নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আগামীকাল রবিবার বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবেন লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা। তবে এই ম্যাচটি শুধু শিরোপা নির্ধারণের লড়াই নয়। বরং লিওনেল মেসির জন্য অপেক্ষা করছে অনন্য ১১টি ব্যক্তিগত রেকর্ডের হাতছানি। ফাইনালে মাঠে নামা থেকে শুরু করে গোল করা কিংবা ট্রফি জেতা, সবকিছু মিলিয়ে মেসি ছুঁতে পারেন একাধিক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এক নজরে ফাইনালে মেসির সামনে থাকা ১১টি সম্ভাব্য রেকর্ড:
১. গোলরক্ষক ছাড়া সবচেয়ে বয়স্ক ফাইনালিস্ট: ফাইনালের দিন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর ২৫ দিন। ফুটবল ইতিহাসে গোলরক্ষক বাদে কোনো খেলোয়াড় এত বেশি বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামেননি। রেকর্ডটি এখনও ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক দিনো জফেরের দখলে আছে। ৪০ বছর ১৩৩ দিনে তিনি পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ১৯৮২ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছিলেন। মেসি এবারের বিশ্বকাপে ফাইনালে নামলে, আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে তিনিই হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফাইনালিস্ট।
২. দ্বিতীয় অধিনায়ক হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল: ২০১৪ ও ২০২২ সালের পর মেসির এটি তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এর আগে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফু ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২ সালে টানা তিনটি ফাইনালে খেলেছিলেন। সেই অভিজাত তালিকায় মেসি দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নাম লেখাতে চলেছেন।
৩. প্রথম অধিনায়ক হিসেবে তিন ফাইনাল নেতৃত্ব: ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি অধিনায়কের নাম রয়েছে, যারা দুবার দলকে ফাইনালে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু মেসিই হবেন প্রথম খেলোয়াড়, যিনি তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নামবেন।
৪. অধিনায়ক হিসেবে জোড়া বিশ্বকাপ শিরোপা: ফুটবলে দুবার বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড় অনেক আছেন, কিন্তু দুইবারই ‘অধিনায়ক’ হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার নজির নেই। ইতালি ও ব্রাজিলের অনেক তারকা দুবার বিশ্বজয়ী হলেও তাদের কেউ অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয়বার ট্রফি ধরেননি। আর্জেন্টিনা জিতলে মেসি হবেন ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক যিনি দুবার বিশ্বকাপ শিরোপা নিজের হাতে নেওয়ার অনন্য রেকর্ডের মালিক হবেন।
৫. ফাইনালের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা: ফাইনালে গোল করা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বড় প্রাপ্তি। স্পেনের বিপক্ষে মেসি গোল পেলে তিনি ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করা সুইডেনের নিলস লিডহোমের (৩৫ বছর ২৬৪ দিন) রেকর্ডটি ভেঙে দেবেন। এটি তাকে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হিসেবে অমর করে রাখবে।
৬. আর্জেন্টিনার হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল: ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গিয়ের্মো স্তাবিল ৮টি গোল করেছিলেন। ৯৬ বছর ধরে এটিই ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে এক আসরে সর্বোচ্চ গোল। এবারের বিশ্বকাপে মেসি ইতোমধ্যে ৮টি গোল করে ফেলেছেন। ফাইনালে একটি গোল করলেই তিনি স্তাবিলকে টপকে এককভাবে নতুন রেকর্ড গড়ে ফেলবেন।
৭. ১০ গোলের মাইলফলক: এক আসরে ১০ গোল করা মানেই ফুটবলারদের একটি বিশেষ অভিজাত ক্লাবে জায়গা পাওয়া। যদি মেসি ফাইনালে জোড়া গোল করতে পারেন, তবে তিনি জাস্ট ফনটেইন (১৩ গোল), স্যান্ডর কোসিস (১১ গোল) এবং গার্ড মুলারের (১০ গোল) তালিকায় নাম লেখাবেন। ইউরোপের বাইরে জন্ম নেওয়া কোনো ফুটবলারের জন্য এটি হবে এক অবিশ্বাস্য অর্জন।
৮. দুটি আলাদা বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল: ২০২২ সালের ফাইনালে মেসি গোল করেছিলেন। যদি ১৯ জুলাই স্পেনের বিপক্ষে তিনি গোল করতে পারেন, তবে তিনি ভাভা, পেলে, পল ব্রেইটনার, জিনেদিন জিদান ও কিলিয়ান এমবাপ্পেদের মত ষষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়বেন।
৯. বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল: ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের হয়ে রোনালদো ৮টি গোল করেছিলেন। আর্জেন্টিনা যদি এবার চ্যাম্পিয়ন হয় এবং মেসি কমপক্ষে একটি গোল করেন, তবে তিনি ৯ গোল নিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কোনো দলের খেলোয়াড় হিসেবে এক আসরে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ডটি নিজের করে নেবেন।
১০. ফাইনালের সর্বোচ্চ গোলদাতা: বিশ্বকাপ ফাইনালে এককভাবে সর্বোচ্চ ৪টি গোলের মালিক কিলিয়ান এমবাপ্পে। মেসি যদি ফাইনালে দুটি গোল করতে পারেন, তবে তিনি এমবাপ্পের সেই রেকর্ড স্পর্শ করবেন। আর যদি হ্যাটট্রিক করতে পারেন, তবে ৫ গোল নিয়ে তিনি এককভাবে এই তালিকার শীর্ষে উঠে আসবেন এবং জিওফ হার্স্টের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনালে হ্যাটট্রিকের অনন্য কীর্তি গড়বেন।
১১. সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়: টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয় করা বিরল ঘটনা। এর আগে ইতালি (১৯৩৪, ১৯৩৮) এবং ব্রাজিল (১৯৫৮, ১৯৬২) এই নজির গড়েছিল। আর্জেন্টিনা এবার জিতলে মেসি হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার যিনি টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের নীল্টন সান্তোস ৩৭ বছর বয়সে এই রেকর্ড গড়েছিলেন, মেসি সেটি অতিক্রম করবেন।
ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার হুঙ্কার, ‘আমরা থামছি না’
এদিকে বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালের আগে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা, ‘আমরা থামছি না’। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে লিওনেল স্কালোনির দল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা। এনজো ফার্নান্দেজের সমতাসূচক গোল ম্যাচে ফেরায় দলকে। এরপর ইনজুরি সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ফাইনালের প্রস্তুতি শুরু করে ইতোমধ্যে অনুশীলনে নেমেছে আর্জেন্টিনা। অনুশীলনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) লিখেছে, ‘আবারও কাজে ফেরা! আমরা থামছি না। লড়াই চলবে বন্ধুরা। চলো, আর মাত্র একটা ছোট পদক্ষেপ বাকি।’ এই বার্তায় স্পষ্ট, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে পুরোপুরি মনোযোগী স্কালোনির শিষ্যরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









