হীরা আজ বিলাসিতার সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। কিন্তু একসময় গল্পটা ছিল অন্য রকম। হীরার চেয়েও দুর্লভ ও কাঙ্ক্ষিত ছিল মুক্তো।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৩০০ বছর আগেই চীনের রাজপরিবারে মুক্তোর কদর ছিল। প্রাচীন রোমে মুক্তো এতটাই সম্পদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল যে কে তা পরতে পারবেন, তা নিয়ন্ত্রণ করতে আইনও করা হয়েছিল। ভারতের মুঘল দরবারে পোশাক ও মাথার অলংকারেও মুক্তোর ব্যবহার ছিল ব্যাপক।
বিশ শতকে মুক্তো পেল নতুন ফ্যাশন-পরিচয়। কোকো শ্যানেলের বহুস্তর মুক্তোর মালা যেমন জনপ্রিয় হয়, তেমনি ১৯৬১ সালের ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিজ’ ছবিতে অড্রে হেপবার্নের গলায় মুক্তোর মালা হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় ফ্যাশন-চিত্র।
আজ মুক্তো শুধু ঐতিহ্যের গয়না নয়। প্রশ্ন হলো—‘কোন মুক্তো আপনার জন্য?’

মুক্তো কীভাবে তৈরি হয়?
হীরা বা চুনি মাটির নিচে তৈরি হলেও মুক্তো একটি ‘জৈব রত্ন’। ঝিনুক বা অন্যান্য মলাস্কের শরীরে কোনো উদ্দীপক প্রবেশ করলে সেটিকে ঘিরে স্তরের পর স্তর ‘ন্যাকার’ জমতে থাকে। এই ন্যাকারই মুক্তোকে দেয় তার পরিচিত দীপ্তি। মুক্তো দুই ধরনের—‘প্রাকৃতিক ও কালচার্ড’। প্রাকৃতিক মুক্তো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তৈরি হয় এবং অত্যন্ত বিরল। কালচার্ড মুক্তো নিয়ন্ত্রিতভাবে মলাস্কের শরীরে মুক্তো তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বাজারের প্রায় সব মুক্তোই কালচার্ড।
চার ধরনের মুক্তো
ফ্রেশওয়াটার
মিঠাপানির মুক্তো তুলনামূলক বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হয়, তাই সাধারণত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী। গোল, ডিম্বাকার, চ্যাপ্টা কিংবা অনিয়মিত—বিভিন্ন আকৃতিতে পাওয়া যায়। প্রথমবার মুক্তোর গয়না কিনলে এটি ভালো শুরু হতে পারে। আধুনিক, স্বাভাবিক সাজের সঙ্গেও মানায়।
আকোয়া
জাপানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘আকোয়া মুক্তো’। এর উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ দীপ্তি এবং সাধারণত গোলাকার আকৃতি একে ক্লাসিক মুক্তোর প্রতীক করে তুলেছে। পরিপাটি সাদা মুক্তোর মালা বা কানের দুলের কথা ভাবলে আকোয়ার কথাই আগে আসে। আনুষ্ঠানিক পোশাকের সঙ্গে দারুণ মানায়।
তাহিতিয়ান
‘ব্ল্যাক পার্ল’ বলা হলেও তাহিতিয়ান মুক্তো শুধু কালো নয়। ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার এই মুক্তোর গাঢ় রঙে আলো বদলালে সবুজ, নীল, ধূসর বা বেগুনির আভা দেখা যেতে পারে। সাদা মুক্তোর তুলনায় এর চেহারা বেশি নাটকীয় ও রহস্যময়।
সাউথ সি
অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কিছু এলাকায় উৎপাদিত ‘সাউথ সি মুক্তো’ সাধারণত বড় আকারের। দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি হওয়া, আকার, দীপ্তি ও বিরলতার কারণে এগুলো সবচেয়ে মূল্যবান কালচার্ড মুক্তোর মধ্যে পড়ে। বিশেষ অনুষ্ঠানের গয়নায় এর উপস্থিতি বেশ আকর্ষণীয়।

কিনবেন? চোখ রাখুন পাঁচ জায়গায়
মুক্তো কিনতে শুধু বড় আকার বা ঝকঝকে চেহারা দেখলেই হবে না।
দীপ্তি
ভালো মুক্তোর আলো পরিষ্কার ও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। সম্ভব হলে বিভিন্ন আলোয় দেখুন।
পৃষ্ঠ
ছোটখাটো প্রাকৃতিক দাগ থাকতে পারে। তবে বড় গর্ত, ফাটল বা গভীর ক্ষত থাকলে সতর্ক হোন।
আকার
বড় মুক্তো আকর্ষণীয় হলেও বড় হলেই সেরা নয়। উজ্জ্বল ও সুন্দর ছোট মুক্তোও বেশি মূল্যবান হতে পারে।
মিল
মালা বা ব্রেসলেটে মুক্তোগুলোর আকার, রং ও দীপ্তির সামঞ্জস্য দেখুন। ভালোভাবে ম্যাচ করা মুক্তোর দাম সাধারণত বেশি হয়।
পরিচয় ও কাগজপত্র
মুক্তোটি প্রাকৃতিক না কালচার্ড, রং প্রাকৃতিক না ট্রিটমেন্ট করা—জেনে নিন। দামি গয়না হলে বিল ও প্রাসঙ্গিক তথ্য লিখিতভাবে রাখুন। বেশি দামের ক্ষেত্রে স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির সার্টিফিকেট নেওয়া যেতে পারে।
আর একটি পুরোনো কৌশল—দাঁতে ঘষে মুক্তো পরীক্ষা—করবেন না। এতে মুক্তোর পৃষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাও নয়।
যত্নেও একটু মনোযোগ
মুক্তো তুলনামূলক নরম ও সংবেদনশীল। তাই পারফিউম, হেয়ারস্প্রে ও প্রসাধনীর সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। সাজগোজের শেষে মুক্তো পরুন। ব্যবহারের পর নরম কাপড় দিয়ে মুছে আলাদা করে রাখুন। পানিতে দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখা বা শক্তভাবে ঘষে পরিষ্কার করাও ঠিক নয়।

মুক্তো কি শুধু একসারির মালা?
একসময় মুক্তো মানেই ছিল সমান আকারের মালা, আনুষ্ঠানিক পোশাক আর পরিমিত সাজ। এখন সেই নিয়ম অনেকটাই বদলে গেছে। মুক্তোর সঙ্গে মোটা সোনার চেইন পরা যায়, টেইলার্ড স্যুটের সঙ্গে মানিয়ে যায় মুক্তোর দুল। এমনকি অনিয়মিত আকৃতির একটি ‘বারোক মুক্তোর পেনড্যান্ট’ই হয়ে উঠতে পারে পুরো সাজের কেন্দ্রবিন্দু।
তাই—
ক্লাসিক সাজ: আকোয়া। আধুনিক ও স্বাভাবিক: ফ্রেশওয়াটার। গাঢ় ও নাটকীয়: তাহিতিয়ান। বিশেষ অনুষ্ঠানে আভিজাত্য: সাউথ সি।
দামই মুক্তোর সৌন্দর্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। আপনার পোশাক, ব্যক্তিত্ব ও ব্যবহারের সঙ্গে যে মুক্তোটি সবচেয়ে ভালো মানায়, সেটিই আপনার জন্য সেরা। মুক্তো বদলায়নি। বদলেছে তাকে দেখার চোখ। একসময় তা ছিল রাজদরবারের সম্পদ, এখন জিনস-টি-শার্টের সঙ্গেও অনায়াসে চলে আসে। সেই পুরোনো রত্নের নতুন গল্পটি তাই শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









