মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। লোডশেডিংয়ের বিপর্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদ্যুতের ‘কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস’ অর্থাৎ আইপিএস-জেনারেটরও যেন ক্লান্ত হয়ে ফুরিয়ে আসছে ‘দম’। বিদ্যুৎ এখন কেবল গ্রিড বা সরবরাহের সাধারণ সমস্যা নয়; রূপ নিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলা এক বহুমাত্রিক সংকটে। একদিকে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনাধীন স্থাপিত সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাস সংকট ও কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বাস্তব উৎপাদনে বড় ফারাক তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ফলে হাসপাতাল থেকে হিমাগার, রাইস মিল থেকে ক্ষুদ্র শিল্প— সর্বত্র স্থবিরতা নেমে এসেছে, যার ক্ষতির পরিধি কেবল মেগাওয়াটের হিসাব ছাড়িয়ে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় মানবিক আঘাত আসছে স্বাস্থ্যসেবায়। অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সিসিইউ, নবজাতক ইউনিট, ডায়ালাইসিস ও অক্সিজেন সরবরাহের মতো জীবনরক্ষাকারী সেবাগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বড় হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিংয়ে তা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড গরমে রাতের বেলা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের ঘুম ও বিশ্রাম ব্যাহত হচ্ছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ার ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৮ দিন বয়সী হাফসা জাহানের জন্য নেবুলাইজেশন ছিল চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির শ্বাসকষ্ট বাড়ছিল। কিন্তু হাসপাতালে বিদ্যুৎ না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসার এই সহজ অথচ জরুরি প্রক্রিয়াটিও ব্যাহত হচ্ছিল। ওয়ার্ডের পাখা বন্ধ। গরমে শিশুটির কষ্ট আরো বাড়ছিল। বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন অসহায় মা কামরুন নাহার। এটি শুধু এখানকার খণ্ডচিত্র নয়, সারাদেশে বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণও। উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি শুধু ঘর অন্ধকার করছে না, হাসপাতালের চিকিৎসার সময়সূচিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় দেড় বছরের নিউমোনিয়া আক্রান্ত মোফাসসিরের দিনে ছয়বার নেবুলাইজেশন প্রয়োজন হলেও এক দিনে দেওয়া হয়েছে তিনবার। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চার বছরের মিনু আক্তারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় নেবুলাইজেশন নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আসা খবরগুলো একই ধরনের একটি চিত্র সামনে আনছে—বিদ্যুৎ যখন অনিয়মিত হয়, তখন চিকিৎসার সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও ধাক্কা খায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২ আগস্ট প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের ছয়টি এক্স-রে মেশিন এবং আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালানো যায়নি। টিকিট কাউন্টারসহ বিদ্যুৎনির্ভর অন্যান্য সেবাও ব্যাহত হয়। এটি রাজধানী থেকে দূরের কোনো ছোট হাসপাতালের ঘটনা নয়। কিন্তু দেশের প্রান্তিক হাসপাতালগুলোর বাস্তবতা আরো কঠিন।
অপারেশন থিয়েটারে কয়েক মিনিটের অন্ধকার
অস্ত্রোপচারকক্ষ এমন একটি জায়গা, যেখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কেবল অস্বস্তির বিষয় নয়— এটি চিকিৎসার নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কথা জানা গেছে। জেনারেটর চালু করতে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যেও বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার একটি সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে তালিকাভুক্ত। নীলফামারীতেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা চিকিৎসাসেবার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যুৎ ফিরে আসা পর্যন্ত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
একই কারণে প্রতিদিনের অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও কমে যাওয়ার কথা হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এসেছে। এখানে সংকটটি দ্বিমুখী। বিদ্যুৎ না থাকলে অস্ত্রোপচার করা কঠিন; জেনারেটর চালু করলে আবার জ্বালানি লাগে। আর জ্বালানি সংকট যখন জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেই আঘাত করছে, তখন হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটরের জন্য ডিজেল পাওয়া বা নিয়মিত কেনার সক্ষমতাও একটি আলাদা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একমাত্র জেনারেটরটি প্রায় দুই বছর ধরে একটি জোড়া ব্যাটারির অভাবে অচল। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন, প্যাথলজি ও অন্যান্য জরুরি সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি নয়। হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থায়নের দুর্বলতাও সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি শিশুর নেবুলাইজেশন থেকে একটি অপারেশন—ক্ষতির হিসাব কোথায়?
বিদ্যুৎ সংকটে স্বাস্থ্য খাতে কতজন রোগী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন—এমন কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব এখনো প্রকাশ্যে নেই। ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যায় বলা কঠিন, কতটি অস্ত্রোপচার পিছিয়েছে, কতটি পরীক্ষা পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বা কতজন রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালগুলোর কার্যক্রমের দিকে তাকালে ক্ষতির ধরন বোঝা যায়। প্রথম ক্ষতি চিকিৎসা বিলম্ব। নেবুলাইজেশন, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি বা ল্যাব পরীক্ষা সময়মতো না হলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা দুটোই পিছিয়ে যায়। দ্বিতীয় ক্ষতি জরুরি চিকিৎসার ঝুঁকি। অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসককে একই সঙ্গে রোগীর নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ পুনর্বহালের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হয়। তৃতীয় ক্ষতি সেবার সক্ষমতা কমে যাওয়া।
নীলফামারীর মতো হাসপাতালে যেখানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দিনে পাঁচ-ছয়টির বদলে এক-দুটি অস্ত্রোপচারে নামতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এসেছে, সেখানে হাসপাতালের কার্যকর সক্ষমতা কাগজে থাকা শয্যাসংখ্যার চেয়ে বাস্তবে কমে যায়। চতুর্থ ক্ষতি রোগীর অতিরিক্ত ব্যয়। সরকারি উপজেলা হাসপাতালে পরীক্ষা বা চিকিৎসা বিলম্বিত হলে রোগীকে অনেক সময় জেলা শহর কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। যাতায়াত, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ তখন পরিবারের ওপর পড়ে। সবশেষে রয়েছে এমন একটি ক্ষতি, যার পরিমাপ করা সবচেয়ে কঠিন—আস্থার ক্ষয়। যে মানুষটি নিজের এলাকার সরকারি হাসপাতালকে শেষ আশ্রয় মনে করেন, তিনি যখন দেখেন বিদ্যুৎ নেই, জেনারেটরে তেল নেই, পরীক্ষা হচ্ছে না বা অস্ত্রোপচার মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, তখন হাসপাতালের ওপর তার আস্থা দুর্বল হয়।
বিদ্যুৎ শুধু আলো নয়, চিকিৎসার অবকাঠামো
হাসপাতালে বিদ্যুতের প্রয়োজনকে অনেক সময় আলো, ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপর অনেক গভীরভাবে নির্ভরশীল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিদ্যুৎ হাসপাতালের আলো, যোগাযোগ ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানো, নিরাপদ প্রসব, টিকাদান, রোগ নির্ণয় এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য। প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেই নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়ার সমস্যা তুলনামূলক বেশি। হু, বিশ্বব্যাংক এর যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ এমন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন যেখানে বিদ্যুৎ নেই অথবা সরবরাহ নির্ভরযোগ্য নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ শতাংশের কোনো বিদ্যুৎ সংযোগই নেই—যদিও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ওই আঞ্চলিক গড়ের সঙ্গে সরাসরি সমান করে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, সেটি কি চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য?
জ্বালানি সংকট হাসপাতালের ভেতরেও ঢুকে পড়ছে
বর্তমান সংকটের শিকড় শুধু বিতরণ ব্যবস্থায় নয়। গ্যাসের ঘাটতি, তরল জ্বালানি ও কয়লার সরবরাহ সমস্যা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার আর্থিক চাপ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। এর একটি অদৃশ্য প্রতিফলন হাসপাতালেও দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে ডিজেল দরকার। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যখন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ থাকে, তখন একটি উপজেলা হাসপাতালের জেনারেটরের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করাও প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থা অনেক জায়গায় ‘আছে’—কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সেটি ব্যবহারযোগ্য নয়। নওগাঁর পোরশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনই একটি চিত্র পাওয়া যায়: জেনারেটর থাকলেও তেল নেই, সোলার ব্যবস্থার ব্যাটারি নষ্ট এবং আইপিএসও অকার্যকর। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা আছে। জেনারেটর কেনা মানেই হাসপাতালের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়। জেনারেটরের জ্বালানি, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং প্রশিক্ষিত অপারেটর—সবকিছুর জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংকটটি কেন আরও গভীর
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ভূমিকা মৌলিক। এগুলো জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজের বিকল্প নয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের জন্য এগুলোই প্রথম বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তাই একটি হাসপাতালের সীমানায় আটকে থাকে না। একজন প্রসূতি যদি উপজেলা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করাতে না পারেন, তাকে জেলা শহরে পাঠাতে হতে পারে। একজন শিশুর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তার পরিবারকে বড় হাসপাতালে যেতে হতে পারে। কোনো রোগীর পরীক্ষা স্থানীয় হাসপাতালে না হলে তাকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রে যেতে হতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সংকট চিকিৎসার ভৌগোলিক বৈষম্যও বাড়িয়ে দিতে পারে। যার টাকা আছে, সে অন্য হাসপাতালে যাবে। যার নেই, সে অপেক্ষা করবে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সংকট সবার জন্য একই সমস্যা তৈরি করলেও এর চিকিৎসাগত মূল্য সবার জন্য সমান নয়।
জাতীয় সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে গ্রাম
আগস্টে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ১০ আগস্ট পিক সময়ে লোডশেডিং প্রায় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল বলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় ১৬,২৬২ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১২,৫০৫ মেগাওয়াট—অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ পূরণ করা যায়নি। আরো সাম্প্রতিক হিসাবে, ২৮ আগস্ট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টি কেন্দ্র জ্বালানি ঘাটতি, কারিগরি সমস্যা বা রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে উৎপাদনের বাইরে ছিল। সেদিন দিনের বেলায় লোডশেডিং ৩,৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
এই ঘাটতির বোঝা সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না
শহরের বড় হাসপাতালগুলো সাধারণত একাধিক বিদ্যুৎ সংযোগ, জেনারেটর, আইপিএস কিংবা অন্যান্য ব্যাকআপ ব্যবস্থার কিছুটা সুবিধা পায়। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে একটি জেনারেটর নষ্ট, ব্যাটারি অকেজো বা ডিজেল কেনার টাকা না থাকলেই পুরো হাসপাতালের বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। আগস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রাম ও মফস্বলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রংপুরে দিন-রাত ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর এসেছে; বরগুনায় বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষ বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও পর্যন্ত করেছেন। তাই একজন শহুরে ভোক্তার কাছে দুই ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট যে অসুবিধা, একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হাসপাতালের কাছে একই সময়ের বিভ্রাট তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। কারণ সেখানে সেই দুই ঘণ্টার মধ্যে হয়তো একটি শিশুর নেবুলাইজেশন হওয়ার কথা ছিল, একজন প্রসূতির সিজার হওয়ার কথা ছিল, কোনো রোগীর এক্স-রে করার কথা ছিল কিংবা জরুরি পরীক্ষার ফল দেখে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
উৎপাদন সক্ষমতা ও বাস্তবতার ব্যবধান
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও স্থাপিত সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটেনি, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোও সার্বক্ষণিকভাবে চালানো হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। পিডিবি ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে দৈনিক সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহের গত ১ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বড় ঘাটতি থাকায় বিতরণ পর্যায়ে এই লোডশেডিং করতে হয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও আর্থিক টানাপোড়েন
বিদ্যুতের দাম বাড়লেও কাটছে না সংকট। জুনে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও এর সুফল এখনো সরবরাহে দেখা যাচ্ছে না। বরং জ্বালানিস্বল্পতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পাওনা এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি তেল থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন না বাড়ানোর কারণে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রটির ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও প্রত্যাশিত মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না। ঘাটতি মোকাবিলায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও উচ্চ ব্যয়ের কারণে তা সার্বক্ষণিকভাবে চালানো যায় না।
অর্থনীতি ও উৎপাদন খাতে বড় ধাক্কা
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অর্থাৎ রাইস মিলের ধান ভাঙানো, চাল বাছাই ও প্যাকেটজাতকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারলে সংরক্ষিত আলুর মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া সেচ পাম্প সচল রাখতে কৃষকদের বাড়তি ডিজেল খরচ গুনতে হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও বাদ যাচ্ছে না। যেমন ওয়ার্কশপ, লেদ মেশিন, প্লাস্টিক, প্যাকেজিং, বেকারি ও ছাপাখানার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বারবার মেশিন চালু-বন্ধ করায় উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ডিজিটাল ও খুচরা ব্যবসায় লালবাতি। যেমন ফার্মেসি, রেস্টুরেন্ট, দুগ্ধজাত পণ্যের দোকান ছাড়াও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), POS মেশিন ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাগুলো বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









