বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসিকে হারিয়ে গভীর শোকে ভেঙে পড়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত শনিবার (৮ আগস্ট) আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান মেসির বাবা। মৃত্যুর পর প্রথমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ সেই বার্তায় বাবাকে শুধু বাবা হিসেবে নয়, নিজের ‘বন্ধু ও প্রতিনিধি’ হিসেবেও স্মরণ করেছেন মেসি।
মেসির লেখা দীর্ঘ বার্তায় ফুটে উঠেছে বাবাকে হারানোর গভীর শূন্যতা। তিনি লিখেছেন, ‘‘বাবা, তুমি চলে গেছ–এটা আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। বিশ্বাস করতে পারছি না যে তোমাকে আর দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। আমি জানি, তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে, আর সেই কষ্টের অবসান হওয়াটাই হয়তো ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি খুব তাড়াতাড়িই চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে উপভোগ করার মতো এখনও অনেক কিছু বাকি ছিল।’’
মেসি স্মরণ করেছেন ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় বাবার কথা। বিশ্বকাপে খেলার আগে হোর্হে মেসি বারবার ছেলেকে খেলতে বলেছিলেন। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মেসির ভাষ্য অনুযায়ী, মা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে বাবা সুস্থ হয়ে ভ্রমণ করতে পারবেন। তখন মেসিও বাবাকে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠবে এবং তিনি যেন অন্তত একটি ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে পারেন।
বিশ্বকাপে বাবার অসুস্থতার কারণে মনের ভেতরের অনেক কথা কাউকে বলতে না পারলেও বাবার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতেন মেসি। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি তোমার কাছে এসেছিলাম, কারণ যা ঘটছিল তার সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারছিলাম না।’’ মেসির আক্ষেপ, বাবা শেষ পর্যন্ত তার খেলা ও বিশ্বকাপের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেননি।
বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই হোর্হে তার ফুটবলযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। কাজ থেকে বাড়ি ফিরেই ছেলেকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন তিনি। মেসির কোনো ম্যাচই বাদ দিতেন না। মাঠে ছেলেকে দেখে যেমন ভুগতেন, তেমনই সাফল্যে আনন্দও পেতেন, যদিও বাবা হিসেবে খুব বেশি প্রশংসা করতেন না।
মেসির কাছে হোর্হে ছিলেন একই সঙ্গে বাবা, বন্ধু ও প্রতিনিধি। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি পাশে ছিলেন। কখনও তাদের মধ্যে মতবিরোধ বা ঝগড়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাবার কথাই সঠিক প্রমাণিত হতো বলে স্মরণ করেছেন মেসি।
সবচেয়ে আবেগঘন অংশে মেসি লিখেছেন, ‘‘আমি জানি না তোমাকে ছাড়া কী করব, কীভাবে এগিয়ে যাব।’’ ফুটবল চালিয়ে যাবেন কিনা, তা নিয়েও তার মনে এখন অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ ফুটবলজীবনের শুরু থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত বাবা ছিলেন তার পাশে।
মেসি আরও লিখেছেন, তার বাবার সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল পরিবারকে দেখা–স্ত্রী, সন্তানদের পাশাপাশি গোপনে ছেলের খেলা দেখা। এখন বাবার সেই জায়গা আর কেউ পূরণ করতে পারবেন না।
তবে হোর্হে মেসি তার পরিবারের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন বলে জানিয়েছেন লিওনেল। বিশেষ করে নিজের সন্তানদের শিক্ষা ও মানুষ করার ক্ষেত্রে বাবার দেখানো পথই অনুসরণ করবেন তিনি।
‘তুমি সবসময় উপস্থিত থাকবে,’–বাবাকে উদ্দেশ করে মেসির এই বিদায়ী বার্তায় স্পষ্ট, ফুটবল মাঠে মেসির অসংখ্য সাফল্যের আড়ালে যে মানুষটি ছায়ার মতো ছিলেন, তার চলে যাওয়া মেসির ব্যক্তিজীবনে তৈরি করেছে এক গভীর শূন্যতা।
হোর্হে মেসি শুধু লিওনেল মেসির বাবা ছিলেন না; দীর্ঘদিন তার প্রতিনিধিও ছিলেন। মেসির শৈশব থেকে ফুটবল ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি পাশে ছিলেন এবং ছেলের পেশাদার জীবনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সবশেষে মেসি লেখেন, ‘‘শান্তিতে বিশ্রাম নাও এবং ওপর থেকে আমাদের দেখো, যেমনটা এখানে থাকতে করতে। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









