ডেঙ্গুতে দৈনিক আক্রান্ত ও প্রাণহানির রেকর্ড দেখলো সারাদেশ। সর্বশেষ একদিনে মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে নয়জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এক হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চসংখ্যক। এর আগে, ১ সেপ্টেম্বর ও ২৩ আগস্ট ডেঙ্গুতে পাঁচজন করে মারা যান। আর, রবিবার সর্বোচ্চ এক হাজার ৫৫৮ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত রোগটিতে আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে এবং এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৩০ জন। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম আটদিনেই ৩৩ জনের মৃত্যু ও নয় হাজার ৬২৯ জন আক্রান্ত হওয়ায় আতঙ্কও বাড়ছে।
এর আগে গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের, আক্রান্ত হন দুই হাজার ৯০৭ জন আর নয় হাজার ২০৬ জন আক্রান্ত ও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল জুলাইয়ে। অন্যদিকে, আগস্ট মাসের শেষদিন পর্যন্ত ২০ হাজার ৫৩৬ জন আক্রান্ত ও ৪৩ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ, মাসওয়ারি আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা ও প্রাণহানিও ঘটেছে বিদায়ী মাসে।
অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরো দুজন শিশু। নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৩৬ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১৭৮ দিনে হাম ও ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৯ জনে, যা অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ১০০ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৮৯৯ জন।
সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা এক হাজারের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এদিকে প্রায় ছয় মাসে দেশে রোগটিতে শনাক্তসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৬ হাজার ২৯৬ জনে। ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ জন, ২২ জুলাই ৮০০ জন ও ১৫ আগস্ট ৯০০ জন ছাড়ায়।
আর আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায় ৬ আগস্ট, এর মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে এক লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে ৩ সেপ্টেম্বর। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে বা যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করা হয় না। ফলে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দিয়ে হামের বিস্তারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত মারা যাওয়া নয়জনের মধ্যে চারজন নারী ও অন্য পাঁচজন পুরুষ, যাদের তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকা ও খুলনা বিভাগে দুজন করে এবং বরিশাল ও ময়মনসিংংহ বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
অন্যদিকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক হাজার ৫৭১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৮৫১ জন পুরুষ ও ৪৬৩ জন নারী। তাদের মধ্যে ডিএসসিসি এলাকার ১৩৪ জন ও ডিএনসিসি এলাকার ১৯৬ জন ছাড়াও সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগের ৪০৮ জন রয়েছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ২৪২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৭৭ জন, বরিশাল বিভাগে ১৪২ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৭ জন, রংপুর বিভাগে ৭১ জন ও সিলেট বিভাগে আটজন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গুতে এ বছর বিভাগের হিসাবে সর্বোচ্চ রোগী হয়েছেন খুলনা বিভাগে সাত হাজার ২৯৮ জন। আর মারা যাওয়া ১৩০ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে ডিএসসিসি এলাকায়। এরপর খুলনা বিভাগে ২৩ জন, ডিএনসিসি এলাকায় ১৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩ জন, বরিশাল বিভাগে ১১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে আটজন, রাজশাহী বিভাগে চারজন, সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে চারজন এবং সিলেট ও রংপুর বিভাগে একজন করে মারা গেছেন রোগটিতে।
সারা দেশে এ পর্যন্ত মৃতদের ৫৮ জন পুরুষ ও ৭২ জন নারী। অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৪১৮ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪২ হাজার ১২৭ জন ৪০ হাজার ৭০৯ জন। ১৩০ জনের মৃত্যুর পর এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন হাজার ২১৮ জন। সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।
হাম ও উপসর্গের সংক্রমণ বাড়ছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত সোমবার সকাল আটটা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত দুজন শিশুর একজন ঢাকা বিভাগ ও অন্যজন খুলনা বিভাগের হাসপাতালে মারা গেছে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো এক হাজার ১৫৭ জন শিশু, যাদের এক হাজার ৮৯ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৩৬৬ জন, রাজশাহীতে ২৭ জন, সিলেটে ১৪০ জন, চট্টগ্রামে ২৫৬ জন, বরিশালে ১২৫ জন, ময়মনসিংহে ৭৫ জন, খুলনায় ৮০ জন এবং রংপুরে ২০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৭৯ জন শিশুর শরীরে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৬ হাজার ৪৬১ জনে আর ১৯ হাজার ৮৩৫ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এক হাজার ১৯ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে।
সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৯ জন, যাদের এক লাখ ৪০ হাজার ৮৫০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৮৩ হাজার ৭৩৭ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৫ জন, বরিশাল বিভাগে ৭৬ জন, খুলনা বিভাগে ৩৭ জন ও রংপুর বিভাগে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। গত বছর মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০ জন, ২০৩ জন, ৩১১ জন, ২৮১ জন ও ২৪৭ জন। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিলই না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









