দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট। মাত্রই ২০ দিন আগে গণবিপ্লবে পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। পালিয়ে গেছেন ক্ষমতা হারানো দলের নেতারা। কর্মীরাও দিয়েছেন গা-ঢাকা। দেশজুড়ে জ্বলছে বিক্ষুব্ধ জনতার ক্ষোভের আগুন। সেই আগুন একসময় পৌঁছে যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারস কারখানায়ও। কিছু লোকজন আগুন লাগিয়ে দেয় বিশালাকার কারখানাটিতে।
এই খবর আগুনের গতিতেই হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এ সময় সেখানে ছুটে যায় শত শত মানুষ। কেউ আগুন নেভাতে, কেউ পরিস্থিতি দেখতে, কেউবা আবার ছুটে যায় স্রেফ লুটপাটের আশায়। এ সময় হঠাৎই বাইরে থেকে তালা মেরে বন্ধ করে দেওয়া হয় ভবনের মূল ফটক। যার ফলে ভেতরেই আটকা পড়েন বহু মানুষ। তারা আর ফিরতে পারেননি। নিখোঁজের সংখ্যা পরবর্তী সময়ে করা তালিকা অনুযায়ী কমপক্ষে ১৮৬ জন।
তারা কি মারা গেছেন, নাকি আদৌ বেঁচে আছেন- এ বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য এ পর্যন্ত দিতে পারেননি প্রশাসন থেকে শুরু করে নিখোঁজদের স্বজনরা পর্যন্ত। আরো আশ্চর্যের বিষয় মামলা করা দূরে থাক, এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতেও যেন অনীহা স্বজনদের।
দুই বছর আগে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গাজী টায়ার্স কারখানা। সেই আগুনের পর থেকে নিখোঁজ ১৮৬ জন। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তার চূড়ান্ত উত্তর নেই স্বজনদের কাছে। কেউ অপেক্ষায় স্বামীর, কেউ সন্তানের, কেউ ভাইয়ের। তদন্ত কমিটির সুপারিশ থাকলেও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে উদ্ধার অভিযান এখনো হয়নি। স্বজনদের অপেক্ষার শেষ কোথায়? পোড়া লোহা, ছাই আর ধ্বংসস্তূপ হয়ে দুই বছর ধরে এভাবেই পড়ে আছে গাজী টায়ার্সের ছয়তলা মিক্সিং ভবন। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপ শুধু একটি কারখানার ধ্বংসাবশেষ নয়। ১৮৬টি পরিবারের কাছে এটি প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার শেষ আশ্রয়।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ারস কারখানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর সেনাবাহিনী কারখানাটি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ২৫ আগস্ট রাতে সাবেক এই মন্ত্রীকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গাজী গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রূপগঞ্জে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা আবার গাজী টায়ারস কারখানায় হামলা চালায়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ছয়তলা মিক্সিং ভবনে প্রবেশ করে। এরপর হামলা ও লুটপাটের এক পর্যায়ে সেখানে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এদিকে বাইরে থেকে তালা মেরে আটকে দেওয়া হয় ভবনের ফটক। যে কারণে সেখানে আটকে পড়েন ভেতরে থাকা এবং বাইরে থেকে প্রবেশ করা লোকজন।
আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটকে প্রায় ৩২ ঘণ্টা টানা কাজ করতে হয়েছে। অবশেষে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনটি পুরোপুরি পুড়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর স্বজনরা নিখোঁজদের ছবি হাতে কারখানার সামনে জড়ো হতে থাকে। পরে ফায়ার সার্ভিস এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের দেওয়া তথ্যে নিখোঁজদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে প্রশাসনের তদন্ত কমিটি নিখোঁজ ১৮৬ জনের তালিকা করে। প্রশাসনের তথ্যভাণ্ডারে উঠে আসে তাদের নাম। এরপর থেকেই স্বজনদের হাতে হাতে প্রিয়জনের ছবি আর হাহাকার। কারও অপেক্ষা স্বামীর জন্য, কারও সন্তানের জন্য। তালিকা প্রকাশের পর একে একে নিখোঁজের তালিকা নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটতে থাকেন স্বজনরা।
এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ থেকে বেআইনি জনতা গঠন, অনধিকার প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড এবং কারখানার যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল লুটপাটে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। নিখোঁজ ১৮৬ জনের বিষয়ে তাঁদের স্বজনদের পক্ষ থেকে পৃথক নিখোঁজ বা অপমৃত্যু মামলা করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে স্বজনদের পক্ষ থেকে কেন কোনো মামলা করা হয়নি, সেটি আজও এক রহস্যই হয়ে আছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ ঘটনার পেছনে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
কিন্তু স্বজনদের প্রশ্ন- এই ১৮৬ জনের সবাই কি ঘটনার সময় ভবনের ভেতরে ছিলেন? কেউ আগুনে মারা গেলে তাঁর দেহাবশেষ কোথায়? আর যদি কেউ বেঁচে থাকেন, তাহলে তাঁদের সন্ধান মিলছে না কেন?
কাহিনা এলাকার ফয়সাল ছিলেন পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি। নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী নাছিমা ছিলেন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এখন সেই সন্তানের বয়স দেড় বছর। বাবাকে ছাড়াই বেড়ে উঠছে ফয়সালের পাঁচ বছরের আরেক ছেলে।
একইভাবে মৈকুলির রোকেয়া বেগম হারিয়েছেন দুই ছেলে ও মেয়ের জামাইকে। কাজীপাড়ার তানিয়ার কাঁধেও নিখোঁজ স্বামীর পর পুরো সংসারের বোঝা। জীবিকার তাগিদে এখন তিনি জামদানি শ্রমিক। শুধু প্রিয়জন হারানোর বেদনা নয় আইনি ও আর্থিক জটিলতাও তাড়া করছে এসব পরিবারকে। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকেই সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে পারছেন না। মিলছে না প্রয়োজনীয় মৃত্যুসনদ। থমকে আছে উত্তরাধিকার ও বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়াও।
এক স্বজন বলেন, দিনের পর দিন দৌড়াদৌড়ি করছি। ডেথ সার্টিফিকেট না পাওয়ায় জমিও বিক্রি করতে পারছি না। মিজান নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁর ছেলের বয়স ছিল মাত্র চার মাস। এখন সে হাঁটতে শিখেছে, বাবাকে ডাকতেও শিখেছে কিন্তু বাবা কোথায়, সেই উত্তর নেই পরিবারের কাছে। থানায় কোনো অভিযোগ কেন দেননি- এমন প্রশ্নে নিখোঁজ মিজানের বড়বোন এদিনকে বলেন, ‘আমার ভাই বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল, দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। আজও আমরা জানি না, সে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—ভাই নিখোঁজ, আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় আছি; এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। কেউ বলছে, চুরি করতে গিয়ে আগুনে পুড়েছে, কেউ বলছে লুটতরাজ করতে গিয়েছিল। অথচ আমার ভাইয়ের তো কোনো কিছুর অভাব ছিল না। এসব অপবাদ একজন স্বজন হিসেবে আমাদের জন্য নিখোঁজ হওয়ার কষ্টের চেয়েও বেশি যন্ত্রণার। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ, সবার কাছে গিয়ে নিজেদের কথা বোঝানোর সামর্থ্যও নেই। তাই কারও কাছে বিচার চাইতেও যাই না। শুধু চাই, আমার ভাইয়ের কী হয়েছে—সেই সত্যিটা যেন আমরা জানতে পারি।’
ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের গঠিত আট সদস্যের তদন্ত কমিটি ৩২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয়। সেখানে ঘটনাটিকে অগ্নিসংযোগ হিসেবে উল্লেখ করে পোড়া ভবন অপসারণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু দুই বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি সেই সুপারিশ।
বিভিন্ন সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষের হাড় ও কঙ্কালের অংশ পাওয়ার দাবিও সামনে এসেছে। সেগুলো কার তা নিয়ে এখনো নেই চূড়ান্ত তথ্য। কারা আগুন দিয়েছিল? কিভাবে আগুন ছড়াল? আগুনের সময় ভবনের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের কী পরিণতি হলো? এসব প্রশ্নেরও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার (গ-সার্কেল) মেহেদী ইসলাম দৈনিক এদিনকে বলেন, ১৮৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সিআইডির মাধ্যমে ডিএনএ সংগ্রহ করে ফরেনসিক তৈরি করা হচ্ছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হবে।
দুই বছর ধরে অপেক্ষা কেউ দরজায় কড়া নাড়বে, ফিরে আসবে প্রিয় মানুষটি। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে, সেই আশার সঙ্গে বাড়ছে অনিশ্চয়তাও। স্বজনদের দাবি একটাই- জীবিত থাকলে খুঁজে বের করা হোক। আর মৃত্যু হয়ে থাকলে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেহাবশেষ উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত এবং শেষবারের মতো স্বজনদের কাছে মর্যাদাপূর্ণ বিদায়ের সুযোগ দেওয়া হোক। গাজী টায়ার্সের এই পোড়া ভবন তাই আজ শুধু ধ্বংসস্তূপ নয় এটি ১৮৬টি পরিবারের দুই বছরের কান্না, অপেক্ষা আর উত্তরহীন প্রশ্নের প্রতীক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









