বগুড়ার ধুনট উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউর রহমান জ্যোতিকে চরমপন্থী দলের সদস্য সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
ঘটনার প্রায় ছয় বছর পর নিহতের ছেলে রওশন জামিল রাসেল আদালতে মামলা করার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবর রহমান, তার ছেলে ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুহম্মদ আসিফ ইকবাল সনিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে পুলিশের আট কর্মকর্তাও রয়েছেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নির্দেশে পুলিশ জ্যোতিকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে চরমপন্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে চাকরিতে রয়েছেন বলে পরিবারের দাবি।
সরেজমিন ধুনট উপজেলার প্রতাপ খাদুলি গ্রামে নিহত শফিউর রহমান জ্যোতির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ এপ্রিল সকালে অলোয়া গ্রামের রেজাউল করিম ফোন করে জ্যোতিকে মথুরাপুর বাজারে যেতে বলেন। সে সময় ছেলে রওশন জামিল রাসেলও তার সঙ্গে ছিলেন। জন্মনিবন্ধন সনদ নেওয়ার জন্য তারা মথুরাপুর ইউনিয়ন পরিষদে যান।
রাসেলের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদে যাওয়ার পর তিনি বাবাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন। এরপর বাবাকে দ্রুত সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। জ্যোতি মোটরসাইকেলে করে চলে গেলে শেরপুর থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা বুলবুল এক ব্যক্তির মোটরসাইকেল নিয়ে তার পিছু নেন। পরে কালো রঙের একটি হায়েস গাড়িতে করে আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্য সেখানে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ।
নিহতের ছেলে বলেন, ওই সময় তিনি পুলিশ সদস্যদের কথোপকথনে জানতে পারেন, বগুড়া-৫ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য হাবিবর রহমান এবং তার ছেলে মুহম্মদ আসিফ ইকবাল সনির নির্দেশেই তার বাবাকে ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ, ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ধুনটের মথুরাপুর-চান্দাইকোনা সড়কের রায়ার চারমাথার তালতলা এলাকায় জ্যোতির মোটরসাইকেলের গতিরোধ করা হয়। পরে তাকে কালো রঙের হায়েস গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিবাদ করলে পুলিশ সদস্যরা তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার কথা জানান।
এরপর পরিবারের সদস্যরা শেরপুর ও ধুনট থানায় গিয়ে জ্যোতির খোঁজ করেন। কিন্তু পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলে পরিবারের দাবি। এমনকি জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছেও খোঁজ নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার দুই দিন পর, ৩০ এপ্রিল সকালে গণমাধ্যমে খবর আসে- শেরপুর থানার শালফা-বোয়ালকান্দি ব্রিজের নিচ থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে মরদেহটি জ্যোতির বলে শনাক্ত করেন তার স্বজনরা। নিহতের পরিবারের দাবি, মরদেহে গুলির ও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এ ছাড়া হাত-পায়ের আঙুলের নখ উপড়ে ফেলার মতো গুরুতর নির্যাতনের চিহ্নও তারা দেখতে পান। পরিবারের আরো অভিযোগ, মরদেহ দাফনের পর শেরপুর থানায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরবর্তী কালে যে মামলাটি করা হয়েছে, সেখানে হত্যার স্থান হিসেবে ধুনট থানার মথুরাপুর-চান্দাইকোনা সড়কের চারমাথা এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ মরদেহ উদ্ধার করা হয় শেরপুর থানার শালফা-বোয়ালকান্দি ব্রিজের নিচ থেকে। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নিহতের পরিবার।
ছয় বছর পরের মামলায় পুলিশের আট কর্মকর্তাকে আসামি করার ঘটনায় নতুনভাবে আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরিবারের অভিযোগ, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশের একাংশের যোগসাজশে জ্যোতিকে হত্যা করে চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ বিষয়ে পিবিআইয়ের বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার জাকির হাসান ফোনে জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নিহতের ছেলে রওশন জামিল রাসেল বলেন, তার বাবাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হত্যা করে চরমপন্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর মামলা করার সুযোগ পাওয়ায় তিনি এখন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চান। এখন প্রশ্ন- ২০১৯ সালের সেই দিন জ্যোতিকে কারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, কীভাবে তার মৃত্যু হলো এবং কেন তাকে চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? পিবিআইর তদন্তেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









