নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথাকথিত ও কাল্পনিক 'ঢাকা লকডাউন' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চরম বিপাকে পড়েছেন আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা। বাস্তবসম্মত নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই কাল্পনিক কর্মসূচির ডাক সাধারণ কর্মীদের জীবন ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা কেন্দ্রীয় কোনো নেতার সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই সাইবার দুনিয়ায় হঠাৎ করে ঘোষিত এই লকডাউন কর্মসূচি নিয়ে শুরুতেই তৈরি হয়েছিল ধোঁয়াশা। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় তৃণমূলের কর্মীরা বুঝতে পারছিল না কোনটি সঠিক আর কোনটি গুজব। ফলে সাইবার প্ররোচনায় পড়ে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়েন।
ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রচার হওয়া এই কাল্পনিক লকডাউনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করা হলেও রাজপথে এর কোনো বাস্তব প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। দিনভর ঢাকার সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং যানবাহনে ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি। কোথাও দেখা মেলেনি নিষিদ্ধ সংগঠনের উপস্থিতি। যদিও গতকাল দু-এক জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ এবং আগের দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে চোরাগোপ্তা স্টাইলে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা। তবে গুজবের কারণে সাধারণ যাত্রীরা গতকাল কিছুটা উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হঠকারী ও কাল্পনিক কর্মসূচি মাঠের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের তো নয়ই, বরং অবশিষ্ট কর্মী-সমর্থকদের আইনি জটিলতা ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যুবলীগের এই কাল্পনিক কর্মসূচি প্রতিহত করতে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে গতকাল রবিরার সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দারা কড়া অবস্থানে ছিল। বিভিন্ন মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। অন্যদিকে, সাধারণ জনগণও এ ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী ও অরাজকতামূলক ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের সমর্থকরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের মুখেও পড়ছেন।
বাস্তব মাঠের রাজনীতির সাথে যার কোনো মিল নেই, এমন সব ভার্চুয়াল ও কাল্পনিক কর্মসূচির ডাক দেওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন দলটির মাঠপর্যায়ের কর্মী ও সমর্থকরা। মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান কোনো নেতৃত্ব বা উপস্থিতি না থাকলেও অনলাইনে কিছু নেতার নির্দেশনার কারণে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা এক ধরনের আইনি ঝুঁকিতে পড়েছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে ছিল। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো হয়। ফলে কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে যেসব বিচ্ছিন্ন বা ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করা হয়, তাতে অংশ নেওয়া কর্মীরা সহজেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন। গত কয়েক দিনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ, ঝটিকা মিছিল ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুবলীগের লকডাউন কর্মসূচির মধ্যে রাজধানীতে হাইকোর্ট ও শিল্পকলার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার পর রাজধানীর শাহবাগে তিন নেতার মাজারের পাশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তার আগে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি নির্জন অংশে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এছাড়া সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটের দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এতে ইবাদুর রহমান নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। এছাড়া শনিবার সন্ধ্যা ও রাতে রাজধানীর মিরপুর, মধ্যবাড্ডা এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে তিনটি বাস ও একটি পিকআপে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সন্ধ্যায় মিরপুরে দুটি বাসে এবং মধ্যবাড্ডায় একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে সড়কের ওপর জব্দ করে রাখা একটি পিকআপে কে বা কারা আগুন দেয়। সেই সঙ্গে গত শুক্রবার দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর অন্তত ৯টি এলাকায় ১৩টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, বাবুবাজার, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা ও নিউমার্কেট এলাকার বিস্ফোরণ রয়েছে। এ ছাড়া কাফরুল থানার সামনে একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন। তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামিরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। বংশাল থানা আওয়ামী লীগের এক ওয়ার্ডের দফতর সম্পাদক রায়হান উদ্দীনের কক্ষ থেকে চারটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের যোগাযোগ আছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ইন্ধন ও পরামর্শই জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে এমন কাজ করা হচ্ছে। পুলিশ তৎপর আছে। এ ধরনের নাশকতা প্রতিরোধ করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কাল্পনিক লকডাউন বা শাটডাউনের ঘোষণা মূলত জনবিচ্ছিন্ন একটি রাজনৈতিক কৌশল। বাস্তবে এগুলোর কোনো কার্যকারিতা না থাকায় এবং কেন্দ্রীয় কোনো নেতার সরাসরি উপস্থিতি বা সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় মাঠের কর্মীরা মারাত্মক বিভ্রান্তির শিকার হন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, অনেক কর্মী না বুঝে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবে কান দিয়ে বা ঘর থেকে বের হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে পড়ছেন। কেউ কেউ গ্রেফতার কিংবা জনরোষে পড়েছেন। কোথাও কোথাও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের পিটুনির শিকারও হয়েছেন তারা। বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এসব কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষের মাঝেও তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাধারণ জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ ধরনের কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে কর্মী-সমর্থকরা জনরোষের মুখে পড়ার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন। অনেক সমর্থক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের অদৃশ্য ইশারায় কাল্পনিক কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে তারা এখন পুলিশি হয়রানি এবং গ্রেফতার আতংকে আছেন।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুবলীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজপথে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন বিএনপি ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে শোনা যায়‘হৈ হৈ রৈ রৈ, আওয়ামী লীগ গেলি কই’, ‘ছাত্রলীগ গেলি কই’, ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না— এ ধরনের স্লোগান। লকডাউন কর্মসূচির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল। শনিবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়িতে আগুন দেওয়াসহ অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল বিক্ষোভ মিছিল করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও লকডাউন কর্মসূচির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের একাংশ। শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ থেকে মিছিলটি বের হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটক, জজকোর্ট ও ভিক্টোরিয়া পার্ক হয়ে আবার প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন। রাজধানীর মহাখালী এলাকাতেও বিএনপির তিন অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীরা যৌথভাবে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ও এপিবিএনের সদস্যদেরও মাঠে রাখা হয়। এদিকে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, ১৬ সেপ্টেম্বর যুবলীগের পক্ষ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় দিনব্যাপী ‘লকডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের তা সফল করার আহ্বান জানানো হয়। দলীয় প্রচার এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, মামলা এবং আদালতের বিভিন্ন রায়ের প্রতিবাদে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এর আগে ১৬ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণাও দিয়েছিল যুবলীগ। ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে দলীয় প্রচারে।
অপরদিকে যুবলীগের ডাকা ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নাশকতার আশঙ্কায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর অভিযান চলেছে গত কয়েক দিন। এ পর্যন্ত এই লকডাউন কর্মসূচি ও এর আগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় ২০০ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীকে আটক বা গ্রেপ্তার করার তথ্য নিশ্চিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









