রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

চ্যালেঞ্জের মসনদে তারেক

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম

আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

চ্যালেঞ্জের মসনদে তারেক

সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্ক‍ুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ভোট-পরবর্তী নতুন সরকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। অবশ্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে সমস্যা সমাধানে কাজের ক্ষেত্রে নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিতে পারবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর মব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ এবং এটি করতে যে রাষ্ট্র বা সরকারের সক্ষমতা আছে, প্রাথমিকভাবে তা প্রমাণই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যু ছাড়াও ভারতের সাথে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক চাপ সামলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নেয়াটাই নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, নতুন সরকারের সামনে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সাথে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে ভিন্নতাটা তুলে ধরে জনমনে আস্থা অর্জন করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কর্তৃত্ববাদ পরবর্তী সময়ে মবসহ আইন-শৃঙ্খলার যে অবস্থা তৈরি হয়েছে সেই বিবেচনায় আইন-শৃঙ্খলা ঠিক করা এবং রাষ্ট্র ও সরকার যে তা করতে সক্ষম সে আস্থা জনমনে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ তাদের থাকবে। ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন সরকারকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আওয়ামী লীগের নিজের পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, পুলিশ, সচিবালয়সহ কোথাও কোনো চেইন অব কমান্ড ছিল না। এ বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তিটাই হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন জায়গায় কিছু ব্যক্তি দানব হয়ে উঠেছে এবং তারা যা খুশি করছে। দেখার বিষয় হবে নতুন সরকার কিভাবে এটি মোকাবিলা করে। তিনি আরো বলেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হবে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রভাবশালী কিছু দেশ যেভাবে চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে নতুন সরকারকে সেটিও সামলাতে হবে। স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্যকে সচল এবং পুরোপুরি বিশৃঙ্খল শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারকে নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।

জানা গেছে, বেসরকারিভাবে ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯ আসনে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। এনসিপি ছয়টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এই তিনটি দলই ১১ দলীয় জোটে আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি করে আসন পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস। এ ছাড়া সাতটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অর্থঋণ মামলায় হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের দুটি আসনের ফলাফল গেজেটভুক্ত করা হবে না বলে ইসি সচিব জানান। তবে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে বিএনপির সরওয়ার আলমগীর ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন থেকে বিএনপির আসলাম চৌধুরী বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় ওই আসনের ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। 

দু-একদিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের হাল ধরবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। সেই সরকারের সামনে থাকছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। জানা গেছে, সরকারের সামনে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো- আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপণ্য মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন-কাঠামো বাস্তবায়ন, এলডিসি উত্তরণে সময় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। 

এ ছাড়া আছে বিনিময় হার ধরে রাখতে রিজার্ভ বাড়ানো, রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো। অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে- ঋণের চাপ সামাল দেয়া, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো। এ ছাড়া তথ্য–উপাত্তের স্বচ্ছতা আনা ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জিং বিষয়ে হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দেয়া ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ ৯ প্রতিশ্রুতি রক্ষাও হবে আরো বড় চ্যালেঞ্জ। বদলে যাওয়া বাংলাদেশে বিপুল প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে তরী বাইতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবিলা করতে হবে নতুন সরকারকে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা। 

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে দ্রুত ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নে দাবি জানিয়ে আসছেন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। উপদেষ্টারা জানান, পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে নতুন সরকার। এ অবস্থায় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে যথাসময় পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এখন সরকার গঠনের পর সেই দাবি জোরালো করবে সরকারি কর্মচারীরা। দাবি বাস্তবায়ন না করলে সরকারি কর্মচারীদের অসহযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে নতুন সরকারকে। 

বিএনপি এর আগে সবশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্ক‍ুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। ফলে দীর্ঘ ২০ বছর পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। 

বিগত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান এবং ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তারেক রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসনে জয়ের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবেই সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছে। তাই সরকার গঠন করতে আর কোনো বাধা নেই। 

ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল যখন গণতান্ত্রিক উত্তরণে চূড়ান্ত সোপানে, তখন পরবর্তী সরকার অর্থনীতির বন্ধুর পথ কেমন করে পাড়ি দেবে, সেই আলোচনা ঘুরে-ফিরে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রলেপ দেয়ার আওয়াজ তুললেও সেখানে সফলতার পাল্লা ভারী হওয়ার বদলে ব্যর্থতাই উঁকিঝুঁকি সব খাতে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ‘দুঃশাসনের’ পাতা উল্টে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর তাগিদ যেমন নতুন সরকারের ওপর থাকবে, তেমনি দুর্নীতি আর ভুল নীতির নির্মম শিকার অর্থনীতিকে সুস্থ করে তুলতে যথাযথ দাওয়াই ও শুশ্রূষার দরকার হবে। এমন বাস্তবতায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থিতু হওয়ার আগেই নতুন সরকার বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়বে বলে মত বিশ্লেষকদের।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.