হোমারের মহাকাব্য ওডিসি আসলে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার কাহিনি নয়; এটি মানুষের নিজের ভেতরে ফিরে আসার মহাকাব্য। ইথাকায় পৌঁছানোর চেয়েও বড় যাত্রা হলো নিজেকে চিনে নেওয়া—আর সেই কারণেই ওডিসিউসের পথচলা আজও প্রতিটি মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিধ্বনি।
সহস্র বছর পেরিয়েও ওডিসি আমাদের স্পর্শ করে, কারণ এটি দেবতা ও দানবের গল্পের আড়ালে আসলে মানুষের একাকীত্ব, আশা, স্মৃতি এবং ঘরে ফেরার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার কাহিনি।
ওডিসি একটি প্রত্যাবর্তনের গল্প, কিন্তু তার গভীরে লুকানো আছে রূপান্তরের দর্শন—যে মানুষ যাত্রা শুরু করে, সে কখনো একই মানুষ হয়ে ফিরে আসে না।
হোমারের এই অমর মহাকাব্যিক চিন্তা ও দর্শনকে আনুনিক চলচ্চিত্র হিসেবে আমাদের সামনে হাজির করেছেন ‘ব্যাটম্যান’সিরিজ, ‘ইনসেপশান’, ‘ওপেনহাইমার’, ‘ইন্টারস্টেলার’-এর মতন অসাধারণ চলচ্চিত্রের ব্রিটিশ-আমেরিকান নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান।
১৭ জুলাই ২০২৬। বিশ্ব সিনেমার ক্যালেন্ডারে দিনটি ইতোমধ্যেই বিশেষ এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে আইম্যাক্স ও প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল আলোচিত ‘দ্য ওডিসি’। মুক্তির আগেই চলচ্চিত্রটি নিয়ে ছিল অভূতপূর্ব প্রত্যাশা—হোমারের আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো মহাকাব্যকে নোলান কীভাবে আধুনিক সিনেমার ভাষায় পুনর্নির্মাণ করবেন, সেই প্রশ্ন ঘিরে উত্তেজনা ছিল বিশ্বজুড়ে। কিন্তু মুক্তির পর যা ঘটল, তা প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেল।
কোনো চলচ্চিত্র মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে সমালোচকদের মধ্যে এমন অভূতপূর্ব ঐকমত্য খুব কমই দেখা যায়। বিশেষ করে যখন নির্মাতার নাম ক্রিস্টোফার নোলান—তখন প্রত্যাশার উচ্চতা যেমন আকাশছোঁয়া, তেমনি সমালোচনার মাত্রাও থাকে নির্মম। কিন্তু ‘দ্য ওডিসি’ সেই কঠিন পরীক্ষায় শুধু উত্তীর্ণই হয়নি; বরং সমালোচকদের মতে, এটি নোলানের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ও চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকীগুলোর পূর্ণাঙ্গ রিভিউ প্রকাশের পর স্পষ্ট হয়েছে, হোমারের অমর মহাকাব্যের এই চলচ্চিত্ররূপ সমকালীন সিনেমার জন্য এক বিরল ঘটনা।
চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ও চলচ্চিত্র-সাময়িকীগুলো একের পর এক প্রকাশ করতে শুরু করে তাদের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। সমালোচকদের রায় ছিল বিস্ময়করভাবে একমুখী—এটি শুধু সফল একটি সাহিত্যরূপান্তর নয়, বরং সমকালীন চলচ্চিত্রভাষার এক অসামান্য অর্জন। দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এবং দ্য টেলিগ্রাফ চলচ্চিত্রটিকে সর্বোচ্চ পাঁচ তারকা দিয়েছে; দ্য টাইমস একে আখ্যা দিয়েছে "সব দিক থেকেই একটি মাস্টারপিস" আর দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এটি "এক মহিমান্বিত চলচ্চিত্ররূপ, যেখানে প্রতিটি ফ্রেমে নোলানের সিনেমাপ্রেম স্পন্দিত।"
প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই আইম্যাক্স মহাকাব্যকে ঘিরে এখন শুধু বক্স অফিসের হিসাব নয়, শুরু হয়েছে চলচ্চিত্র-ইতিহাসে এর অবস্থান নিয়ে আলোচনা। অনেক সমালোচকের বিশ্বাস, ‘দ্য ওডিসি’ শুধু ২০২৬ সালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় নয়, ক্রিস্টোফার নোলানের সমগ্র কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রধান চলচ্চিত্র সমালোচক পিটার ব্র্যাডশ পাঁচ তারকা দিয়ে লিখেছেন, ‘দ্য ওডিসি’ এমন এক চলচ্চিত্র যেখানে নির্মাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, শিল্পসাহস, বৌদ্ধিক গভীরতা এবং আবেগময় মানবিকতা একই সঙ্গে উপস্থিত। তার মতে, সংলাপের কিছু অংশ তুলনামূলক সরল হলেও নোলানের দৃশ্যনির্মাণের শক্তি এবং সিনেমাটিক আত্মবিশ্বাস সেই সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গেছে।
ক্ল্যারিস লফ্রে, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ লিখেছেন, ‘দ্য ওডিসি’ কেবল নোলানের সেরা চলচ্চিত্রই নয়; ভবিষ্যতে তার শিল্পীসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করার মতো কাজও বটে। তার মতে, এই চলচ্চিত্রে পরিচালক তার সমস্ত সৃজনশীল শক্তিকে এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করেছেন।
দ্য টেলিগ্রাফ-এর সমালোচক রবি কলিন ছবিটিকে বর্ণনা করেছেন “অদ্ভুত, দুর্ধর্ষ এবং পথপ্রদর্শক” হিসেবে। তার ভাষায়, চলতি বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো চলচ্চিত্রই শিল্পগুণ, নির্মাণশৈলী এবং দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে ‘দ্য ওডিসি’র সমকক্ষ নয়।
কেভিন মাহের, দ্য টাইমস-এ লিখেছেন, আজকের পৃথিবীতে এমন শিল্পকর্মের প্রয়োজন ছিল যা শুধু বিনোদন দেয় না, দর্শককে চিন্তায় নিমগ্নও করে। তার মতে, নোলান সেই কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছেন। তাই দ্য ওডিসি তার কাছে “সব দিক থেকেই একটি মাস্টারপিস”।
ম্যানোহলা ডার্গিস মনে করেন, ‘দ্য ওডিসি’র প্রতিটি ফ্রেমে নোলানের সিনেমার প্রতি গভীর ভালোবাসা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তার মতে, এই চলচ্চিত্রে নোলানের স্বভাবসুলভ বিষয়গত অনুসন্ধান, দৃশ্যভাষার পরীক্ষা এবং বিশাল আকারের চলচ্চিত্র নির্মাণ এক অভূতপূর্ব ভারসাম্যে মিলিত হয়েছে।
ডার্গিস লিখেছেন, এই চলচ্চিত্র দর্শককে বড় করে ভাবতে শেখায়। তার মূল্যায়নে, ‘দ্য ওডিসি’ শুধু একটি ক্লাসিক নয়; এটি চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতি এক নির্মল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ভ্যারাইটি-র প্রধান সমালোচক গাই লজ ছবিটিকে “দৃশ্য-উৎসব” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, প্রায় তিন ঘণ্টার চলচ্চিত্রজুড়ে এমন সব বিশাল দৃশ্য একের পর এক এসেছে, যা অন্য কোনো ব্লকবাস্টারে আলাদা ক্লাইম্যাক্স হিসেবে ব্যবহার করা যেত। তার ভাষায়, চলচ্চিত্রটি এতটাই উদারভাবে তার দৃশ্যবৈভব দর্শকের সামনে মেলে ধরে যে শেষ পর্যন্ত দর্শক যেন এক দীর্ঘ, মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ফিরে আসেন।
এত সব প্রশংসার মাঝেও সংযত আপত্তি আছে কিছু। সব সমালোচনা অবশ্য একপাক্ষিক প্রশংসায় সীমাবদ্ধ নয়।
দ্য হলিউড রিপোর্টার-এর ডেভিড রুনি মনে করেন, ওডিসিউস ও ক্যালিপসোর কিছু দীর্ঘ সংলাপনির্ভর দৃশ্য চলচ্চিত্রের গতি কমিয়ে দিয়েছে। টম হল্যান্ডকে টেলেম্যাকাস চরিত্রে নেওয়া এবং কিছু আধুনিক শব্দচয়নও তাঁর কাছে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে তিনিও চলচ্চিত্রটির শিল্পগুণকে অস্বীকার করেননি।
প্রখ্যাত ক্লাসিসিস্ট মেরি বিয়ার্ড চলচ্চিত্রটির আধুনিক ভাষা ব্যবহারের প্রশংসা করলেও মনে করেন, হোমারের ওডিসিউসের যে বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্রে তার কিছু অংশ অনুপস্থিত। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র বাদ পড়ায় মহাকাব্যের কিছু সূক্ষ্মতা হারিয়েছে বলেও তিনি মরন করেন।
অন্যদিকে ক্লাসিক্যাল স্টাডিজ গবেষক এমিলি হাউজার মনে করেন, চলচ্চিত্রটি আধুনিক পুরুষ নায়কের আত্মমুক্তির কাহিনিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে নারী চরিত্রগুলোর জটিলতা ও স্বাধীন ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
সমালোচকদের মূল্যায়ন একত্র করলে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়, তা হলো—‘দ্য ওডিসি’ কেবল একটি সফল সাহিত্যরূপান্তর নয়; এটি এমন এক চলচ্চিত্র, যা প্রাচীন মহাকাব্যকে আধুনিক চলচ্চিত্রভাষায় নতুন জীবন দিয়েছে। এর দৃশ্যনির্মাণ, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, দার্শনিক গভীরতা এবং নির্মাতার শিল্পদৃষ্টিকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা শুধু ২০২৬ সালের নয়, সমকালীন বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসেও দীর্ঘদিন ধরে প্রাসঙ্গিক থাকবে।
ক্রিস্টোফার নোলান আবারও প্রমাণ করলেন—বৃহৎ ক্যানভাসে নির্মিত চলচ্চিত্রও একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক, মানবিক এবং গভীর শিল্পানুভূতির হতে পারে। আর সেই কারণেই ‘দ্য ওডিসি’ শুধু একটি সিনেমা নয়; এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে নতুন করে মহাকাব্য রচনার এক সাহসী ঘোষণা। চলচ্চিত্রের নতুন এক মহাকাব্যিক ভাষা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









