গ্রিন সিটি ও ক্লিন সিটি হিসেবে রাজশাহী নগরীর সুখ্যাতি রয়েছে বহুদিনের। পরিচ্ছন্ন, শান্ত ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে দেশের মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি রয়েছে পদ্মাপাড়ের এই নগরীর।
সাম্প্রতিক সময় রাজশাহী ওয়াসার পানির পাইপলাইন স্থাপন এবং নগরজুড়ে একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের কারণে সেই পরিচিত নগরীর জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে ওয়াসার পানির পাইপলাইন স্থাপনের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। কোথাও সড়কের একাংশ বন্ধ, কোথাও পুরো রাস্তা খুঁড়ে পাইপ বসানোর কাজ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যানজট, ধুলাবালি, কাদা ও ভাঙাচোরা সড়কের ভোগান্তি যেন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে এ দুর্ভোগ আরো বেড়েছে কয়েকগুণ। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে অনেক সড়কে জমছে পানি ও কাদা। আবার বৃষ্টি না থাকলে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হতে হচ্ছে পথচারী, ব্যবসায়ী ও যানবাহন চালকদের। রাজশাহী ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নগরবাসীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে পদ্মা নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘ভূ-উপরিস্থিত পানি শোধনাগার প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প নগরবাসীর জন্য সুফল বয়ে আনলেও বর্তমানে পাইপলাইন স্থাপনের কাজকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ভোগান্তি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা কেটে পাইপ বসানোর পর তা দ্রুত সংস্কার না করায় চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। নগরীর একাধিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, উন্নয়ন কাজের প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করেন না। তবে কাজের ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে।
জাওয়াদুল কারিম নামে নগরীর একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি বছরের পর বছর রাস্তা খোঁড়া থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? দোকানে ক্রেতা কমে গেছে। যানজটের কারণে অনেকে এই এলাকায় আসতেই চান না।’ সুমন আলী নামে এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“একদিকে ওয়াসার কাজ, অন্যদিকে ফ্লাইওভারের কাজ। কোথাও রাস্তা বন্ধ, কোথাও ভাঙা। বৃষ্টি হলে কাদা, রোদ হলে ধুলা। প্রতিদিন অফিস বা কর্মস্থলে যেতে অনেক বেশি সময় লাগছে। আমরা নগরবাসী এগুলো থেকে মুক্তি চাই।’
অন্যদিকে রাজশাহী মহানগরীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি কোনো প্রকল্পের কাজ। রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে নগরীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে রায়পাড়া ফ্লাইওভারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা, বন্ধগেট ফ্লাইওভারে ৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বিলশিমলা ফ্লাইওভারে ৮৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। প্রকল্পগুলোর মূল মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হলেও নির্ধারিত সময়ে কোনো ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন হয়নি। এর মধ্যে তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ শেষ করতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন সময় চাওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সরেজমিন দেখা যায়, বিন্দুর মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ এখনও পিলার নির্মাণ পর্যায়ে রয়েছে। কাজের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে আংশিক বন্ধ থাকায় রেলগেট এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে বন্ধগেট ফ্লাইওভারের মূল অবকাঠামোর কাজ শেষের পথে থাকলেও সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণসামগ্রী ও শাটারিংয়ের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে অন্যান্য নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার এলাকাতেও। আলী হোসেন নামে নগরীর একজন অটোরিকশাচালক বলেন,“আগে যে রাস্তা দিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিটে যাওয়া যেত, এখন যানজটে কখনো কখনো এক ঘণ্টাও লেগে যায়। রাস্তা ভাঙা থাকায় গাড়িরও ক্ষতি হচ্ছে। যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়ার বিষয় নিয়েও প্রায়ই ঝামেলা হচ্ছে।’
সায়েদুর রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, “সকালে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় সমস্যা হয়ে গেছে। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে যানজট কম হবে, সেটাই বুঝতে পারি না। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিষয়টিও দেখতে হবে।‘ বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন নগরবাসীরা। তাদের ভাষ্য, খোঁড়া সড়কে বৃষ্টির পানি জমে কাদা তৈরি হয়। অনেক জায়গায় খানাখন্দ পানির নিচে থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন জানান, তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ চলতি বছরের শেষেই শেষ হবে। তবে নানা জটিলতার কারণে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরের ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন চলতি বছরের শেষ নাগাদ দুই থেকে তিনটি ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিল জটিলতার কারণে ঠিকাদাররা কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি। সেই জটিলতা দূর করা হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ দুই থেকে তিনটি ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









