দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে প্রসারিত হচ্ছে ঢাকা মেগাসিটি। জলাশয় ভরাট ও নিচু ভূমি দখল করে একের পর এক এমন সব বহুতল ভবন গড়ে উঠছে, যা শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলাতে পুরোপুরি অক্ষম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর ভঙ্গুর ভূগর্ভস্থ গঠন এবং সয়েল লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরলীকরণ ঝুঁকি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর সাথে নির্মাণ খাতের কাঠামোগত ত্রুটি যুক্ত হওয়ায় একটি তীব্র ভূমিকম্প নিমেষেই রাজধানীজুড়ে ভয়াবহ মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই দুর্যোগের আশঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে, যা লাখো মানুষের জীবনকে ঠেলে দিয়েছে চরম ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, শক্তিশালী ভূমিকম্পে ঢাকা মহানগরের বিশাল অংশের বাসিন্দারা চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণায় তুলে ধরা হয় রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকাই গড়ে উঠেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং লিকুইফ্যাকশন বা মাটির তরলীকরণ-প্রবণ ভূমির ওপর।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা নেই রাজউকে
রাজউক ও বুয়েটের যৌথ সমীক্ষায় প্রস্তুতকৃত ঝুঁকি মানচিত্র (হাজার্ড ম্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকার মূল উদ্বেগ ভূ-গর্ভস্থ নরম মাটি এবং অপরিকল্পিত জলাশয় ভরাট। বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় নতুন আবাসন, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরবর্তী এলাকাগুলো অত্যন্ত নরম ও বেলে মাটি দিয়ে গঠিত। এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দৈনিক এদিনকে জানান, ড্যাপ-২০২২ গ্যাজেটের পর ম্যাপটি পাওয়ায় এটি বর্তমানে সরকারের বিবেচনাধীন এবং ২০২৭ সালের ড্যাপ সংশোধনীতে তা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হবে।
দৈনিক এদিনের এক প্রশ্নের জবাবে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ স্বীকার করেন, স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ ৫৫ বছর ঢাকায় ভবন নির্মাণে স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং অনুমোদনের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। তবে গত ডিসেম্বর (২০২৫) থেকে এটি শতভাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, এই দীর্ঘ সময়ে ঝুঁকি মানচিত্রভুক্ত এলাকায় ঠিক কতসংখ্যক ভবন নির্মিত হয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা বর্তমানে রাজউক দপ্তরে নেই।
রাজউক কর্মকর্তার বক্তব্যে রিহ্যাবের তীব্র ক্ষোভ
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। দৈনিক এদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রিহ্যাব তালিকা-বহির্ভূত ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংগঠনটি নিশ্চিত নয়।
তবে তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, রিহ্যাব তালিকাভুক্ত সকল সদস্য প্রতিষ্ঠান সর্বদা রাজউক অনুমোদিত স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং ও মূল নকশা কঠোরভাবে মেনে ভবন নির্মাণ করে আসছে। রিহ্যাব মেম্বাররা সব সময়ই এই পেশাদারিত্ব এবং গুণগত মান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। একই সাথে, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে রাজউক কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে আরো সচেতন ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান রিহ্যাব সভাপতি।
ভূমিকম্পের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বুয়েটের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, মেগাসিটি ঢাকার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকাই লিকুইফ্যাকশন মানচিত্রের লাল এবং ম্যাজেন্টা জোনের অন্তর্ভুক্ত, যা মূলত মাটির চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকেই নির্দেশ করে। এলপিআই ১৫-এর বেশি হলে তা লাল জোন বা সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, ১০ থেকে ১৫ হলে ম্যাজেন্টা জোন বা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ।
লাল জোন (সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ): সাভার, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বাড্ডা, আশুলিয়া, দারুস সালাম, লালবাগ ও নিউ মার্কেটসহ হযরতপুর, তেঘরিয়া, কোন্ডা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, কলাগাছিয়া, বন্দর, মোগরাপাড়া, বক্তাবলী, জলসিঁড়ি, ডুমনি ও কাটাবলী এলাকা। এছাড়ামোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও পাথালিয়ার একাংশ এই জোনের অন্তর্ভুক্ত।
ম্যাজেন্টা জোন (মাঝারি-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ): ঝিলমিল, পল্লবী, মতিঝিল, তেজগাঁও, খিলগাঁও, রামপুরা, পল্টন, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, রূপগঞ্জ, কোনাবাড়ী ও ভুলতাসহ ক্যান্টনমেন্ট, আদাবর, সবুজবাগ, কদমতলী, কদম রসুল, মুছাপুর, সাদীপুর ও কাঁচপুর। একইসঙ্গে হরিরামপুর, বিরুলিয়া, কাফরুল, দক্ষিণখান, ফতুল্লা ও হাজারীবাগের কিছু অংশ এর আওতাভুক্ত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী দৈনিক এদিনকে বলেন, ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে লাল জোনের এলাকাগুলোতে মারাত্মক ভূমিধস বা মাটির বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিশেষ করে নদী, খাল ও পুকুর তীরবর্তী যেসব স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক ওপরে, সেসব অঞ্চল সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে পড়বে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী প্লাবনভূমিগুলোর । নরম কাদা ও নতুন ভরাট করা জমির কারণে এসব এলাকায় ভালো মাটির স্তর প্রায় ৮০-১৫০ ফুট গভীরে অবস্থিত। ফলে নদী তীরবর্তী এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।
মেক্সিকো সিটির মতোই বড় বিপদে ঢাকা
ভূমিকম্পের তীব্রতা বৃদ্ধির (সিসমিক অ্যামপ্লিফিকেশন) বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক ড. আনসারী ১৯৮৫ সালের মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের উদাহরণ টানেন। সে সময় ভূমিকম্পের মূল উপকেন্দ্রটি (এপিসেন্টার) প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও, এখানকার নরম মাটির কারণে কম্পনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় ওই শহরের বহু মাঝারি উচ্চতার ভবন ধসে পড়েছিল। তিনি আরো বলেন, বালু দিয়ে কৃত্রিমভাবে ভরাট করা জমি মাটির তরলীকরণ ও তীব্রতা বৃদ্ধি উভয় ঝুঁকিরই মূল কারণ। অন্যদিকে, নরম কাদা মাটি মূলত কম্পনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়, যা চরম বিপজ্জনক। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বালু নদ ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী ঢাকার সাম্প্রতিককালের সম্প্রসারিত অংশের এক বিশাল এলাকাই মূলত বালু দিয়ে ভরাট করে বা জলাভূমি সম্পূর্ণ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে।
পাইলিংয়ের ওপর বসানো ঢাকার ৯০% ভবন
অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার ভরাট করা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সয়েল ট্রিটমেন্ট বা মাটির গুণগত মান উন্নয়ন ছাড়া ভবন নির্মাণ চরম বিপজ্জনক। তবে অতিরিক্ত খরচের অজুহাতে আবাসন ব্যবসায়ীরা প্রায়শই এই প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে যান। মাটির সঠিক কমপ্যাকশন বা ঠাসা বুনটের জন্য ঢিলেঢালা ভরাটের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি উপাদানের প্রয়োজন হয়। বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী সতর্ক করে বলেন, যথাযথ ভূমি উন্নয়ন না করায় ঢাকার ভরাট করা এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ ভবনই এখন কেবল পাইলিংয়ের ওপর ভর করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০০১ সালে ভারতের কান্ডালা বন্দরের ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে দুর্বল ও পানিসিক্ত মাটিতে স্থাপনের কারণে ৬০ ফুট গভীর পাইলিং থাকা সত্ত্বেও একটি ভবন ১৫ ডিগ্রি হেলে পড়েছিল। ড. আনসারী জানান, সাধারণত ৪০-৪৫ মিটার গভীর ভরাট মাটিতে কেবল উপরিভাগের ৫-৬ মিটারের উন্নয়ন ঘটালেই ভূমিকম্পের তীব্রতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু কোনো সংস্কার না করায় মাটির উপরিভাগ ও তলদেশের নরম স্তরগুলো দুর্বলই থেকে যায়। ফলে শক্তিশালী ভূকম্পনের সময় পাইলিং বেঁকে ভবন হেলে পড়ে।
‘বড় ভূমিকম্পেও টিকবে রিহ্যাব সদস্যদের ভবন’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর গবেষণা প্রতিবেদনে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই সতর্কবার্তার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল।
দৈনিক এদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিশ্চিত করেন, রিহ্যাব তালিকাভুক্ত আবাসন ব্যবসায়ীরা দেশের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (বিএনবিসি) কঠোরভাবে মেনে ভবন নির্মাণ করেন। ফলে ৮.৫ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পেও তাদের নির্মিত ভবনগুলো টিকে থাকবে। ড. আফজাল আরো জানান, রিহ্যাব সদস্যরা ভবনে শতভাগ মানসম্পন্ন রড ও সিমেন্ট ব্যবহার করেন, যা উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল এবং নিরাপদ।
ঝুঁকি অনুযায়ী লাল-হলুদ সংকেত দেবে রাজউক
চলমান ও ভবিষ্যৎ ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা তৈরিতে সরকার দ্রুতই একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে বলে দৈনিক এদিনকে জানিয়েছেন রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম।
তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ার আওতায় মাঠ পর্যায়ে প্রতিটি ভবন সরেজমিনে পরিদর্শন করে সেগুলোকে উচ্চ, মধ্যম ও কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ভবনগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেতে বিভক্ত করে বসবাসের উপযোগিতা নির্ধারণ করা হবে। এই কালার কোড বা সংকেতের মাধ্যমে রাজউক পরবর্তীতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনের স্থায়িত্ব ও ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) কঠোরভাবে অনুসরণের পাশাপাশি যথাযথ পাইলিং ও মাটির গুণগত মান উন্নয়নের (সয়েল ইমপ্রুভমেন্ট) তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। ভূমিকম্প ও ভূতত্ত্ব প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ আনসারী এদিনকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এসব অঞ্চলে ভবন সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরী। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আদলে আধুনিক সিমেন্ট ইনজেকশন পদ্ধতি প্রয়োগ করে বালুময় মাটিকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও ভূমিকম্প-সহনীয় করা সম্ভব। তিনি বলেন , অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণে এমন বিজ্ঞানসম্মত এবং টেকসই প্রকৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









