হতো। অফশোর কোম্পানি ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি: বিদেশের কোনো ট্যাক্স হ্যাভেন দেশে (যেমন পানামা বা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড) কাগজী কোম্পানি খুলে সেই কোম্পানির সঙ্গে ভুয়া ব্যবসা দেখিয়ে এলসির মাধ্যমে টাকা পাচার। ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি: গত ৫ বছরে বড় অংকের টাকা পাচারে ব্যবহৃত হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি। হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে দেশে টাকা দিয়ে দুবাই বা সিঙ্গাপুরে ইউএসডিটি বা বিটকয়েন বুঝে নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে টাস্কফোর্সের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা এই ৩০ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ব্লু এবং রেড নোটিশ জারি করেছি। সমস্যা হলো, এদের অনেকে এখন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট কিনে নিয়েছেন। ফলে তাদের সরাসরি ধরে আনা কঠিন, তবে তাদের সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় ফ্রিজ করা হচ্ছে।’
এদিকে অর্থ পাচার বিরোধী লড়াইকে ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ১০ সদস্যের আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এ টাস্কফোর্সের অধীন কাজ করছে- বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি (ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর প্রধান কাজ হলো বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করা, মালিকানা প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে তা জব্দ করে দেশে ফিরিয়ে আনা।
নেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক সহায়তা। এফবিআই ও এগমন্ট গ্রুপের ভূমিকা পাচারকারীরা অর্থ লেনদেনে এতটাই ধূর্ততা অবলম্বন করেছে, দেশীয় তদন্তে তা ধরা সম্ভব নয়। তাই সরকার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইন্টারপোলের সরাসরি সহায়তা নিচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ১৪৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত এগমন্ট গ্রুপের সদস্য। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোনো দেশে থাকা সন্দেহজনক ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২১টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে থাকা অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার প্রাথমিক অনুমতি পাওয়া গেছে।
আইনি সংস্কারে পাচারকারীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে নিজেকেই। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর এক ঐতিহাসিক সংশোধনী আনতে যাচ্ছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে, তার অর্জিত সম্পদ বৈধ। যদি তিনি আয়ের উৎস প্রমাণে ব্যর্থ হন, আদালত সরাসরি সেই সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিতে পারবে। এ ছাড়া পাচার সংক্রান্ত মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হচ্ছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় প্রদান বাধ্যতামূলক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো একটি দীর্ঘপ্রক্রিয়া। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়; কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে। আমরা ইতোমধ্যে অনেক সাফল্য পেয়েছি। লন্ডনে আইনি লড়াইয়ে আমাদের বিজয় হয়েছে, যার ফলে এস আলম ও অন্যান্য গ্রুপের পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত হয়েছে। আমরা আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলোকে নিয়োগ দিয়েছি যারা প্রতিটি ডলারের পিছু নিচ্ছে।
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে অর্থ-উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে যেন কেউ টাকা পাচার করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। আমরা আইনি কাঠামো এমনভাবে সাজাচ্ছি যাতে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই পাচারকারীদের রক্ষা করতে না পারে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, গত সরকারের আমলে অনেক ভৌত অবকাঠামো হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, বিদেশী ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, রিজার্ভের পতনসহ আর্থিক অনেক সূচকে ক্ষয় হয়েছে। ঋণ জালিয়াতির অর্থের বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও মনে করে বিভিন্ন মহল। এতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়। সে সময় অর্থ পাচার ও ব্যাংক খাতের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণে দীর্ঘ সময় লাগবে।
শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিগত ১৫ বছরে যেভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট চালানো হয়েছে, তা রক্ত হিম করার মতো ঘটনা। এটি বিশ্বের ইতিহাসে একক কোনো দেশ থেকে সবচাইতে বড় অর্থ পাচারের ঘটনা। এই টাকা ফেরানো অর্থনৈতিক কাজ নয়, এটি নৈতিকতার পুনরুদ্ধারও বটে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









