জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়ে। দৈনন্দিন জীবন আরো খরুচে হয়ে যায়। মূল্যস্ফীতি আরো বৃদ্ধি পায়। এটিই জনজীবনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব। গত রবিবার রাতে আবারও ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হলো। অথচ একই দিনে বিশ্ববাজারে দুই দফায় কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের জেরবার অবস্থা। তার ওপর জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়টিকে ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’ বলছেন খেটে খাওয়া মানুষ।
দেশে অকটেন ও পেট্রলের দাম প্রথমবারের মতো ১৫০ টাকা ছাড়াল। অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিনের হঠাৎ এত মূল্যবৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ। মূলত জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি ধাপেই খরচ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। এতে যাতায়াত খরচ বাড়বে।
অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতির চাপ আগের চেয়ে বাড়বে, এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মানুষের আয় না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি অনুভব করেন তাঁরা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের বেশি কষ্ট হবে। আবার মানুষের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা বেড়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে তাঁরা নতুন বেতন পেতে শুরু করবেন। তখন বাজারে আরেক দফা প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কমালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে পারে। তখন আবার বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে তা সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিত, প্রভাব ও করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, তাই দেশে দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। ইরান যুদ্ধের আগে যে দাম ছিল, এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম তার চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। দাম কম রাখলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হবে। সরকারের আর্থিক সংগতি সেই অবস্থায় নেই। তবে মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের যে নীতি আছে, তা মানা হয়নি। হঠাৎ করে মাসের ২০ তারিখের পর দাম বাড়ানো হয়েছে।
জাহিদ হোসেনের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। তবে এই অজুহাতে যেন অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি না হয়। এখন মুদ্রানীতিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার মনোভাবের মধ্যে আছে সরকার। মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে অন্যান্য দেশের মতো কঠোর অবস্থানে যাওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। জাহিদ হোসেনের মতে, গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ যেন বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পারে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি এই মুহূর্তে সরকারের নেই। তাই বিদ্যমান কর্মসূচির সুবিধা যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এসব বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এ ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কারণ জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রায় সব বিষয়ই আন্তঃসম্পর্কিত। নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসাবাড়িসহ সব জায়গায়ই খরচ বাড়বে। এসব খরচ বাড়লে শেষ পর্যন্ত বাড়তি টাকা ভোক্তার পকেট থেকেই যাবে। এতে মানুষের খরচের পাল্লা ভারী হবে।
একইসঙ্গে অন্যান্য পণ্য ও সেবার সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও আরেক দফা বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এর আগে ব্যবসায়ীরা ইরান-সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ার কারণ দেখিয়েও তারা বিভিন্ন সময়ে দাম বাড়িয়েছেন। এবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তারা আরেক দফা দাম বাড়াবেন। এরই মধ্যে চিনি, সয়াবিন তেল, ময়দা, আটা, গরুর দুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন এসব পণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘কালকে (রোববার) ৫০০ টাকা দিয়ে ঢাকায় আসছিলাম। আর এক দিন পর এখন ১০০ টাকা বেশি ভাড়া নিল। ৬০০ টাকায় টিকিট কাটতে হলো। কদিন আগেও একবার ভাড়া বাড়ছিল। এখন আবার বাড়ায় দিল।’কথাগুলো বলছিলেন মো. রমজান। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। ঈগল পরিবহনের একটি বাসে টিকিট কেটেছেন তিনি। ঢাকা থেকে যাবেন মাগুরায়। বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে এই যাত্রী ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘গাড়ির লোকেরা এর চেয়ে কম ভাড়া নেবে না। সরকার তেলের দাম বাড়াইছে। তাই তারাও ভাড়া বাড়াইছে। চাপটা বাড়ল আমাদের।
গতকাল গাবতলী বাস টার্মিনালের কাউন্টারগুলো ঘুরে দেখা যায়, টার্মিনাল ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এসি, নন–এসি প্রায় সব বাসেই বাড়তি টাকায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে। অরিন পরিবহনের একটি বাসে টিকিট কেটেছেন মো. রিয়াদুর রহমান। যাবেন রংপুরে। জানতে চাইলে বলেন, ঢাকায় থাকেন। ব্যবসার কাজে প্রায়ই রংপুরে যাতায়াত করতে হয়। কয়েক দিন আগেও ৮০০ টাকায় টিকিট কেটে যাতায়াত করেছেন। আজকে ৯০০ টাকায় টিকিট কিনতে হয়েছে। রিয়াদুর রহমান বলেন, ‘অনেক বাসে আরো বেশি ভাড়া চায়। দামাদামি করে অরিনে টিকিট কেটেছি।’
বাড়তি ভাড়া আদায় করলেও বিভিন্ন বাস কোম্পানির কর্মচারীরা সেটা স্বীকার করতে চাইছেন না। পূর্বাশা পরিবহনের একটি বাসের সহকারী মো. ইলিয়াস বলেন, ‘তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর বাড়তি ভাড়া এখনো নেওয়া হচ্ছে না। সরকার নতুন চার্ট (তালিকা) দিলেই আমরা বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করব। সূর্যমুখী পরিবহনের সহকারী ব্যবস্থাপক ওয়াদুদ হোসেন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে কয়েকটি রুটের বাসের টিকিট বিক্রি করছিলেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, ফরিদপুর, বরিশাল, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ীসহ সব রুটে ৫০ টাকা করে বেশি ভাড়া রাখা হচ্ছে। ওয়াদুদ বলেন, আমাদের কিছু করার নেই। প্রতি ট্রিপে ৪ হাজার টাকার বেশি খরচ বেড়েছে । এ টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব? সরকার নতুন তালিকা দিলে সেই অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হবে বলেও জানান ওয়াদুদ।
গত রবিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ২০ টাকা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল রাতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা ও কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হবে। মধ্যরাত থেকেই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন পরিবহন যাত্রীদের কাছে বেশি টাকায় টিকিট বিক্রি করছে। দূরপাল্লার পাশাপাশি রাজধানীর ভেতরেও বিভিন্ন রুটের বেশ কিছু গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
বাস শ্রমিকেরা বলছেন, যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না। গতকাল সকালে সাভার পরিবহনের একটি বাসের সহকারী মো. হালিম বলেন, তেলের দাম বাড়াইছে। কিন্তু আমরা এখনো বাড়তি ভাড়া নিতে পারছি না। ভাড়ার উদাহরণ টেনে হালিম বলেন, ‘গাবতলী থেকে গুলিস্তানের ভাড়া ৩৫ টাকা। কিন্তু যাত্রীরা বেশি ভাড়া দিতে চাইছে না। সবাই নতুন চার্ট (ভাড়ার তালিকা) চায়। কিন্তু আমাদের তো এভাবে পোষাচ্ছে না।’বাড়তি ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জি আর শহীদ বলেন, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। বিআরটিএ কিংবা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে ভাড়ার নতুন তালিকা ঠিক করা হবে। কিছু কিছু পরিবহন এরই মধ্যে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে—এমন প্রশ্নে জি আর শহীদ বলেন, এমন অবস্থা দুই-তিন দিন থাকতে পারে। কারণ, আমরা হঠাৎ করেই তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার খবর জেনেছি। এখন পাম্পগুলো বাড়তি দামে তেল দিচ্ছে। তাই বেশি ভাড়া না নিলে বাসমালিকদের লোকসান গুনতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিগগিরই ভাড়ার নতুন তালিকা ঠিক করে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
বেনাপোলে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে। এখান থেকে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন। বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন শত শত আমদানি-রপ্তানি ট্রাক চলাচল করে। প্রতিদিন অন্তত পাঁচ শতাধিক ট্রাক বন্দর থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে যায়। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। গতকাল সকাল থেকেই ভাড়া নিয়ে ট্রাকচালকদের সঙ্গে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের বাকবিতণ্ডা চলেছে। বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর হল বেনাপোল। প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং এক থেকে দেড়শ ট্রাক পণ্য রফতানি হয়ে থাকে। তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য আমরা দেশের বিভিন্ন জেলা ও দেশের বাইরে পাঠাতে পারছি না।’
বন্দরের পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে গন্তব্য অনুযায়ী ভাড়া বেড়েছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় জিনিসপত্রের দামও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন তারা। গত রবিবার বেনাপোল থেকে ঢাকায় ১৫ টন পণ্য পরিবহনে জন্য ট্রাক ভাড়া ছিল ২১-২২ হাজার টাকা। মধ্যরাত থেকে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে এখন ভাড়া চাওয়া হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম পর্যন্ত আগে ট্রাক প্রতি ভাড়া ছিল ২৭-২৮ হাজার টাকা। এক রাতের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪-৩৫ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জের আগে ভাড়া ছিল ২২-২৩ হাজার টাকা। এখন চাওয়া হচ্ছে ২৭-২৮ হাজার টাকা।
বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য নিতে আসা ট্রাকের চালক খায়রুল ইসলাম বলেন, ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া ট্রিপপ্রতি পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে তো আমাদের করার কিছু নেই। আরেক ট্রাকচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, লিটারে ২০ টাকা করে ডিজেলের দাম বাড়ায় আমরা ভাড়া ঠিক করতে গিয়েও বেকায়দায় পড়ছি। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। তখন আমাদের মতো গরিব মানুষদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও আমদানিকৃত পণ্যের পরিবহন খরচ যুক্ত হয়ে পণ্যের দাম সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়বে বলে মনে করছেন বেনাপোল আমদানি রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক। তিনি বলেন,পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজি বলেন, দেশে ডিজেলের দাম বেড়েছে। আবার পাম্পে চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে তো ট্রাকের ভাড়া বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।
আজিম বলেন, অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাৎসরিক ভিত্তিতে মালামাল পরিবহনের চুক্তির ফলে অনেক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। লাভ তো দূরে থাক অনেক লোকসান দিয়ে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে আমদানিকারকের প্রতিষ্ঠানে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশের মূল্য এবং ফেরি ভাড়া বৃদ্ধির কারণেই নাকি ট্রাকের ভাড়াও বেড়ে গেছে।
বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও পরিবহন সংকটের জন্য ট্রাক ভাড়া এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকটা বাড়তি। ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করেন লাভের আশায় কিন্তু পরিবহন খরচ এত বেড়েছে যে এতে তাদের লোকসানে পড়তে হবে। কাঁচা পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নিত্যপণ্য খালাস করে নিয়ে যাচ্ছেন। তেলের ও ফেরি ভাড়া বৃদ্ধি, ও ট্রাক সংকটের জন্য ভাড়া বেড়ে গেছে। ঢাকায় ট্রাক যাওয়ার পর সেখানে থেকে কোনো ভাড়া না হওয়ায় দুই পাশের খরচ পুষিয়ে নিচ্ছেন ট্রাক মালিকরা।
কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়তে পারে বাসভাড়া
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে বাড়তে পারে ২০ পয়সা। গতকাল সোমবার বিকালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয়সংক্রান্ত প্রাক-বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিআরটিএর পক্ষ থেকে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতি কিলোমিটারে অন্তত ৪০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাসসহ অধিকাংশ গণপরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। ফলে প্রতি লিটার ডিজেলে পরিবহন ব্যয় সরাসরি ২০ টাকা বেড়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাস পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয়ে পড়ায় ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পরিস্থিতিতে বাসের পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও অন্যান্য ব্যয় হিসাব করে ভাড়া সমন্বয়ের প্রস্তাব নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে। দূরপাল্লা, মহানগর ও অন্যান্য শ্রেণির বাসের ক্ষেত্রেও পৃথক হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে কোন শ্রেণির বাসে কত ভাড়া বাড়বে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।
মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ার শঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পরও রাজধানীর বাজারে তাৎক্ষণিক বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গিয়ে বাজারে ঊর্ধ্বগতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর কয়েকটি বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। তবে রবিবার ও সোমবারের মধ্যে অধিকাংশ পণ্যের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। খুচরা বিক্রেতা ও বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম পরিবহন খরচে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দামে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তার বড় অংশ আগেই পরিবহন করে বাজারে আনা হয়েছে। ফলে নতুন জ্বালানি দরে পরিবহন খরচের হিসাব এখনো পুরোপুরি যুক্ত হয়নি।
মালিবাগ বাজারের সবজি বিক্রেতা আবু হোসেন বলেন, আজ আলাদা করে দাম বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। তবে পাইকারি বাজার থেকে আগামী দু-এক দিনে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা দামও বাড়াতে হবে। সেগুনবাগিচার এক মুদি দোকানি বলেন, পরিবহন খরচ বাড়লে শুধু একবার পণ্য আনার খরচ বাড়বে না। পাইকার থেকে খুচরা— প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়বে। তখন পণ্যের দামে সেটার প্রভাব পড়বে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে আগে পড়তে পারে পণ্য পরিবহনে। কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে তা জেলা বা মোকামে নেওয়া, সেখান থেকে রাজধানীর পাইকারি বাজারে আনা এবং পরে খুচরা দোকানে পৌঁছানো— প্রতিটি ধাপেই পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব একধাপে না এসে কয়েকটি ধাপে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫ মাসে লিটারে তেলের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা
দেশের বাজারে গত এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অকটেনের দাম। এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেনের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা। পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৪৪ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা। অর্থাৎ ৫ মাসে তেলের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পর্যন্ত। এপ্রিলের আগে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হতো ১০০ টাকা। ১৮ এপ্রিলের পর এর দাম বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর কয়েক মাস ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ২১ সেপ্টেম্বর থেকে আবার ২০ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এপ্রিলের আগের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে মোট ৩৫ টাকা।
কেরোসিনের দাম এপ্রিলের আগে ছিল প্রতি লিটার ১১২ টাকা। ১৮ এপ্রিল দাম বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। এরপর জুনে আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে কেরোসিনের দাম করা হয়েছে ১৫৫ টাকা। অর্থাৎ এপ্রিলের আগের দামের তুলনায় কেরোসিনের দাম বেড়েছে মোট ৪৩ টাকা। পেট্রোলের দাম এপ্রিলের আগে ছিল প্রতি লিটার ১১৬ টাকা। ১৮ এপ্রিল দাম বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। জুনে আরো ৫ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১৪০ টাকা। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬০ টাকা। এতে এপ্রিলের আগের তুলনায় পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৪৪ টাকা। অকটেনের দাম এপ্রিলের আগে ছিল প্রতি লিটার ১২০ টাকা। ১৮ এপ্রিল দাম বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। এরপর জুনে আরো ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করা হয়।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে অকটেনের দাম করা হয়েছে ১৬৫ টাকা। ফলে এপ্রিলের আগের তুলনায় প্রতি লিটার অকটেনের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা। সব মিলিয়ে এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেনের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









