ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর (সিএমবিসি) এবং অন্যান্য যৌথ উন্নয়ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে চীন আশাবাদী। আগামী দিনে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা বিষয়ক ফোরাম-২০২৬’ শীর্ষক যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইয়াও ওয়েন বলেন, জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। ওই সফরে বাংলাদেশ ও চীন দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছরকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে গড়ে তুলতে উভয় দেশ কাজ করছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্প এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরসহ (সিএমবিসি) বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প আগামী দিনে বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, চীন বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত বন্ধু। দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।হুমায়ুন কবির বলেন, চীনের গত চার দশকের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা বলতে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় প্রয়োজনের আলোকে সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। হুমায়ুন কবির বলেন, গত চার দশকে চীন বিশ্বের অন্যতম সফল উন্নয়ন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
দেশটি প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে, বাজার সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে এবং বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, শূন্য শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনা, উৎপাদন খাতে সহযোগিতা, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে অংশীদারত্ব বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও গভীর ও বিস্তৃত করবে। বিশ্বব্যাপী কৌশলগত প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু সংকট ও পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ কোনো দেশ এককভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না। পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব বর্তমানে একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ঘোষিত ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।সুশাসনের গুরুত্ব তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এর মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং কার্যকর জনসেবার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয়। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, জনপ্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে জনসেবা উন্নত করার কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা নীতিনির্ধারণ, জ্ঞান বিনিময় এবং দক্ষ নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।বিআইআইএসএস ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও নীতিগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটি এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অবকাঠামো, বিমান যোগাযোগ, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক সংযোগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, টেকসই অবকাঠামো, পর্যটন, বাণিজ্য ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ আগ্রহী।
বিআইআইএসএস এবং চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স (এসআইআরপিএ) যৌথভাবে চার দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ফোরামের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









