যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর তিন দিনের বাংলাদেশে সফর শেষ করেছেন। সফরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার প্রকাশ করা হয়। সার্জিও গর সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়।
বৈঠকে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাঁর নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। এই আস্থার ইঙ্গিত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান ভ্রমণ নির্দেশিকায় ইতিবাচক সংশোধন করেছে।
তিনি আরো বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। আগামী মাসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়। সার্জিও গর আশ্বাস দেন, বাংলাদেশে এফডিএ-র পরীক্ষাকার্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তিনি সহায়তা করবেন।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের (ডিএফসি) মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। জবাবে বিশেষ দূত বলেন, বাংলাদেশে ডিএফসির বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা শিগগির একটি ‘ইউএস ইনভেস্টর সামিট’ আয়োজন করতে আগ্রহী এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি নিজেও কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রী ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে বিনিয়োগে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে সার্জিও গর বলেন, এ খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এ বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেবেন বলেও জানান।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। বিশেষ দূত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগের দিনের সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকের বেশি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অবদান থেকে আসে। এজন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সার্জিও গর বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আসিয়ান, প্রতিবেশী দেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক আরিফুর রহমান এবং ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেনসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এ সব তথ্য জানান।
সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের সফরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার প্রকাশ করা হয়। গতকাল শনিবার ঢাকাস্থ মার্কিন এক প্রেস নোট এ বার্তা দিয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে তার সফর শেষ করেছেন। ঢাকায় অবস্থানকালে বিশেষ দূত সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপকতা ও গভীরতা তুলে ধরা হয়।
মার্কিন অর্থনৈতিক সুরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় সার্জিও গর বাংলাদেশকে ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেন। মার্কিন বিশেষ দূত বলেন, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে, এই খাতে এবং ভবিষ্যতে ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে অংশীদার হতে পারে। প্যাক্স সিলিকা ইনিশিয়েটিভ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর জন্য বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে গত ডিসেম্বরে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক-সুরক্ষা জোট। আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জ্যাকব হেলবার্গের নেতৃত্বে এটি প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হ্রাস করার জন্য মিত্র দেশগুলোকে একত্রিত করে।
আসছে মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল
যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং শিগগিরই একটি প্রতিনিধিদল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ সফরে আসবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর। গতকাল সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান। বৈঠক শেষে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে সার্জিও গর বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা আশা করছি, এই আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে।
তিন দিনের সরকারি সফরে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় পৌঁছান ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর। সফরের প্রথম দিনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে বাংলাদেশ ভ্রমণ এখন আগের চেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত হওয়ায় ভ্রমণ সতর্কতা আপডেট করে মার্কিন প্রশাসন। বাংলাদেশকে লেভেল-৩ থেকে কমিয়ে লেভেল-২-এ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সার্জিও গরের নেতৃত্বে আট সদস্যের এক মার্কিন প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের উখিয়ায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধিদলটি উখিয়ার ক্যাম্প-৮ ওয়েস্ট, ক্যাম্প-৬ ও ক্যাম্প-৪-এর মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ঘুরে দেখেন। এ সময় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের আকুতি জানিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কর্পোরেশন (ডিএফসি)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। জবাবে বিশেষ দূত জানান, বাংলাদেশে ডিএফসি-এর বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে কাজ করবে।
তিনি আরো বলেন, ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা শিগগিরই একটি ইউএস ইনভেস্টর সামিট আয়োজন করতে আগ্রহী এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে তিনি নিজেও কাজ করছেন। এসময় আগামী মাসে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ও উঠে আসে। সার্জিও গর জানান, বাংলাদেশে এফডিএ-র পরীক্ষাকার্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তিনি সহায়তা করবেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









