টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ জনে। নদীর পানি বৃদ্ধি, পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে ডুবে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে বিভাগের পাঁচ জেলার অন্তত ১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
দুর্গত এলাকায় এখনো উদ্ধার, ত্রাণ ও আশ্রয় কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন। বন্যার পানিতে টানা তিনদিন আটকে থাকলেও অনেক পানিবন্দি মানুষ সরকারি কিংবা বিত্তবানদের কাছ থেকে ত্রাণসামগ্রী পাননি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ উঁচু ভবনে, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন-রাত পার করছেন।
এদিকে বন্যা ও পাহাড় ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সৃষ্ট এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ, এ সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, এসব জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। সাত জেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বন্যা ও পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড় ধস ও বন্যায় ২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজারে আহত হয়েছেন ২৪ জন।
টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুক্রবার রাতের বৃষ্টির পর শনিবার সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তিনদিন পানিবন্দি থাকার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ সংকটের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এরপর থেকেই সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করে।
দেশের অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে চট্টগ্রামের মানুষ যেভাবে সবার আগে এগিয়ে যান, সেই চট্টগ্রামের মানুষই এবার নিজেদের দুর্যোগে পর্যাপ্ত ত্রাণ না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। সরকারি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে শুক্রবার সকালে বাঁশখালীর বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনে যান জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেন। পরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা শুক্রবার সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ৮০০ পরিবারের মধ্যে জরুরি ত্রাণ বিতরণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
চট্টগ্রামে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিতে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শুক্রবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর থেকে দুর্গত মানুষের দোরগোড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে। সাতকানিয়ার ভয়াবহ বন্যায় পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন সেনাসদস্যরা। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। শনিবার সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত ইউনিয়নে এই কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক গ্রামের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোমর থেকে বুকসমান পানির কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নৌকাই এখন দুর্গত মানুষের একমাত্র ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে সেনাসদস্যরা নৌকায় করে চাল, চিড়া, মুড়ি, বিশুদ্ধ পানিসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে ঘরবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বাজারে যাওয়া বা বাইরে থেকে খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় অনেকেই খাদ্যসংকটে পড়েছেন। সেনাবাহিনীর ত্রাণ পৌঁছানোয় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সাতকানিয়া উপজেলার স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে চারদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা কোথাও যেতে পারছিলেন না। সেনাসদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ায় তারা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছেন।
এদিকে, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বন্যার্ত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজন হলে আরও ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে কার্যক্রম বিস্তৃত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের ত্রাণ কার্যক্রমও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আনোয়ারা ও চট্টগ্রাম নগর থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল বাঁশখালীর দুর্গম গ্রামাঞ্চলে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ শুরু করে। বাঁশখালীর কাথারিয়া-বরইতলী এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী নাজিম উদ্দীন ছোটন বলেন, এখানে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অনেক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের মুখে অন্তত কিছু খাবার তুলে দিতে। বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা নুর আনোয়ার বলেন, গত দুই দিন কেউ আসেনি। তবে আজ অনেকেই এসেছেন। মুড়ি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। কিন্তু অনেকের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
এদিকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে প্রশাসনের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড, বিজিবি, আনসার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্গত মানুষও যাতে সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, সরকার ও জেলা প্রশাসন বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তিনি বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বান্দরবানে বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া- চন্দ্রঘোনা এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানান বান্দরবান সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন। শহরের বন্যার পানিতে সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকার কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এবং গাছ পড়ে থাকায় বান্দরবান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া শুক্রবার রাতে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে গেছে। এতে দুই জেলার সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, জেলা শহরে কোনো রকমে ভেঙে ভেঙে যেতে পারলেও সকাল থেকে বান্দরবান- রাঙ্গামাটি সড়কে বাঙ্গাল হালিয়ার কাছাকাছি ব্রিজঘাটা এলাকায় একটা বেইলি সেতু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ফলে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা পর্যন্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজনকে ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে এপার ওপার পার হতে দেখা গেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে গেছে। এতে সকাল থেকে এই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বান্দরবান সওজয়ের পক্ষ হতে যোগাযোগ পুন:স্থাপনের জন্য একটা টিম প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ওই সড়কের বালাঘাটা ও স্বর্ণমন্দির এলাকায় পানি থাকায় আমরা রওনা করতে পারছি না”, বলেন তিনি।
এদিকে শহরে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ থাকলেও সকালে কসাই পাড়া এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের উপর গাছ পড়ে যাওয়ায় গোটা শহরে বিদ্যুৎ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শহরে কিছু এলাকা ছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্কও ঠিক মত কাজ করছে না। পাওয়া যাচ্ছে না মোবাইল ইন্টারনেটও। ফলে জরুরি খবরা-খবর পেতে ভোগান্তিতে পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বন্যা দুর্গতদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান ব্র্যাকের বান্দরবান জেলার সমন্বয়ক সুশান্ত বিশ্বাস। তিনি বলেন, বন্যা দুর্গত এলাকার লামায় ৩০০ পরিবার, নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০০ পরিবার এবং সদর উপজেলার গোয়ালিখোলা এলাকায় ২৬৫ পরিবারকে ৮৮৫ টাকার একটা ত্রাণ প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ প্যাকেজে ছিল চাল, ডাল, চিনি, গুড়, লবন, পেঁয়াজের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য।
বন্যার পানি নামছে ধীরে, মানুষের ভোগান্তি
কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে বৃষ্টি থামায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি নামছে ধীরগতিতে। দুই উপজেলার শতাধিক গ্রাম থেকে পানি নামছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এখনো বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। গতকাল শনিবার বেলা ৩টায় সেখানে পানির উচ্চতা মাপা হয় ৫ দশমিক ৩৫ সেন্টিমিটার। শুক্রবার রাতে নদীতে পানির উচ্চতা মাপা হয়েছিল ৬ দশমিক ২১ মিটার। এখন নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চকরিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা, পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়ন একটি পৌরসভা এবং মাতামুহুরী সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি। এতে স্থানীয় লোকজন চরম দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশু নিয়ে মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানালেন, বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। উজানে বৃষ্টি হওয়ায় এখনো বিপদ কাটছে না। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গতদের মাঝে খাবার সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
পানি নামছে, ভেসে উঠছে ক্ষত
মৌলভীবাজারে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। তলিয়ে গেছে আমন ও আউশের বীজতলা, নষ্ট হয়েছে কৃষিজমি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ সড়ক। ডুবে গেছে নলকূপ ও পুকুর। অনেক এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটে দুর্ভোগে রয়েছেন বন্যাকবলিত মানুষ। গতকাল শনিবার রাজনগর, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানে পানি কমতে শুরু করলেও অসংখ্য বাড়িঘর, আঙিনা ও সড়কে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো ফেরেনি। মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে জেলার চার উপজেলার অন্তত ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাজনগর ও সদর উপজেলার ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো প্রায় দুই হাজার মানুষ অবস্থান করছেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ইতোমধ্যে এক হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৯০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় রান্না করা খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি
চরফ্যাশন: টানা বৃষ্টিতে চরফ্যাশনে দুর্ভোগ, বিপর্যস্ত জনজীবন। পানিবন্দি কয়েক হাজার মানুষ।
শনিবারও ভোর থেকে সূর্যের দেখা মেলেনি। দিনভর বৃষ্টি ছিল। জীবন ও জীবিকার তাগিদে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ঘর থেকে বের হয়েছেন মানুষ। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ৪ থানা—চরফ্যাশন, শশীভূষণ, দুলারহাট ও দক্ষিণ আইচা এলাকার ২১টি ইউনিয়নের মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে জোয়ারের পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, বিভিন্ন সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যচাষীরা।
কৃষকরা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। একইভাবে মাছের ঘেরে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করায় মাছ ভেসে বেরিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, জমিতে পানি জমে থাকায় ১ হাজার ২১০ হেক্টর জমির শাকসবজি এবং ১৭০ হেক্টর জমির আমন ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, টানা ভারী বর্ষণে চরফ্যাশন উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৩৬০ জন মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলার ৩ হাজার ৬৭১টি ছোট-বড় মৎস্য খামার, যার মোট আয়তন প্রায় ২১৮ হেক্টর, পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২৭২ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কৃষি ও মৎস্য খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
সিলেট: সিলেটে নদ-নদীর চার পয়েন্টে পানি বেড়েছে। সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, ও ধলা নদীর চারটি পয়েন্টে গতকাল শনিবার পানি কিছুটা বেড়েছে। পাউবোর তথ্য অনুসারে, সুরমা নদীর সিলেট পয়েন্টে শূন্য দশমিক ২ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৩ সেন্টিমিটার, সারিগোয়াইন নদীর গোয়াইনঘাট পয়েন্টে শূন্য দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং ধলা নদীর ইসলামপুর পয়েন্টে শূন্য দশমিক ১০ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। তবে নদ-নদীর অন্য পয়েন্টে পানি কমছে।
পাউবো সিলেট কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ঢল ও বৃষ্টি বাড়লে পানি আবারও বাড়তে পারে। ফলে সিলেটে এখনও বন্যার শঙ্কা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









