দেশের উত্তরাঞ্চলের সাতটি জেলায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তা স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। জেলাগুলো হচ্ছে, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও জামালপুর। অন্যদিকে আটটি জেলায় চলমান বন্যার সামগ্রিক পরিস্থিতি ধীরগতিতে উন্নতির দিকে রয়েছে। তবে, বানের পানিতে ঘর-বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরতে বেগ পেতে হচ্ছে অনেক বন্যার্ত মানুষকে। পাশাপাশি পানি নেমে গিয়ে ক্ষতচিহ্ন জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙন, রোগ-বালাই বাড়াসহ নানা দুর্ভোগে ভুক্তভোগীরা।
৭ জেলায় ফের বন্যার আভাস: পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়িঢল ও মারাত্মক পাহাড়ধসে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিপর্যস্ত হয়ে পড়া আট জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আগামী সপ্তাহে উত্তরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা রয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেওয়া কেন্দ্রের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে সাত জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে (১৯-২৩ জুলাই) উজানের ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বাড়তে পারে। এতে আগামী তিন দিন নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বেড়ে কিছু স্থানে বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হবে। ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলার কিছু স্থানে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এ কারণে নদীসংলগ্ন বগুড়া ও জামালপুর জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। সব মিলে আগামী সপ্তাহে ওই সাত জেলায় বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুই জেলায় স্থিতিশীল: কেন্দ্রটি জানায়, আজ শনিবার সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির স্থিতিশীল থাকতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
ভোলায় জোয়ারের পানির আতঙ্ক: জোয়ার কখন আসবে, কখন নামবে—এই অপেক্ষায় কাটছে ভোলার হাজারো মানুষের দিন–রাত। অমাবস্যার প্রভাবে টানা তিনদিনের অস্বাভাবিক উচ্চ জোয়ার উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দখিনা বাতাসের প্রভাবে জোয়ারের পানি আরও বেড়ে যাওয়ায় জেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ৭৪টি চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ দিনে দুবার প্লাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাবিত হচ্ছে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মাছের ঘের, কৃষিজমি ও সড়ক। পানি ঢুকছে ঘরে, মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে টিনের চাল কিংবা ঘরের মাচায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার রাজাপুর, কাচিয়া, ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়া ইউনিয়নের অংশবিশেষ; দৌলতখান উপজেলার মদনপুর, মেদুয়া, ভবানীপুর ও হাজিপুর; তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর, মলংচরা ও চাঁদপুর, মনপুরা উপজেলার কলাতলী, মনপুরা, হাজিরহাট, উত্তর ও দক্ষিণ সাকুচিয়া, লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ এবং চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরিমুকরি ও মুজিবনগর ইউনিয়নের ৭৪টি চর ও বাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল গত মঙ্গলবার রাত থেকে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে।
পাউবো জানিয়েছে, আগামীকাল রবিবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ভোলা পাউবো–১–এর নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন আরিফ জানান, গতকাল শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে দৌলতখানের মেঘনা নদীতে জোয়ারের উচ্চতা ছিল তিন দশমিক ৩৬ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ২ দশমিক ৯৫ মিটার। সন্ধ্যার দিকে জোয়ারের উচ্চতা আরও বেড়ে যায়। পাউবো ডিভিশন–২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার জোয়ার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আজ শনিবার ও কাল রবিবার পর্যন্ত জোয়ারের উচ্চতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের কারণে ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটে যাত্রী ও পণ্যবাহী চালকদের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার ইলিশা ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। যাত্রীরা পানির মধ্যে হেঁটে, কেউবা নৌকায় চড়ে লঞ্চে ওঠানামা করছেন। ফেরিতে যানবাহন ওঠানামাও ব্যাহত হচ্ছে।
ইলিশা ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ বলেন, উচ্চ জোয়ারে ভোলার ইলিশা ও লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ফেরিঘাটে ফেরিতে গাড়ি ওঠানামা বন্ধ থাকে। ফলে পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা খুব সমস্যায় পড়ছেন। সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চর মোহাম্মদে দেখা যায়, পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ইলিশা নদীর তীরে চর মোহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা জানান, বাড়ির নারী ও শিশুরা ঘরের মাচার ওপর অবস্থান করছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সদরের কন্দ্রকপুর ও দক্ষিণ রাজাপুর এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পানির কারণে আমন ধানের বীজতলা, আধা পাকা আউশ ধান, লাউখেত, সবজিখেত ও মাছের পুকুর ডুবে আছে, ডুবে আছে রাস্তাঘাট। ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান জানান, টানা বৃষ্টি ও উচ্চ জোয়ারের পানিতে আমনের বীজতলা, সবজি ও পানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
রাজাপুর ও দৌলতখানেও একই পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। দৌলতখানের মেঘনার মধ্যে জেগে ওঠা মদনপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম চৌকিদার ও ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন সিকদার জানান, জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট প্লাবিত হচ্ছে। ফলে জমিতে ধান চাষ ব্যাহত হচ্ছে, খেতখামারের কাজ বন্ধ থাকায় মানুষের কর্মসংস্থান কমে গেছে। মাঠে পানি থাকায় গবাদিপশুর জন্য ঘাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মনপুরা উপজেলায়ও চরম দুর্ভোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
কলাতলী ইউনিয়নের মনির বাজারের পল্লিচিকিৎসক মো. আল আমিন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, দখিনা প্রবল বাতাসে জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় মেঘনার মধ্যে জেগে ওঠা কলাতলী ইউনিয়নের কলাতলী ও কাজীর চর মৌজা মঙ্গলবার রাত থেকেই প্লাবিত হচ্ছে। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, টানা বৃষ্টির পর উচ্চ জোয়ারে হাটবাজার, স্কুলের মাঠ, মাছঘাট, খেয়াঘাট, আমনের খেত ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। শিশুরা পানির মধ্যে স্কুলে যাতায়াত ও খেলাধুলা করতে গিয়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।
কয়েকজনের জানান, উপজেলার ১ নম্বর মনপুরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাশের আশ্রয়ণ প্রকল্পে শতাধিক ঘর প্লাবিত হয়েছে। বুকসমান পানির মধ্যে অনেকে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেক পরিবার উঁচু রাস্তা, ভবন ও অন্যান্য স্থানে চলে যাচ্ছে।
মনপুরার ষাট কলোনির বাসিন্দা মো. ইয়াছিন, মো. কামাল, সখিনা বিবিসহ অনেকে জানান, দিন ও রাতে দুই দফা জোয়ারের পানিতে তাদের এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাতের জোয়ারে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিতে হয়। কখন জোয়ার আসবে, আর কখন নামবে—এই অপেক্ষার মধ্যেই কাটছে তাঁদের দিন–রাত।
রামনেওয়াজ ঘাট এলাকার বাসিন্দা নাহিদ ইসলাম, মো. মোস্তফা ও মমিন তালুকদার বলেন, তিন দিন ধরে রামনেওয়াজ ঘাট ও মাছঘাট এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
চরফ্যাশনেও দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। উপজেলার ঢালচর ইউনিয়নের মৎস্য ব্যবসায়ী শাহে আলম ফরাজী বলেন, জোয়ারের কারণে মানুষের ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এবং মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পূর্ব ঢালচরে একটি কিল্লা (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণ করা হলেও সেটি বসতি এলাকার বিপরীত পাশে খালের ওপারে। খালের ওপর কোনো সেতু নেই। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে সেখানে যেতে পারে না।
বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরতে দুর্ভোগ: মালামাল ভর্তি কয়েকটি বস্তা, পুরোনো হাঁড়ি-পাতিল আর কিছু কাপড়চোপড়—একটি বিদ্যালয়ের বারান্দায় এসব নিয়ে বসে আছেন দুই বৃদ্ধা। বন্যায় ঘর হারিয়ে দুজন বিদ্যালয়টিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রটি ছেড়ে যেতে বলায় বিপাকে পড়েছেন দুজন। ঘর হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। বান্দরবান সদরের উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে এই দুই বৃদ্ধাকে।
বন্যার পানি কমায় সবাই একে একে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করলেও দুজন নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন বিদ্যালয়ের বারান্দায়। ওই দুই বৃদ্ধা হলেন পাইনুচিং মারমা (৬৫) ও গীতা বড়ুয়া (৬০)। সাঙ্গু নদের তীরে পাশাপাশি দুটি ঘরে ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁদের বসবাস ছিল। বন্যায় পাইনুচিং মারমার ঘর পুরোপুরি নদীতে ভেসে গেছে। আর গীতা বড়ুয়ার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেরামত ছাড়া সেখানে বসবাস করা সম্ভব নয়।
পাইনুচিং মারমা বলেন, ‘কাজকর্ম করে, খেয়ে না খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ঘর একটা ছিল বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল। এখন সেটাও পানিতে চলে গেল।’
সরেজমিন উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয় নেওয়া ৮-১০টি পরিবারের সদস্যরা মালপত্র গুছিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের দুজন শিরিনা আক্তার ও রনজিৎ মল্লিক। তাঁরা বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কক্ষ ছেড়ে দিতে বলেছেন। তাই সবাই চলে যাচ্ছেন। শুধু পাইনুচিং ও গীতা যেতে পারছেন না। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ১০০ মিটারের ভেতরেই পাইনুচিং মারমা ও গীতা বড়ুয়ার বাড়ি। পাইনুচিং বলেন, ‘ভিটেতে এখন কেবল একটি বাঁশের বেড়া, কয়েক খণ্ড ঢেউটিন আর ভাঙা গাছ পড়ে আছে।
সামনে বয়ে চলা সাঙ্গু নদের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নদী সব নিয়ে গেছে। এখন কোথায় যাব জানি না।’ তিনি জানান, ২০২৩ সালে তাঁর স্বামী মারা যান। নদীর পাড়ের কাঁচা ঘরটিই ছিল তাঁর শেষ সম্বল। সেই ঘরটিই ভেসে গেছে। ৭ জুলাই আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন তিনি। এত দিন পৌরসভার দেওয়া খিচুড়ি খেয়ে দিন কেটেছে। এখন সেই খাবার বিতরণ বন্ধ হয়ে গেছে। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া আট কেজি চালও প্রায় শেষ। এরপর কীভাবে চলবে, সেই উত্তর তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, ‘কাজকর্ম করে, খেয়ে না–খেয়ে বেঁচে ছিলাম। ঘর একটা ছিল বলে মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল। এখন সেটাও পানিতে চলে গেল। আমার ছেলে নেই। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তাঁদের আর্থিক অবস্থাও ভালো না। দুই নাতি আমার সঙ্গে থাকে। তাদের নিয়েই আশ্রয়কেন্দ্রে আছি। নতুন করে ঘর করার সামর্থ্য তো আমার নেই।’
প্রায় একই অবস্থা গীতা বড়ুয়ার। ১৭ বছর আগে তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে বড় করেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন না। আরেক ছেলে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। মেয়েদের একজন স্বামী-সন্তান নিয়ে তাঁর সঙ্গেই থাকেন। সবাইকে নিয়েই গীতা বড়ুয়া রয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। গীতা বড়ুয়া জানান, তাঁর ঘরে ছোট্ট তিনটি কক্ষ ছিল। সেখানে সবাই মিলে থাকতেন। বন্যায় তাঁদের ঘর পুরোপুরি ভেসে না গেলেও মেরামত ছাড়া সেখানে থাকা সম্ভব নয়। তার কাছে ত্রাণের আট কেজি চাল ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে ৭ জুলাই পাইনুচিং মারমা ও গীতা বড়ুয়া বাড়ি ছাড়েন। পরে ৯ জুলাই পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে পাইনুচিং মারমার ঘর ভেসে যায়। গীতা বড়ুয়ার ঘরটি গাছের খুঁটির ওপর নির্মিত হওয়ায় পুরোপুরি ভেসে যায়নি। তবে স্রোতের আঘাতে দুমড়েমুচড়ে গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তিংম্যায়ী মারমা বলেন, পাইনুচিং ও গীতা বড়ুয়ার পরিবারের অসহায় পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে তাদের আরও পাঁচদিন থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তাদের অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক বলেন, গৃহহারা দুই বৃদ্ধা নারীর বিষয়টি জেনেছি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তাদের আরও কয়েক দিন থাকতে দিয়েছেন। তাঁদের ঘরের বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাতকানিয়ায়ও দুর্ভোগে বন্যার্তরা: চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার কেঁওচিয়া গ্রামের প্রায় সব—ঘরবাড়ি ডুবে যায় গত সপ্তাহের অতি ভারী বৃষ্টিতে। আবদুল মালেকের (৪২) টিনের ছাউনি দেওয়া বেড়ার ঘরটিও বাদ যায়নি। বন্যায় সেটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভিটায় জমেছে পুরু কাদা। ঘরের কোনো আসবাই রক্ষা করতে পারেননি। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরে বিধ্বস্ত ঘরটি দেখে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। দুই মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে কোথায় থাকবেন জানেন না।
কেঁওচিয়া গ্রামের গেলে পেশায় দরজি আবদুল মালেক তাই ভিটার এক কোণে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন। তাঁর বাঁশ ও টিনের তৈরি বসতঘরটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভেঙে গেছে মাটির চুলাও। বাড়ির সব জায়গায় এখন কেবল কাদা আর কাদা। ধসে যাওয়া ঘরের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে প্রয়োজনীয় আসবাব। ঘরের বেড়া ও টিন আর ব্যবহারের উপযোগী নেই।
কথা বলতে চাইলে আবদুল মালেক বলেন, ‘আমার ত্রাণের খুব দরকার নেই। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। থাকার ঘর দেন। কাজ করে কোনো রকম স্ত্রী ও দুই মেয়েকে খাওয়াতে পারছি। কিন্তু ঘর তৈরি করার এত টাকা কোথায় পাব। সরকার যেন আমাদের জন্য দ্রুত একটা ব্যবস্থা করে।’ আবদুল মালেক আপাতত দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এক স্বজনের বাসায়। তিনি সেলাইয়ের কাজ করে দৈনিক পান ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। স্বল্প আয়ে পরিবার নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য়য, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ১০ জুলাই গ্রামটিতে পানি ঢুকে পড়ে। এতে মালেকের বসতঘরও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায়। তবে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার আগে মালেক পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। তিন দিন পানিতে ডুবে থাকার পর গত সোমবার তাঁর বসতঘরটি সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে। আবদুল মালেক ঘরটি নিজে তোলেননি বলে জানালেন। এটি তাঁর পৈতৃক বাড়ি। নতুন করে টিন, নির্মাণসামগ্রী কেনার টাকা নেই তার কাছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সব কটিই পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। এখন শুধু নলুয়া ও আমিলাইশ ইউনিয়নে কিছুটা পানি রয়েছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করছি। আবদুল মালেকের বিষয়েও আমরা খোঁজ নেব। এরপর দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন শুরু করব।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









