দেশের জ্বালানি খাত যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা এখন আর শুধু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া বা বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই সংকট সরাসরি আঘাত করছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতিতে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তা। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধ এবং বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের সমস্যায় জনজীবনও ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনও দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের হাতে তাৎক্ষণিক বিকল্প সীমিত- এটি বাস্তবতা। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। নরসিংদী-মাধবদীর টেক্সটাইল, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানাও গ্যাসের অভাবে বন্ধ থাকার খবর উদ্বেগজনক।
একটি কারখানা বন্ধ হওয়া মানে শুধু মালিকের আর্থিক ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে শ্রমিকের আয়, ব্যাংকঋণ পরিশোধ, রপ্তানি আয় এবং সরকারের রাজস্ব- সবকিছুই জড়িত। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষও তৈরি হতে পারে। ডিজেল ব্যবহার করে শিল্পকারখানা সচল রাখার চেষ্টা সাময়িকভাবে উৎপাদন ধরে রাখলেও এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচও বাড়ে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ফুটওয়্যার ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাই সরকারকে একই সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা, বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সরবরাহ পরিকল্পনা জরুরি। পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তাদের আগে থেকেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাব্য সময়সূচি জানানো উচিত, যাতে তারা বাস্তবসম্মত উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখীকরণে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিল্প ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই। বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তাই শুধু একটি জরুরি পরিস্থিতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সামনে একটি বড় সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে এর অর্থনৈতিক মূল্য আরো বড় হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









