সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধের মীমাংসা হয়েছে। তবে সমঝোতার অন্যতম শর্ত হিসেবে আগামী বছর থেকে সোনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন। গতকাল রবিবার সকালে এদিনকে দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘শনিবার রাতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বিবাদমান দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আয়োজক কমিটি ২৮ আগস্ট নৌকাবাইচ আয়োজনের জন্য এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুমতি নিয়েছে।’
তিনি বলেন, নৌকাবাইচের কারণে নদীভাঙন ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবার নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলেও আগামী বছর থেকে সোনাই নদীতে আর নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না। এর আগে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয় ‘-এর ব্যানারে একটি পক্ষ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানায়। তবে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছিল, ওই দাবিতে নৌকাবাইচ বন্ধ হবে না। নির্ধারিত সময়েই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২৮ আগস্ট স্থানীয় সোনাই নদীর তৃগাংগারমুখ এলাকায় নৌকাবাইচটি হওয়ার কথা রয়েছে।
গত শনিবার রাতে বারইগ্রাম বাজারে নৌকাবাইচ নিয়ে বিরোধের বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। এতে লাউতা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের যুবক, মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর পারস্পরিক সমঝোতায় বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়। বৈঠকে লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বক্তারা বলেন, নৌকাবাইচ এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে কোনো ভুল বোঝাবুঝি যেন এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট না করে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হক কাসেমি এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি হোসেন আহমদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে তারা সমঝোতায় মত দিয়েছেন। আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রবিবার সকালে এদিনকে বলেন, স্থানীয়দের আন্তরিক সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমে জটিলতার সমাধান হয়েছে। নির্ধারিত সময়েই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হবে।
বিরোধের শুরু যেভাবে
এর আগে গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় বারইগ্রাম বাজার মসজিদের দোতলায় নৌকাবাইচ বন্ধের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’-এর ব্যানারে একটি পরামর্শ সভা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘ঈমানী দায়িত্ববোধে’ উপস্থিত হয়ে মতামত ও পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সভাটি আহ্বান করেন মাওলানা নূরুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হক কাসেমী, মাওলানা জালাল উদ্দিন ও মাওলানা গৌছ উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চারজনই জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। নূরুর রহমান লাউতা ইউনিয়ন শাখার প্রধান উপদেষ্টা, আব্দুল হক কাসেমী বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার সেক্রেটারি, জালাল উদ্দিন লাউতা ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং গৌছ উদ্দিন দলটির সমাজসেবা সম্পাদক। নৌকাবাইচ বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মীয় বিরোধের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের ভাষ্য, নদীভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি, যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা থেকেই তারা আয়োজনটি বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নৌকাবাইচ আয়োজন নিয়ে গ্রামে দুটি পক্ষ রয়েছে। বিরোধিতাকারীদের একটি অংশ আয়োজক কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ। মূলত এ কারণেই তারা নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তাদের পক্ষ থেকেই চার মাওলানাকে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সামনে আনা হয়েছে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ তাদের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন নদীভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি, যানজট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাকে নৌকাবাইচ বন্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এদিকে চার মাওলানার কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আগের পোস্ট সরিয়ে নিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রথম প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন। গত ১৮ আগস্ট তিনি ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামের ব্যানারে একটি পোস্টার প্রকাশ করেন। এতে ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’ লেখা ছিল। পরে তিনি জানান, ‘বন্ধের প্রতিবাদে’ কথাটি ভুলবশত লেখা হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে থাকলেও এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো বিষয় নেই বলে জানান। গত ২০ আগস্ট বারইগ্রাম বাজার মসজিদে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভার একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে স্থানীয় আলেম ও মুরব্বিদের বক্তব্যে নদীভাঙন, কৃষিজমি রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়গুলো উঠে আসে। কয়েকজন বক্তা নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসার আশঙ্কার কথাও বলেন।
এ বিষয়ে প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। তার দাবি, অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বড় আয়োজনকে ঘিরে এবারও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে নৌকাবাইচ আয়োজনের পক্ষে থাকা স্থানীয় লোকজন বলেন, নদীর ক্ষতি বা জুয়ার আসর বসার আশঙ্কা থাকলে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রশাসনের। কোনো অনিয়মের আশঙ্কায় ঐতিহ্যবাহী আয়োজন বন্ধ করা উচিত নয়।
১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এ আয়োজন
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, লাউতা ও বাহাদুরপুর গ্রামের যুবকদের উদ্যোগে সোনাই নদীতে ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এবার প্রতিযোগিতাটি তৃগাংগারমুখ এলাকায় হওয়ার কথা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি বড় আকারের গরু এবং দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি ছাগল দেওয়া হবে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার এদিনকে বলেন, ‘বিবাদমান দুই পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়েই নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।’
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল করিম বলেন, ‘বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে বলে জেনেছি। তবে পরের বছর থেকে নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে না, এমন শর্তে এবার সমঝোতায় ২৮ আগস্ট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে, বিষয়টি আমার জানা নেই।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









