সববিষয়ে ৮০ নম্বর পেলে অনেকেই একে গোল্ডেন জিপিএ ৫ নামে অভিহিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পিতামাতাসহ সন্তান-শিক্ষকের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। পত্রপত্রিকায় ছাত্র-ছাত্রীদের, অভিভাকদের ছবি ও সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়। এতসব কর্মকাণ্ড হয় এজন্য যে, এসএসসি ও এইচএসসি হলো উচ্চশিক্ষার স্তম্ভ।
ছাত্র-ছাত্রীরা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা মিলে একটি টিম। এই টিম মিলে কাজ করলে ফল ভালো হওয়া অসম্ভব নয়। কোথায় গলদ তা খুঁজে দেখতে হবে। ঢাকা শহরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি। এর পেছনের সহায়ক শক্তি হলো, শহরের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা সুবিধা পর্যাপ্ত পেয়ে থাকে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, গ্রাম থেকে আগতরা সফলতার সাথে মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার পূর্ণ স্বাক্ষর রেখেছে।
সচ্ছল জনগণের সন্তানরা সুযোগ-সুবিধা পাবে, অন্যরা শিক্ষা বঞ্চিত হবে এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। ফলাফল ভালো দেখাতে গিয়ে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা হলো তৃপ্তির মানদণ্ড। একটা উদ্বেগের খবর চোখে পড়েছে, কলেজের সংখ্যা ক্রমানুগতিকভাবে কমে এসেছে। অনেক কলেজের আধিক্য দেখে আগে মন্তব্য শোনা যেত, যত্রতত্র কলেজ, কিন্তু শিক্ষার যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা নেই, তবু এমপিওভুক্ত হয়েছে। এজন্য সংখ্যা নয়, কলেজে শিক্ষাদানের গুণগত মান ঠিক রাখা জরুরি। ফলাফল ভালো দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শিক্ষার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি। সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই।
ফল বিপর্যয় বা ফেল কি বাস্তবতা- না এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষা বোর্ডের নিম্ন ফলাফলের কারণ অনুসন্ধান করা হয়নি। কেউ বলছেন, বিপর্যয় ছিল জুলাই গণঅভুত্থান পর্যন্ত। শিক্ষার বিপর্যস্ত অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়ার গতিতে ভাটা আসে। তথাপি, প্রতিবার রাজনৈতিক সরকার দেখাতে চায়, তাদের রাজনৈতিক শাসনামলে লেখাপড়া ভালো হয়েছে। এজন্য পরীক্ষায় পাস বেশি দেখানো, জিপিএ ৫ পাইয়ে দেওয়ার ইশারা থাকে। সে রকম এবার ছিল না। বরং এবার যেন কিছুই করা না হয়, শিক্ষার্থীরা যে নম্বর পায়, তাই দেওয়া হয় বলা হয়েছিল।
যারা মোটামুটি রেজাল্ট করেছে, তারা এই ফলকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে পারে। পাঠে মনোযোগ বৃদ্ধি ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান বৃদ্ধি করে নতুনভাবে তাদেরকে উজ্জীবিত রাখতে পারে। শিক্ষা বোর্ডের নিম্ন ফলাফলের কারণ অনুসন্ধান করা হয়নি। অভিভাবকরা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ বলছেন বিপর্যয় নয়, এ চিত্রই বাস্তব।
নতুন পাঠক্রম ও প্রশ্ন কাঠামো ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তারা উত্তর সঠিকভাবে দিতে পারে না। অনেক সময় অতিমারি ও সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনলাইনে পরীক্ষা দিতে হয়, যা তাদের এক ধরনের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে। সব সময় ইন্টারনেট ব্যবস্থা থাকে না, সেটাও একধরনের বিপত্তি। বলার অপেক্ষা রাখে না, শিক্ষকেরা চলমান ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অনভ্যস্ত। শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান অর্জিত হয় না, এমন অবস্থায় পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। এতে ফল বিপর্যয় বাড়ে। ফলাফল ত্রুটিপূর্ণ হয়। প্রশ্নের ধরন ও ফল নির্ণয়ে ত্রুটি থাকার চিত্র আমরা পাচ্ছি। উপরন্তু, ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষা ভীতি লেগেই থাকে। তারা লেখাপড়ায় মন দেয় না। । উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ঘুম চলে যায়। একধরনের মানসিক চাপ ও অমনোযোগিতা সৃষ্টি হয়। আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
ফলাফল বিপর্যয় উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্তরায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, স্বাভাবিকভাবেই। নতুন পাঠক্রমে আমাদের বহুমাত্রিক পরীক্ষা বাদ দিতে হবে। শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা জরুরি। অনলাইন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রযুক্তির গতি উন্নয়ন ও ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য করা প্রয়োজন। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে কোথাও কোনো অস্বচ্ছতা, অবমূল্যায়ন ও নম্বর প্রাপ্তিতে ঘাটতি রয়েছে কিনা তা অবশ্যই যাচাই-বাছাই করার পর্যাপ্ত সুযোগ বৃদ্ধি সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কাউন্সিলিং ব্যবস্থা চালুর বিষয় যাতে প্রাধান্য পায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এসব এসএসসির ফল বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার পথে সহায়ক। এজন্য শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার এখনই সময়।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয় শিক্ষা খাত ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে জটিল করবে। অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরীক্ষা গ্রহণকারী বোর্ডের নীতিনির্ধারকদের যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ এখন উপস্থিত। এখনই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারলে সংকট ঘনীভূত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ফলাফল দেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বেড়েছে। মাত্র দুইজন পাশ করার খবর মোটেও ভালো শিক্ষা কার্যক্রমের লক্ষণ নয়। ১২৫টি আসনের বিপরীতে মাত্র দুইজন উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। গ ইউনিটে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ অকৃতকার্য হয়েছে। কলা ও সামাজিক অনুষদে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেয় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী। এদের মধ্য থেকে শতকরা ৯ দশমিক ৪৫ ভাগ পাস করেছে। যারা ফেল করেছে তারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে এ প্লাস পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই । ইংরেজি বিভাগে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র দুইজন যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। অন্যান্য বিভাগেও একই অবস্থা। নামি-দামি কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ অকৃতকার্য হয়েছে।
মূল সমস্যা কোথায় তা অনুধাবন করতে হবে। স্কুল-কলেজে পাঠ কার্যক্রম নতুনভাবে বিন্যাস করা হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন । কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রকৃতভাবে শিক্ষিত হতে পারছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উপযুক্ত শর্ত পূরণ না করে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এতদিন যে শিক্ষাক্রম চালিয়েছে তা আইনসিদ্ধ না হওয়ায় অধিকাংশ সেবরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পথে। পাশ করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা গভীর-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন । প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তিচ্ছুক তারা বিপুল অর্থের বিনিময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে । কতজন টিকে থাকবে তা আমাদের জানা নেই। এদের মধ্য থেকে অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষার জন্যে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নেবে, বাকিরা লেখাপড়া বন্ধ করে বিষণ্ণতায় ভুগবে। পরের বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি কি তাদের থাকবে? অনেকে ঝরে যাবে। আবার অনেকে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে উচ্চশিক্ষা বঞ্চিত হয়ে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু জ্ঞান সঞ্চয় ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারছে এ প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বাড়ার সাথে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ গ্রহণের বঞ্চনা প্রত্যক্ষা করা যায়। ঢাকা নগরে শিক্ষার্থীদের কোচিং কিংবা প্রাইভেট পড়ার অবারিত সুযোগের পাশে অভিভাভকদের দুর্ভাবনা কমেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হতে পারে না। অনেকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, আবার অনেকে নাম সর্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশি অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে।
একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই শিক্ষার মান ও সার্টিফিকেট প্রাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ এ তথ্য সঠিক নয় বলে মতামত দিয়েছে।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করা, পরীক্ষার মাঝে বিরতি না দেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে যারা জড়িত তাদের কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদের মতে, বাংলাদেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের মেধার যথোপযুক্ত বিকাশ ও প্রয়োগ ঘটাতে পারছে না। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট সর্বস্ব শিক্ষা গ্রহণ করছে।
একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানা গেল, অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এ সংখ্যা আরো বেশি হবে। সংবাদসূত্র থেকে জানা গেল, এ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স ও প্রোগ্রাম পরিচালনায় সরকারের অনুমোদন নেই। ঢাকা শহরের যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন বোর্ড ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অভিহিত এসব অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের অর্থ নিচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কোচিং সেন্টার ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বাণিজ্যে নেমেছে। প্রতারক চক্র সক্রিয় রয়েছে। সরকার এ সব অনুমোদহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে স্বস্তি আসবে। যতদিন না জানা যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের নাম, ততদিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলতে থাকবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বসহ অবৈধ আউটার, ক্যম্পাসের শাখা নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। চটকদার বিজ্ঞাপন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের নামসংযুক্ত বিজ্ঞাপন দেখে প্রলুব্ধ হওয়ার সুযোগ আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়ার জন্যে ইউজিসি কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানিয়েছেন।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য। এমন অভিযোগ রয়েছে, নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা ক্লাস না নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। সবাই হচ্ছেন তা নয়, অধিকাংশ হচ্ছেন তা অস্বীকার করা যাবে না। হয়ত তাঁরা বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্প বেতনের কথা। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শর্ত মেনে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। একজন শিক্ষকের বেতন-ভাতাদি, সুযোগ-সুবিধা আর দশটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সরকারি-বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আমাদের একটি সনদ লাভ করা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য হয়ে গেছে। প্রকৃত শিক্ষিত না হলে অগ্রগতি পরিকল্পনা শুধু কাগুজে বাঘ হয়ে থাকবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি জুটছে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের। দরিদ্র মেধাবীরা এ প্রতিযোগিতায় পিছনে পড়ে যাচ্ছে। গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতি প্রবর্তনের ব্যাপারে শিক্ষা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা বহু বার মতামত দিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধারায় ভর্তি করা হয়। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্যে আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়। ভর্তি কোচিংয়ের জন্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যে নেমেছে। শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান হলে কোচিং নির্ভরতা থাকত না। কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত বলে অনেকেই মন্তব্য করে থাকেন। গত বছর ১৭ জন শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল জালিয়াতির কারণে আটক করা হয়েছিল। ভর্তি পরীক্ষার সময় ক্যালকুলেটর সঙ্গে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পক্ষে-বিপক্ষে বহু মত রয়েছে। ইন্টারনেট, ল্যাপটপ সুবিধা, ল্যাবরেটরি ব্যবহারের সুযোগ বেড়েছে। ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় ফল, সামগ্রিক বিবেচনায় তাদের জ্ঞান বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠছে না। এসএসএস ও এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৫ পাওয়াতে অভিবাবকরা উৎফুল্ল হলেও কার্যত বিশ্বব্যাপী ইংরেজিসহ অন্যান্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ঘাটতি থাকছে । যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সবক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব অর্জন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা চার-পাঁচ বছর পর জাতির স্টিয়ারিং ধরবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের মধ্য থেকে কেউ রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শিক্ষক হয়ে দেশ পরিচালনায় অংশ নেবে। ভাবী পরিচালক যদি বিদ্যা ও জ্ঞানে ঋদ্ধ হতে না পারে, তাহলে কল্যাণকর রাষ্ট্র আর সমৃদ্ধ মানুষ তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হব। শিক্ষা অর্জনের বিকল্প নেই। শিক্ষা ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। পাঠ কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করতে না পারলে আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থাকব। ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের লাইব্রেরি থেকে গ্রন্থ, গবেষণা নিবন্ধ ডাউনলোড করতে পারছে। লাইব্রেরিতে সরেজমিনে ঘুরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রয়োজন কমে এসেছে। সেই সাথে প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহার শিক্ষা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে এটাই কাম্য।
শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজন সামষ্টিক উদ্যোগ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষার সাথে জড়িত নীতিনির্ধারকদের সমবেত পরিকল্পনা শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান নৈরাজ্য কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে- সে ব্যাপারে দ্বিমত নেই। নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত ও দক্ষতাসম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠা এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সঙ্গতিপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও জাদুঘর কর্মকর্তা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









