দেশে চলমান গ্যাস সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। গভীর সংকটে পড়ে গেছে উৎপাদনমুখী শিল্পখাত। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক শিল্প-কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভর করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ হারে, যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় কঠিন হয়ে পড়ছে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি চালান পাঠানো। যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়া, ক্রয়াদেশ বাতিল ও ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো উৎপাদনে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। জেনারেটর চালু রাখতে কারখানা মালিকেরা প্রতি লিটার ডিজেলের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০ টাকা অতিরিক্ত গুনে যাচ্ছেন।
ফলে গ্যাস ঘাটতি এখন পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ সংকটেও রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই সংকট দেশের পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘গ্যাস সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এখন তাদের ব্যবসায়িক কৌশল নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কিছু কারখানাকে আপাতত উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকদের। গ্যাস সংকটে অনেক কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে বলেও জানান তিনি।
বড় সংকটে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ বাবদ মোট ইউটিলিটি বিল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। একদিকে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়- এই দুইয়ের চাপ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট এখন তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে কারখানাগুলোকে দীর্ঘ সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।’ গাজীপুরের কারখানায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা এবং নারায়ণগঞ্জ কারখানায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। ডিজেলের উচ্চমূল্যে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে বলেও জানান এই শিল্প উদ্যোক্তা।
এদিকে, দীর্ঘদিনের কম গ্যাস প্রেশারের সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এর ফলে রপ্তানির সময়সীমা বজায় রাখতে উদ্যোক্তাদের বাধ্য হয়ে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। আশুলিয়ার রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার একজন উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছি। এখন বিদ্যুৎও পাচ্ছি না। কেবল জেনারেটর চালু রাখতে আমরা ফিলিং স্টেশন থেকে লিটারপ্রতি ১০ টাকা বেশি দিয়ে ডিজেল কিনছি।’
গ্যাসের অভাবে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে তিন লাখ স্পিন্ডলবিশিষ্ট একটি স্পিনিং মিলের উৎপাদন প্রায় বন্ধ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানাটির মালিক জানান, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের দৈনিক গ্যাস বিল হতো প্রায় ২০ লাখ টাকা, অথচ এখন কেবল ডিজেল কিনতে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা।
আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের অনিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে কারখানাগুলো সক্ষমতার অনেক নিচে চলতে বাধ্য হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কেবল সিলেট অঞ্চলের হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা, যেখানে গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে, তারাই অনেকাংশে এই সংকট থেকে বাঁচতে পেরেছে। শিল্প নেতারা বলছেন, চরম আকার ধারণ করা এই জ্বালানি সংকট এমন এক সময়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করছে, যখন রপ্তানিকারকেরা বৈশ্বিক চাহিদার মন্দাবস্থা, ক্রমবর্ধমান খরচ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফপিআইএ) সভাপতি ও টাম্পাকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিউস সামি আলমগীর বলেন, ‘গ্যাস সংকটে আমরা চরম সমস্যায় আছি। আমাদের এলাকা থেকে শুরু করে ফ্যাক্টরিগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য। কোনোভাবেই জেনারেটর বা বার্নার চালাতে পারছি না। বাধ্য হয়ে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’ গ্যাস সংকটে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরে ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু ডিজেল ব্যবহার করলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।’ সাফিউস সামি আলমগীর বলেন, ‘আমাদের ফ্যাক্টরি টঙ্গীতে। শুধু টঙ্গী নয়, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ সব জায়গাতেই একই ধরনের গ্যাস সংকট চলছে।’
কমছে উৎপাদন সক্ষমতা
গ্যাসনির্ভর প্রধান প্রধান শিল্প কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক মাস আগেও ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। এমনকি বেশ কিছু উৎপাদন ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতায় থাকা শিল্পাঞ্চলগুলোতে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টার ভয়াবহ লোডশেডিং এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ব্যাপকভাবে উৎপাদনে এই ব্যাহত হওয়ার ঘটনায়, কীভাবে শ্রমিকদের বেতন দেবেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করবেন আর ব্যাংক ঋণের কিস্তি মেটাবেন— তা নিয়ে কারখানা মালিকদের মনে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রপ্তানি আদেশ সরে যাওয়ার আশঙ্কা
অন্যদিকে বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বিদেশি ক্রেতারাও। বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, অর্ডার দিলে তা সঠিক সময়ে সম্পন্ন করতে পারবে কি না— তা এখানকার সরবরাহকারীদের কাছে জানতে চাচ্ছেন তারা। কেউ কেউ অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন বা বাংলাদেশ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। বিটিএমএ’র সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে এসব অর্ডার ফিরিয়ে আনা যাবে কিনা, সন্দেহ আছে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিএমএ'র একজন সিনিয়র কর্মকর্তা একজন ইউরোপিয় বায়ারের মেইলের বরাত দিয়ে বলেন, ওই ক্রেতা গ্যাস সংকটে তার অর্ডারের কিছু অংশ বাংলাদেশ সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়ে মেইল দিয়েছেন। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না করা গেলে বাংলাদেশ তাদের মোট রপ্তানি আদেশের প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন শিল্পনেতারা।
চরম সংকটে টেক্সটাইল মিলও
প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থাকা দেশের অন্যতম প্রধান গ্যাস ব্যবহারকারী টেক্সটাইল খাত এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প জ্বালানিতে নির্ভর করা সত্ত্বেও কারখানাটি সক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশের মতো উৎপাদন বজায় রাখতে পারছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মাস থেকে কীভাবে শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের বিল দেব তা আমার জানা নেই।’ মোশাররফ জানান, পরিচালন ব্যয় মেটাতে কোম্পানিটি এ পর্যন্ত গ্রুপের অন্যান্য ব্যবসার তহবিল ব্যবহার করেছে। কিন্তু এভাবে কতদিন চালানো যাবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ এবং ডিজেল জেনারেটর একসঙ্গে ব্যবহার করার পরও কারখানাটি মাত্র ২০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে বলে জানান আড়াইহাজারের একটি স্পিনিং মিলের মালিক। তিনি জানান, গ্যাস ঘাটতিতে প্রতিদিন তার প্রায় দেড় কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকের বেতন আর অন্য খরচ চালাতে নিজের বাড়ি, জমি বিক্রি করতে হবে হয়তো।’
সাভারের আশুলিয়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, তাদের অনুমোদিত গ্যাসের প্রেশার ১০ পিএসআই থাকলেও তারা পাচ্ছেন মাত্র ০.৫ থেকে ১.৫ পিএসআই। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা (ইউপিএস), বিদ্যুৎ এবং সৌরবিদ্যুতের সাহায্য নেওয়া সত্ত্বেও কারখানাটি তার সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশের মতো বজায় রেখে চালু রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘আমরা চিন্তিত যে কীভাবে শ্রমিকদের বেতন দেব। শেষ পর্যন্ত হয়তো কারখানাটি চালুই রাখা সম্ভব হবে না।’
অন্যান্য শিল্পেও তীব্র চাপ
এই সংকট ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য শিল্পেও। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, গ্যাস সরবরাহের অভাবে তাদের ৭০টি সদস্য কারখানার মধ্যে ২৫টিই উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘এই শিল্প এখন চরম নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। আমরা এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আছি।’
চামড়া খাতও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন এবিএস ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, বাইরে থেকে গ্যাসের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও তার কারখানার মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ৭-৮ লাখ বর্গফুট থেকে কমে দেড় লাখ বর্গফুটের নিচে নেমে এসেছে। যেসব অর্ডার রয়েছে, সেগুলোও তৈরি করতে পারছি না। এতে করে ওভারহেড কস্ট যেমন বাড়ছে, তেমনি সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট করতে না পারায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।’ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে এখন আমরা মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছি। কেউ কেউ সেটিও পাচ্ছেন না। ফলে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ—সবকিছুই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।’
ইস্পাত শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রায় ৪০টি স্বয়ংক্রিয় ইস্পাত কারখানার অধিকাংশই ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরশীল। উচ্চচাপের গ্যাস লাইন ব্যবহারকারী বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে কম চাপের লাইনের সাথে যুক্ত অনেক ছোট কারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী জানান, ইস্পাত শিল্পের মেশিনারি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। একবার বন্ধ হলে আবার চালু করতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক কারখানায় এখন দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি আর দুই সপ্তাহ চলতে থাকলে শিগগিরই অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
ওষুধ শিল্পেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রায় ৩০০টি ওষুধ কারখানার অধিকাংশ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসে নির্ভর করে এবং তারা দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জাকির হোসেন বলেন, ফার্মা সেক্টরের অধিকাংশ কারখানা ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস-নির্ভর। ২০২২ সাল থেকেই এসব কারখানা গ্যাস সংকটে ভুগছে। লোডশেডিং হলেই এখন কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। তিনি বলেন, ‘সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআইয়ের বেশি লাগে। গত কয়েক দিন ধরে সেটি থাকছে না। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে লোডশেডিংও বেড়েছে। এখন ঢাকার বাইরে কারখানাগুলো দৈনিক ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং দেখছে। এতে দিনের একটা বড় সময় উৎপাদন ব্যাহত হয়।’
পরিস্থিতির উন্নতির আশা সরকারের
সরকার আশা প্রকাশ করছে, আগামী দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হবে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে শিল্প মালিক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সহসা এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তারা বলছেন, যে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে, তার জন্য সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। ফলে বিকল্প গ্যাসের উৎস নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিল্প কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকিতেই থেকে যাচ্ছে।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে। শিল্প প্রতিনিধিরা বলছেন, এটি পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে দেশের তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপন এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণেরও পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত মঙ্গলবার চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সাথে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির অধীনে, মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।জ্বালানি বিভাগের মতে, চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার ১৮ মাসের মধ্যে টার্মিনালটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম সরকারের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৮ মাসের মধ্যে এফএসআরইউ বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।তিনি জানান, সাধারণত একটি এলএনজি ক্যারিয়ারকে এফএসআরইউ-তে রূপান্তর করতেই অন্তত দুই বছর সময় লাগে, যেখানে সম্পূর্ণ নতুন একটি তৈরি করতে ন্যূনতম তিন বছর সময় লাগতে পারে। তামিমের মতে, ‘এলএনজি স্টোরেজ এবং অন্যান্য ক্রিটিক্যাল কম্পনেন্টগুলো যদি এই চাইনিজ কোম্পানিটির কাছে প্রস্তুত থাকে, তাহলেই তারা আঠারো মাসের মধ্যে করতে পারবে। অন্যথায় পারবে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









