গত মাসে নারায়ণগঞ্জের এক মা তার সন্তানদের জন্য সদ্য কেনা টুথপেস্টটিতে কিছুটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন। এর ফেনা হচ্ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অন্যরকমভাবে, পুদিনার বদলে হালকা রাসায়নিক গন্ধ আসছিল এবং টুথব্রাশে একটি খসখসে অবশিষ্টাংশ রেখে যাচ্ছিল। তিনি একটি চেনা দোকান থেকেই পরিচিত এবং বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট কিনেছিলেন, তবুও তার হাতের টিউবটি আসলে তা ছিল না, যা সে দাবি করছিল। কোনো এক গোপন সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার আড়ালে, বিএসটিআই পরিদর্শকের দৃষ্টিসীমার বাইরের কোনো লাইসেন্সবিহীন কারখানায়, কেউ হয়ত একটি পুরনো টিউব পুনরায় ভর্তি করেছে, অথবা একটি নকল টিউব তৈরি করে সিলগালা করে আসল হিসেবে বিক্রির জন্য বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। টুথপেস্টের টিউবের মতো এত ছোট ও সাধারণ একটি জিনিসই আজ বাংলাদেশে ভেজালের নীরব প্রতারণার বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকার পাইকারি বাজার থেকে ভুয়া বিএসটিআই সিলযুক্ত নকল প্রসাধনী, প্রসাধন সামগ্রী এবং টুথপেস্ট উদ্ধারের খবর বারবার সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি ভেজাল ভোজ্যতেল, গুঁড়োদুধ, মশলা, ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল এবং কোমল পানীয় নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ তো রয়েছেই। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে মাঝে মাঝে নকল পণ্যের গুদাম ধ্বংস করা হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যবসাটি আবার শুরু হয়, প্রায়শই কয়েক রাস্তা দূরেই। লাখ লাখ সাধারণ পরিবারের কাছে এই উদ্বেগটি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। বরং এটি এক সুনির্দিষ্ট ভয়! ঘরে থাকা চাল, দুধ, ওষুধ বা টুথপেস্টটি তাদের সন্তানদের ব্যবহারের জন্য সত্যিই নিরাপদ কি না, তা না জানার ভয়।
ভেজাল মূলত আস্থার প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। একজন দোকানদার, পরিবেশক বা উৎপাদক নিছক একটু বেশি লাভের আশায় একটি জিনিসকে অন্য কিছু বলে বিক্রি করে, যা সস্তা, বেশি বিষাক্ত বা সম্পূর্ণ নকল। প্রতিটি দূষিত নমুনার পেছনেই থাকে এক মানবিক মূল্য, যা পরিসংখ্যান দিয়ে কখনোই পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না। একটি শিশুর পেটের পীড়া, যার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা চিকিৎসক দিতে পারেন না; একজন বাবার কিডনি রোগ, যা বছরের পর বছর অনিরাপদ খাবার খাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে; অথবা শিক্ষার বদলে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হতে হতে একটি পরিবারের সঞ্চয় ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ভেজাল কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে আসে না। এটি লুকিয়ে থাকে আমাদের দৈনন্দিন সাধারণ কেনাকাটার ভেতর। যখন এর ক্ষতিকর দিকগুলো দৃশ্যমান হয়, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
বস্তুত, এ বিষয়ে বাংলাদেশে আইনের কোনো অভাব নেই। সমস্যাটি আইনের অভাবের চেয়ে বরং আইন ও তার প্রয়োগের মধ্যকার ফারাকের। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুসারে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে এবং অনিরাপদ বা ভেজাল খাদ্যের উৎপাদন, আমদানি বা বিক্রিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে; যেখানে বড় অঙ্কের জরিমানা এবং গুরুতর বা বারবার অপরাধের ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রসাধন সামগ্রীর মতো খাদ্যবহির্ভূত ভোগ্যপণ্যের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮ (বিএসটিআই আইন) অনুসারে বিএসটিআইকে বাধ্যতামূলক মান নির্ধারণ, আসল পণ্যের প্রত্যয়ন এবং যারা মানহীন পণ্য উৎপাদন বা বিক্রি করে অথবা এর প্রত্যয়ন চিহ্ন জাল করে তাদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষমতা দিয়েছে। বিএসটিআই মার্ক জাল করা নিজেই একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। কারণ, এটি ভোক্তাদের এমন একটি নিরাপত্তা নিশ্চিয়তার ওপর আস্থা রাখতে প্রতারিত করে, যা আদতে কখনো অর্জন করা হয়নি। পুরোনো আইনগুলোরও এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর খাদ্য, পানীয় এবং ওষুধের ভেজাল সংক্রান্ত ধারাগুলোর (২৭২ থেকে ২৭৬ ধারা) অধীনে, বিক্রির উদ্দেশ্যে থাকা কোনো পণ্যের সাথে জেনেশুনে ক্ষতিকারক পদার্থ মেশানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
এছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ আরো একধাপ এগিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মজুতদারি, কালোবাজারি এবং ভেজালকে এমন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সাধারণ নাগরিকদের প্রতারণামূলক বা ক্ষতিকারক পণ্যের বিষয়ে সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ায় দ্রুত জরিমানা আরোপ করা সম্ভব। সম্মিলিতভাবে, এই আইনগুলো একটি বেশ কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গঠন করে, যা অন্তত কাগজে-কলমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভোক্তাদের রুখে দাঁড়ানোর মতো বাস্তব হাতিয়ার প্রদান করে। তবে কাঠামোর উপস্থিতি মানেই সুরক্ষা নয়। সাধারণ ভোক্তা এবং সেই সাথে সৎ ব্যবসায়ীদের (যাদের ব্যবসাও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়) দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো আইনের প্রয়োগ খুবই দুর্বল, অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সহজেই প্রভাব বা ঘুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অভিযানগুলো প্রায়শই কেবল ছোটখাটো, দৃশ্যমান অপরাধীদের লক্ষ্য করে চালানো হয়, অন্যদিকে বড় বড় চক্রগুলো নির্বিঘ্নে তাদের কাজ চালিয়ে যায়।
বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তা বাজারের তুলনায় অনুমোদিত পরীক্ষাগারের সংখ্যা খুবই সীমিত, এবং বিএসটিআই পরিদর্শকদের একটি সুবিশাল ও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যে হিমশিম খেতে হয়। যে শাস্তিগুলো একসময় পর্যাপ্ত মনে হতো, তা এখন নকল পণ্য থেকে অর্জিত বিপুল মুনাফার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। ফলে অনেক অপরাধী মাঝে মাঝে হওয়া জরিমানাকে কেবল ব্যবসা পরিচালনার একটি সাধারণ খরচ হিসেবেই বিবেচনা করে।
তাহলে, কী বা কারা এই চিত্রটি সত্যিকার অর্থে বদলাতে পারে? আইনকে আরো শক্তিশালী করা হয়ত সামান্যই সাহায্য করবে; যা সবচেয়ে বেশি জরুরি তা হলো অপরাধীর আকার বা সংযোগের তোয়াক্কা না করে সমানভাবে বিদ্যমান আইন প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ঢাকার বাইরেও পরীক্ষাগারের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, যাচাইযোগ্য কিউআর (QR) কোডের মতো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বিএসটিআই-এর প্রত্যয়ন চিহ্নগুলোকে জাল করা কঠিন করে তোলা এবং অভিযোগগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ভোক্তা আদালতগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা- এসবের প্রতিটিই বাস্তবে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনসচেতনতা- যে নাগরিক জানেন কীভাবে বিএসটিআই নম্বর যাচাই করতে হয়, কোথায় অভিযোগ দায়ের করতে হয় এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের অধীনে তার অধিকারগুলো কী, তিনি কেবল সুরক্ষার অপেক্ষায় থাকা নিষ্ক্রিয় ভুক্তভোগী না হয়ে আইন প্রয়োগের প্রকৃত অংশীদার হয়ে উঠেন।
এমন একটি সমাজব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের নীরব যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে, যেখানে একজন মা তার সন্তানের জন্য কেনা টুথপেস্টটির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেন না, যেখানে রান্নার তেল কেনার সময় ক্রেতাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়, যেখানে প্রতিটি কেনাকাটাই বহন করে ছোট অথচ না-বলা এক ঝুঁকি। বাংলাদেশের আইন ইতোমধ্যেই ভেজালকে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা কেবল জরিমানাই নয় বরং কারাদণ্ডের যোগ্য। এখন যা বাকি রয়েছে তা হলো বাজার, কারখানা এবং গুদামগুলোতে যেখানে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, সেখানে এই স্বীকৃতির বাস্তবায়ন ঘটানো। তা না হওয়া পর্যন্ত, কেবল সন্তানদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সাধারণ পরিবারগুলোর কাঁধেই সতর্কতার এই অন্যায্য বোঝাটি চাপানো থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









