ফুটবলকে যারা শুধু ফলাফলের খেলা বলে মনে করেন, তারা হয়তো পেপ গার্দিওলাকে পুরোপুরি বোঝতে পারেন না। তার কাছে ফুটবল সবসময়ই একটি ধারণা, একটি শিল্প, কখনও কখনও এক ধরনের দর্শন। আর তাই বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে যখন স্পেন ও আর্জেন্টিনার শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, তখন অনেকেই অপেক্ষা করছিলেন গার্দিওলার পর্যবেক্ষণ শোনার।
ম্যানচেস্টার সিটিতে তার কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায় শেষ হয়েছে। বছরের পর বছর শিরোপা, রেকর্ড এবং অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর এখন তিনি ফুটবলকে দেখছেন কিছুটা দূর থেকে। প্রতিদিনের চাপ, ম্যাচ প্রস্তুতি কিংবা সংবাদ সম্মেলনের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা একজন মানুষের শান্তি নিয়ে তিনি উপভোগ করছেন ২০২৬ বিশ্বকাপ।
৫৬ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ কোচ স্বীকার করেছেন, দীর্ঘ পথচলার পর তার জীবনে নতুন কিছু করার সময় এসেছে।
সংবাদমাধ্যম ওকেএক্সের সঙ্গে আলাপকালে গার্দিওলা বলেন, “আমি ৩৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। এখন আমার বয়স ৫৬। জীবনে নতুন কিছু দরকার। এই মুহূর্তে আমি খুব সুখী আছি।”
কথার ফাঁকে ফিরে আসে ম্যানচেস্টার সিটির স্মৃতিও। বিশেষ করে লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ভেসে আসে গভীর শ্রদ্ধা।
“ইয়ুর্গেন আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এই মানুষটা প্রতি বিশ মিনিটে নিজের দলের খেলার ধরন বদলে ফেলতে পারত। সত্যি বলতে, সে আমাকে পাগল করে দিত।”
ভবিষ্যতে ম্যানচেস্টার সিটিতে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন গার্দিওলা। তার উত্তর ছিল আবেগময়, কিন্তু বাস্তবসম্মত।
“একদিন অবশ্যই আমি ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ফিরব। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি দূরেই থাকতে চাই। তবে যদি ক্লাব আমাকে প্রয়োজন মনে করে, আমি অবশ্যই সেখানে থাকব।”
যদিও আপাতত তার চোখ রবিবারের বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে।
স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার মহারণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গার্দিওলা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয়, স্পেনের জয়ের চাবিকাঠি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন মাঝমাঠে।
বিশেষ করে দুই খেলোয়াড়ের নাম আলাদা করে উল্লেখ করেছেন তিনি—রদ্রি ও পেদ্রি।
গার্দিওলা বলেন, “যদি রদ্রি মাঝমাঠে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং পেদ্রি তাকে সমর্থন দেয়, আর যদি লামিন ইয়ামাল নিজের সেরা খেলাটা খেলতে পারে, তাহলে তারাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।”
এটি নিছক প্রশংসা নয়; বরং একজন অভিজ্ঞ কৌশলবিদের পর্যবেক্ষণ।
কারণ গার্দিওলা খুব ভালো করেই জানেন, আধুনিক ফুটবলে বড় ম্যাচের ভাগ্য অনেক সময় নির্ধারিত হয় মাঝমাঠে। যেখানে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যেখানে আক্রমণ ও রক্ষণকে এক সুতোয় বেঁধে রাখা হয়।
রদ্রি সেই ভূমিকায় বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। গত কয়েক বছর ম্যানচেস্টার সিটিতে গার্দিওলার অধীনেই তিনি নিজেকে পরিণত করেছেন আধুনিক যুগের আদর্শ ডিপ-লাইং মিডফিল্ডার হিসেবে। তার অবস্থানজ্ঞান, পাসের নির্ভুলতা এবং ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর অন্যতম।
অন্যদিকে পেদ্রি হলেন সৃজনশীলতার প্রতীক। তার পায়ে বল থাকলে খেলার গতি বদলে যেতে পারে এক মুহূর্তে। ছোট ছোট পাস, ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা এবং আক্রমণ তৈরির দক্ষতা তাকে স্পেনের আক্রমণভাগের অন্যতম চালিকাশক্তি করে তুলেছে।
আর সামনে রয়েছেন লামিন ইয়ামাল—এই প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ প্রতিভাদের একজন। গার্দিওলার মতে, যদি এই তিনজন নিজেদের সেরা ছন্দে খেলতে পারেন, তাহলে স্পেনের জন্য বিশ্বকাপ জয়ের পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
বিশ্লেষণটি শুনলে মনে হয়, গার্দিওলা ফাইনালের ফলাফলকে শুধু মেসি বনাম স্পেন কিংবা অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্যের লড়াই হিসেবে দেখছেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, ম্যাচটির ভাগ্য নির্ধারণ করবে বলের নিয়ন্ত্রণ, মাঝমাঠের আধিপত্য এবং সৃজনশীলতার নিখুঁত লড়াই।
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তার এই মন্তব্য তাই ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে বেশি—এটি একজন মহান কোচের কৌশলগত পর্যবেক্ষণ।
রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা ও স্পেন মুখোমুখি হবে, তখন কোটি মানুষের চোখ থাকবে মেসি, ইয়ামাল কিংবা আলভারেসদের দিকে। কিন্তু পেপ গার্দিওলার মতে, ট্রফির ভাগ্য নির্ধারণ হতে পারে একটু গভীরে, মাঝমাঠের সেই অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে।
আর সেখানে যদি রদ্রি ও পেদ্রি নিজেদের ছাপ রাখতে পারেন, তাহলে স্পেনের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









