বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এখন আর কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের ফাইল কিংবা সরকারের দৈনন্দিন প্রশাসনিক সমস্যার নাম নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জাতীয় সংকট। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া, দীর্ঘ লোডশেডিং, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে যে বিরক্তি ও উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে মানুষের বিক্ষোভ কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘেরাওয়ের ঘটনাগুলোও আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে; সমস্যাটি এখন কাগজের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা মানুষের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সংসদের বিরোধীদলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্য। সাধারণত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী দল সরকারের ভুল খুঁজবে, সমালোচনা করবে, ব্যর্থতার তালিকা দেবে, এটাই যেন স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এবার আমি এমন একটি দৃষ্টান্ত দেখতে পেলাম, যেখানে বিরোধী দলের একজন নেতা শুধু সরকারের সমালোচনা করেননি, সমস্যাটিকে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। এই জায়গাটিই আমার কাছে প্রশংসার দাবি রাখে।
নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক দলের সমর্থক হয়ে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে আমি তাঁর এই উদ্যোগকে মূল্যায়ন করছি। ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলা যদি রাজনীতির বাইরে নাগরিক দায়িত্ব হয়, তাহলে এই জায়গায় প্রশংসা করতেও আমাদের সংকোচ থাকা উচিত নয়। আমি বরাবরই মনে করি, একজন রাজনৈতিক নেতা কেবল নিজের দলের স্বার্থের পাহারাদার নন; তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিও দায়বদ্ধ। শেখ হাসিনা সরকারের শুরুর দিকে তার যেসব ভালো উদ্যোগ ছিল, সেগুলোর প্রশংসা আমি করেছি। কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে চাটুকারিতা যখন যুক্ত হলো, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা কমতে শুরু করল এবং মানুষের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রবণতা বড় হয়ে উঠল, তখন আমি তার সমালোচনাও করেছি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও সেই অবস্থান থেকে সরে আসিনি। একই নীতি আমি নাহিদ ইসলামের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে চাই। তিনি ভালো কোনো প্রস্তাব দিলে তার প্রশংসা করব, ভুল করলে সমালোচনা করব। রাজনৈতিক দল পছন্দ করা আর রাষ্ট্রের স্বার্থে ভালো উদ্যোগকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়।
নাহিদ ইসলামের প্রস্তাবগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি সংকটকে শুধু আজকের লোডশেডিং দিয়ে দেখেননি। তিনি জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, সরকারি সংস্থার সক্ষমতা, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়, বিতরণব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে একই আলোচনার মধ্যে এনেছেন। আমার বিবেচনায় সরকারের উচিত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে এসব প্রস্তাব একে একে যাচাই করা এবং যেগুলো বাস্তবসম্মত, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
তাৎক্ষণিকভাবে প্রথম যে বিষয়টি দেখা দরকার, তা হলো জ্বালানি খাতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অস্বাভাবিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ। বসুন্ধরা গ্রুপকে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের কর্তৃত্ব দেওয়ার জন্য যদি সত্যিই কোনো তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তাহলে সেটি অবিলম্বে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যায় না। বসুন্ধরা হোক কিংবা অন্য কোনো বড় প্রতিষ্ঠান। সরকারের দায়িত্ব হলো প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, একচেটিয়া কর্তৃত্ব সৃষ্টি না করা। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত তার মূল্য জনগণকেই দিতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র দশ দিনের সময়সীমা রেখে বড় ধরনের জ্বালানি ক্রয়প্রক্রিয়া পরিচালনা করলে প্রতিযোগিতা কতটা নিশ্চিত হয়, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। নাহিদ ইসলাম যে সময়সীমা ৪২ দিনে ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন, সেটি অন্তত আলোচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি ক্রয়ের সময়সূচি দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়। মহেশখালীর দুর্ঘটনার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনা স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে, আবার অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে। তাই অনুমাননির্ভরভাবে একে নাশকতা বলা যেমন দায়িত্বশীল হবে না, তেমনি তদন্ত না করে বিষয়টি চাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন থাকলে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত ঘটনায় সত্য গোপন করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
গ্যাস বরাদ্দের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচিতি বা প্রশাসনিক চাপ নয়, তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার দরকার। কোন খাতে কত গ্যাস গেলে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনগণের ওপর সর্বাধিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে; তার একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। একইভাবে আগামী ছয় মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার না করলে বর্তমান সংকট বারবার ফিরে আসবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের একচেটিয়া ক্রয়ক্ষমতা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে, তবে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা রাষ্ট্রের হাতেই থাকতে হবে। বেসরকারি খাতে পরিশোধিত তেল আমদানির বদলে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া যায় কি না, সেটিও অর্থনৈতিক ও কারিগরি বাস্তবতার আলোকে পরীক্ষা করা দরকার। লক্ষ্য হওয়া উচিত কম খরচে, স্বচ্ছভাবে এবং নিরাপদে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সক্ষমতা ভাড়া। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও যদি বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার পূর্ণ নিরীক্ষা হওয়া আবশ্যক। একই সঙ্গে দায়মুক্তির বিধান বাতিল করে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সংকটকে আলাদা করে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বকেয়া নিষ্পত্তির একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং বিতরণ সংস্থাগুলোর ওপর জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সিস্টেম লস কমানোও অত্যন্ত জরুরি। ম্যানুয়াল মিটার ও দুর্বল তদারকির জায়গায় ধীরে ধীরে সর্বত্র স্মার্ট মিটার চালু করা গেলে চুরি, অপচয় ও ভুল হিসাব কমানো সম্ভব। প্রযুক্তি এখন বিলাসিতা নয়; এটি সুশাসনের অন্যতম হাতিয়ার।
এলপিজি বাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো একক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। বসুন্ধরাসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হোক, বাজারের কাঠামো পরীক্ষা করা হোক, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোক্তার স্বার্থই যেন কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া জ্বালানির বাজার কোনোভাবেই সুস্থ বাজার হতে পারে না।
তবে এসব তাৎক্ষণিক সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে আনতে হবে। আমাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাসমান টার্মিনাল মাত্র দুটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তৃতীয় ও চতুর্থ টার্মিনালের সম্ভাবনা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ বাণিজ্য-আলোচক নিয়োগ করতে হবে। দেশের নিজস্ব অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানিকে বিনিয়োগ দিতে হবে; প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ বিদেশি বিশেষজ্ঞদেরও কাজে লাগাতে হবে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে সৌরবিদ্যুতের বিকাশ ঘটছে। আমাদেরকেও সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। দেশে যেসব সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে সেগুলোকে আমি টুকটাক বলবো। কারণ, আমি যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে এসেছি সেখানে বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলোতে সৌরবিদ্যুতের মাইলকে মাইল প্যানেল স্থাপন করার দৃশ্য আমার চোখে পড়েছে। সেই সাথে এও বলি, বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন নিজের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। সৌরপ্যানেল, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও এমন লক্ষ্যই আমাদের সামনে থাকতে হবে। আমাদের সরকারের আন্তরিকতা থাকলে ১০ হাজার মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হবে না।
আমি এখানে কয়টি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। সরকার যখন এমন সংকটের মুখোমুখি, তখন বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা আরো সুস্পষ্ট, তথ্যভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত প্রস্তাব কেন পাচ্ছি না? তারেক রহমানকে সাহস করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার মতো মানুষ কি বিএনপিতে একজনও নেই? বিরোধিতা করা সহজ; রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন সমস্যার সমাধান দেখানোই আসল রাজনৈতিক পরিপক্বতা। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট কোনো দলের একার সংকট নয়। আজ যে সরকার ক্ষমতায়, কাল অন্য কেউ ক্ষমতায় আসতে পারে; কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসক্ষেত্র, জ্বালানি আমদানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা; সবই রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের মানুষের সঙ্গে বসতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভালো প্রস্তাব গ্রহণ করলে সরকারের মর্যাদা কমে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ে।
আমি নাহিদ ইসলামের সব প্রস্তাবের সঙ্গে অন্ধভাবে একমত নই। কিন্তু তিনি যে সংকটের সময়ে সরকারকে শুধু আক্রমণ না করে সমাধানের কথাও বলেছেন, সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুসরণযোগ্য একটি দৃষ্টান্ত। এখন সরকারের কাজ হলো কে বলেছে সেটি না দেখে কী বলা হয়েছে তা বিচার করা। কারণ, বিদ্যুৎ যখন নেই, গ্যাস যখন নেই, তখন জনগণের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো মূল্য নেই। তাদের দরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস, সহনীয় জ্বালানির দাম এবং একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। এই সত্যটি সরকার যত দ্রুত বুঝবে, তত দ্রুতই সংকট থেকে বের হওয়ার পথও তৈরি হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









