‘সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে? কাজে মন বসছে না? রাতে ঘুমও কেমন যেন এলোমেলো?’ কারণটা হয়তো শুধু ব্যস্ত জীবন বা মানসিক চাপ নয়। শরীরে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও এমন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তেমনই একটি উপাদান ভিটামিন বি৬।
নামটি খুব পরিচিত নয়। ভিটামিন ডি, সি কিংবা বি১২ নিয়ে যত কথা হয়, বি৬ নিয়ে ততটা নয়। অথচ শরীরের শতাধিক এনজাইম-নির্ভর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এর প্রয়োজন হয়। খাবার থেকে পাওয়া প্রোটিন, শর্করা ও চর্বি শরীর কীভাবে ব্যবহার করবে, স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে কাজ করবে, এমনকি রক্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরিতেও ভিটামিন বি৬ ভূমিকা রাখে।
তবে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা বা মন খারাপ হলেই ভিটামিন বি৬-এর ঘাটতি আছে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এসব সমস্যার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে।

মস্তিষ্কের ভেতরের ছোট্ট সহকারী
আমাদের মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদান হয়। এসব সংকেতের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে নিউরোট্রান্সমিটার—যেমন সেরোটোনিন, ডোপামিন, নরঅ্যাড্রেনালিন ও জিএবিএ।
এই রাসায়নিক বার্তাবাহকগুলোর কয়েকটি তৈরিতে ভিটামিন বি৬ প্রয়োজন। সেরোটোনিন ও ডোপামিন মেজাজ, মনোযোগ ও প্রেরণার সঙ্গে যুক্ত। জিএবিএ স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে এবং ঘুমের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
তাই শরীরে ভিটামিন বি৬-এর ঘাটতি হলে স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন কিংবা স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
‘তবে ঘুম না হলেই ভিটামিন বি৬ খাবেন—বিষয়টি এত সরল নয়।’ দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে এর কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
ওজন কমাবে?
ভিটামিন বি৬ শরীরের বিপাকক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রোটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিডের হজমে ভূমিক রাখে। শর্করা ও চর্বির হজমের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও এটি যুক্ত।
কিন্তু এখানেই একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা আবশ্যক। ‘ভিটামিন বি৬ কোনো ওজন কমানোর ওষুধ নয়।’ শুধু বি৬ সাপ্লিমেন্ট খেলেই ওজন কমবে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। স্বাস্থ্যকর ওজনের জন্য সুষম খাবার, পরিমিত ক্যালরি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ত তৈরিতেও ভূমিকা
শরীরের রক্তে যে হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন বহন করে, সেটি তৈরির প্রক্রিয়াতেও ভিটামিন বি৬ প্রয়োজন। এ ছাড়া হোমোসিস্টেইন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের হজমেও বি৬ অংশ নেয়। রক্তে হোমোসিস্টেইনের মাত্রা বেশি থাকার সঙ্গে হৃদরোগ ও রক্তনালির কিছু সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে শুধু ভিটামিন বি৬ খেলেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যাবে। হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন, রক্তচাপ, ধূমপানসহ অনেক বিষয় প্রভাব ফেলে।
মাসিকের আগে অস্বস্তি হলে?
অনেক নারীর মাসিকের আগে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মন খারাপ, উদ্বেগ বা অস্বস্তির মতো সমস্যা হয়। একে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ভিটামিন বি৬ গ্রহণ পিএমএস-এর কয়েকটি উপসর্গ কমাতে সহায়তা করে। তবে সব উপসর্গের ক্ষেত্রে এর উপকার সমানভাবে প্রমাণিত নয়। তাই মাসিকের আগে নিয়মিত তীব্র শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হলে নিজে থেকে বেশি মাত্রায় ভিটামিন বি৬ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

খাবারের প্লেটেই আছে বি৬
ভিটামিন বি৬ পাওয়ার জন্য প্রতিদিন আলাদা করে কোনো বিদেশি খাবার খুঁজতে হবে না। আমাদের রান্নাঘরের পরিচিত অনেক খাবারেই এটি আছে।
মাছ
রুই, কাতলা, ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ ভিটামিন বি৬-এর উৎস হতে পারে। তবে মাছের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী পুষ্টির মাত্রা ভিন্ন হয়।
মাংস
মুরগি ও অন্যান্য মাংসে ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়। রান্নার সময় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
ডিম
সহজলভ্য এবং নানা পুষ্টির উৎস হিসেবে ডিম খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।
আলু ও মিষ্টি আলু
আলু ও মিষ্টি আলুতেও ভিটামিন বি৬ থাকে। সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা ভালো বিকল্প।
ডাল ও ছোলা
মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার আমাদের প্রতিদিনের খাবারের অংশ। এগুলো উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও খাদ্যতন্তুরও ভালো উৎস।
কলা
সহজে পাওয়া যায়, সঙ্গে করে নেওয়াও সহজ। একটি মাঝারি কলা প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
পূর্ণ শস্য
ওটস ও অন্যান্য পূর্ণ শস্যে ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়। আমাদের ক্ষেত্রে লাল বা বাদামি চাল এবং আটার খাবারও খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে পারে।
বাদাম ও বীজ
বিভিন্ন বাদাম ও বীজেও ভিটামিন বি৬ থাকে। তবে এগুলো তুলনামূলক বেশি ক্যালরিযুক্ত, তাই পরিমাণে সংযম জরুরি।
বাংলাদেশের খাবারে কীভাবে রাখবেন?
একটি স্বাস্থ্যকর দুপুরের খাবার খুব জটিল হওয়ার দরকার নেই।
‘এক প্লেট ভাত + ডাল + মাছ বা ডিম + দুই ধরনের সবজি’—এটাই হতে পারে দারুণ একটি সমন্বয়।
সকালে রুটি বা ওটসের সঙ্গে ডিম ও কলা রাখা যায়। বিকেলে অল্প বাদাম। রাতে ভাত বা রুটির সঙ্গে ডাল, সবজি ও মাছ বা মুরগি। অর্থাৎ ভিটামিন বি৬ পাওয়ার জন্য খাদ্যতালিকা আমূল বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং ‘একই ধরনের খাবার প্রতিদিন না খেয়ে বৈচিত্র্য আনা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাপ্লিমেন্টে সাবধান
ভিটামিন বি৬ পানিতে দ্রবণীয়। তাই অনেকের ধারণা, বেশি খেলেও শরীরে জমবে না এবং ক্ষতি হবে না। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন বি৬ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অবশভাব বা অনুভূতি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ‘ভিটামিন তো, বেশি খেলেও ক্ষতি নেই’—এই ধারণা ভুল।’
খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়াই সাধারণত সবচেয়ে ভালো উপায়। সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নেওয়া উচিত।
এক নজরে
‘ভিটামিন বি৬ কী করে?’
* স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজে সাহায্য করে
* নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে ভূমিকা রাখে
* প্রোটিন ও অ্যামিনো অ্যাসিডের বিপাকে অংশ নেয়
* হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে
* হোমোসিস্টেইনের হজমে ভূমিকা রাখে

‘কোথায় পাবেন?’
মাছ, মাংস, ডিম, আলু, মিষ্টি আলু, ডাল, ছোলা, পূর্ণ শস্য, কলা, বাদাম ও বীজে।
ভিটামিন বি৬-এর প্রয়োজন খুব সামান্য। কিন্তু শরীরে এর কাজ একেবারেই সামান্য নয়। মস্তিষ্ক থেকে রক্ত, বিপাকক্রিয়া থেকে স্নায়ুতন্ত্র—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় এটি নীরবে কাজ করে যায়।
তাই আলাদা করে ভিটামিন বি৬ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ারও দরকার নেই, আবার অবহেলা করারও নয়। প্রতিদিনের খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন। ভাতের সঙ্গে ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, মৌসুমি ফল—আমাদের পরিচিত এই খাবারগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে শরীরের প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি।
আর কোনো উপসর্গকে শুধু ভিটামিনের ঘাটতি ভেবে নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ‘সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ সূত্র এখনো সেই পুরোনোটাই—বৈচিত্র্যময় খাবার, পরিমিত জীবন আর নিয়মিত যত্ন।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









