দেশের অন্যতম বৃহৎ গণপরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে অর্থ সংকট, পুরনো ইঞ্জিন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ট্রেন পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে ব্যবহৃত ইঞ্জিনের একটি বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে এবং এসব ইঞ্জিন সচল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত ও মানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু অর্থ ও যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় কাজ যথাসময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের দুটি অঞ্চলে (পূর্ব ও পশ্চিম) মোট ইঞ্জিন আছে ২৭১টি (মিটারগেজ ১৫০ ও ব্রডগেজ ১২১টি)। এর মধ্যে ৮৭টি অকেজো, বাকিগুলো চলে জোড়াতালি দিয়ে। এসব ইঞ্জিন দিয়েই বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী ও ৪০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে রেল। নিরাপদ রেল সেবা নিশ্চিত করতে যথাসময়ে ইঞ্জিন সরবরাহ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, রেলওয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপের অধীনে থাকা ৯০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৪০টি অকেজো আর ৫০টি মেরামত করে চালানো হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে যথাসময়ে খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে লোকবল সংকট আর যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ইঞ্জিন সরবরাহে হিমশিম খেতে হয় প্রতিনিয়ত।
সূত্র জানায়, রেলের ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ২৫ বছর ধরা হয়। কিন্তু আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের ১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে আমদানি করা ২০০০ সিরিজের ইঞ্জিনের বয়স ৭২ বছর পার হলেও জোড়াতালি দিয়ে চালাতে বাধ্য করছে কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, ২০০০ সিরিজের (১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালের) ৩টি ইঞ্জিনের ২টি, ২২০০ সিরিজের (১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সালের) ৭টির মধ্যে ১টি, ২৬০০ সিরিজের (১৯৮৮ সালের) ১৬টির মধ্যে ৮টি, ২৭০০ সিরিজের (১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালের) ১৮টির মধ্যে ৭টি ইঞ্জিন লাইফটাইম (আয়ুষ্কাল) শেষ হলেও জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। বাকিগুলো অচল। আবার ১৯৯৯, ২০০৪, ২০১১ ও ২০১৩ সালে আমদানি করা ২৯০০ সিরিজের ৩৯টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২০টি সচল থাকলেও ১৯টির আয়ুষ্কাল শেষ। এগুলো মেরামত করে চালানোর উপযোগী করা বেশ কষ্টকর।
সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ ২০২০ সালে হুন্দাই রোটেমে এর সরবরাহ করা ৩০০০ সিরিজের আধুনিক ৩০টি লোকোমোটিভের। রেলকে আরো আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্ট্রো মোটিভ ডিজেল (ইএমডি)-এর লাইসেন্সের আওতায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩০টি লোকোমোটিভ আমদানি করা হলেও তা খুব অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে পাহাড়তলীর অধীন ২২টি ইঞ্জিনের মধ্যে সচল আছে মাত্র ৯টি আর মেরামতাধীন আছে ১৩টি। সব মিলিয়ে ৩০০০ সিরিজের ২০ ইঞ্জিন অনেকটাই অচল।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পাহাড়তলী ডিজেল শপের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এহেতেশাম মো. শফিক দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘একদিকে জনবল অন্যদিকে লোকোমোটিভ/ইঞ্জিন সংকট মারাত্মক অবস্থায় আছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই চালানো হচ্ছে যাত্রীসেবা। রেলকে সচল রাখতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় খুচরা যন্ত্রাংশ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। রেলের সবগুলো ইঞ্জিন সুন্দরমতো সচল করতে হলে কমপক্ষে বছরে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া দরকার। এবং তা বছরের শুরুতে দিয়ে দিলে ইঞ্জিন সংকট আর থাকবে না বলে মনে করছি।’
এত টাকা মেরামতের পেছনে খরচ করলে রেলের কী লাভ হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিন সংকটে বিভিন্ন রুটে অনেক ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। যথাসময়ে ইঞ্জিন সরবরাহ করতে পারলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন অনেক বাড়বে। এতে করে রেলের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকসান কমানো সম্ভব হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইঞ্জিনের নির্ভরযোগ্যতা ধরে রাখতে প্রয়োজন সময়মতো ওভারহলিং, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রক্ষণাবেক্ষণ। এসব কাজ নিয়মিতভাবে না হলে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে রেলওয়ের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও লোকোমোটিভ শেডে এমন অনেক ইঞ্জিন রয়েছে যেগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এদিকে মেরামতে যেখানে হাজার কোটি টাকা দরকার সেখানে বরাদ্দ আছে ১২০ কোটি টাকা। তাও আবার টাকা ছাড় করতেই অর্থবছর শেষ হয়ে যায়। ফলে কেনাকাটায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি টাকা ছাড়ের পদ্ধতি সহজ করা দরকার। অর্থবছরের শুরুতেই যদি প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায় তাহলে সময় নিয়ে দরকারি যন্ত্রাংশ কেনাকাটা করা যায়। এ খাতের বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই আমদানি করতে হয়, সুতরাং বরাদ্দের টাকা ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট সময়ও বরাদ্দ রাখা জরুরি। এই তিন বছর রেলসেবা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দরকার।
রেলের কারিগরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ বরাদ্দে বিলম্বের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে মেরামতযোগ্য ইঞ্জিনও দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ট্রেন পরিচালনায়। কোনো ইঞ্জিন হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে নির্ধারিত ট্রেন বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলওয়ের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ হলো অপারেশনাল দক্ষতার ঘাটতি। একটি ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় অচল থাকলে শুধু পরিবহন সক্ষমতাই কমে না, রাজস্ব আয়ও হ্রাস পায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি আরো বেশি ভর্তুকিনির্ভর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে একই ইঞ্জিন থেকে দীর্ঘ সময় সেবা পাওয়া সম্ভব এবং নতুন ইঞ্জিন কেনার চাপও কমে আসে।
রেল খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যে পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে রেল পরিচালিত হচ্ছে তার একটি বড় অংশ অপারেশনাল অদক্ষতা ও যন্ত্রপাতির অকার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইঞ্জিন ও কোচের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে ট্রেন চলাচলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে, যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, পণ্য পরিবহন সম্প্রসারিত হবে এবং রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন এদিনকে বলেন, ‘জনবল ও খুচরা যন্ত্রাংশ সংকট চরম অবস্থায় পৌছেছে। ইতিমধ্যে ৬০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন আমদানির প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও এগুলো আসতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগবে। তা ছাড়া চীন ২০টি ইঞ্জিন উপহার দেবে অল্প সময়ের মধ্যে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









