দেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র জাতীয় সংসদ। সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনে জনপ্রতিনিধিদের পরস্পরবিরোধী উসকানিমূলক মন্তব্য ও অশোভন ভঙ্গি ছাড়িয়ে যাচ্ছে সংসদীয় শিষ্টাচারের সীমা। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শীর্ষ নেতাদের এমন মারমুখী অবস্থান কেবল সংসদেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। নেতাদের সন্তুষ্ট করতে এবং তাদের ‘মান বাঁচাতে’ কর্মীরা লিপ্ত হচ্ছেন পেশিশক্তির লড়াইয়ে। সংসদের এই উত্তাপ সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি করার পাশাপাশি বিশেষ করে দেশের ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
বিশেষ করে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে হঠাৎ তেতে উঠেছে গোটা দেশ। বিশেষ করে ক্যাম্পাসগুলো। এই শব্দ প্রয়োগের জেরে সরকার ও বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন রীতিমতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেতে উঠেছে। গত তিন দিনে এ নিয়ে ১০টিরও বেশি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আর ঢাবি ক্যাম্পাসে আরেকটু হলে তো খুনোখুনিই হয়ে যেত। পরিস্থিতি এমন, যে কোনো মূল্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া উভয় দল। বিশেষ করে সংসদে বসে থাকা মূল নেতাদের থেকে শুরু করে ওপরের ছাত্রনেতাদের মন পেতে নিচের দিকের পাতি নেতা ও কর্মী-সমর্থকরা রীতিমতো যেন ‘প্রাণহানির’ লড়াইয়ে মেতেছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক দৈনিক এদিনকে বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ঐক্য ও সহাবস্থানে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সম্প্রতি রাজপথ ও বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে এই দুই সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা রাজনীতিতে পুনরায় পেশিশক্তির দাপটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের ভাষায়, এই সংঘাত কেবল জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে না, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশকে করে তুলছে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাবই বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ। সংসদে যখন একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার ঘোষণা আসে, তখন সংলাপের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর। অস্তিত্ব রক্ষায় ছাত্রদল বা ছাত্র শিবিরের মতো মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলো ক্রমেই মারমুখী হয়ে উঠছে। সমঝোতার পরিবর্তে আধিপত্য বিস্তারের এই মানসিকতা তৃণমূল পর্যন্ত বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা সুস্থ ধারার রাজনীতির পথকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের বিশ্লেষণ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের নেপথ্যে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করার একটি সুপ্ত প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথে ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই থেকেই এই সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। ছাত্রদল চাইছে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে একক শক্তিতে মাঠে ফিরতে, অন্যদিকে ছাত্রশিবির তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি জানান দিতে মরিয়া। ফলে সামান্য উসকানিও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আতিকুর রহমানের মতে, সংসদীয় শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ কিভাবে ক্যাম্পাস তথা রাজপথকে রক্তাক্ত করে, বর্তমান সংঘাত তারই প্রতিফলন। সংসদের উত্তাপ যখন রাজপথে অস্ত্রের ভাষায় অনূদিত হয়, তা গণতন্ত্রের জন্য চরম অশনিসংকেত। এদিনের সঙ্গে আলাপকালে এই বিশ্লেষক বলেন, সংসদে বিরোধী কণ্ঠ দমন বা ঢালাও আক্রমণের সংস্কৃতি কর্মীদের মাঝে শান্তিপূর্ণ পথ রুদ্ধ হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলো আদর্শিক লড়াই ছেড়ে সহিংসতাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মূলত সংসদীয় অসহিষ্ণুতাই ছাত্ররাজনীতিকে পেশিশক্তির প্রদর্শনী কেন্দ্রে পরিণত করছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের সচেতন নাগরিক সমাজও ছাত্ররাজনীতির সহিংস রূপ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিকার রক্ষা ও মেধার চর্চা। কিন্তু বর্তমানে তা রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংসদের ভেতর আলোচনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং নেতাদের পরিশীলিত বক্তব্য ও আচরণ নিশ্চিত না হলে রাজপথের এই অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সংসদের বাগযুদ্ধ বন্ধ করে সমঝোতার পথে হাঁটা জরুরি। সংসদের উচ্চকণ্ঠ যেন রাজপথের কর্মীদের উসকে না দেয়, সেদিকে জাতীয় নেতাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতো সংগঠনগুলোকে ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায়, সংসদের এই তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং রাজপথের রক্তাক্ত লড়াই সাধারণ মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









