কুমিল্লার ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় আটক সন্দেহভাজন মো. সিয়ামকেও (১৯) গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। এ নিয়ে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তোলা হত্যাটির ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার দেখানো হলো। তাদের মধ্যে আগেই গ্রেফতার প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং ১৫ বছরের দুই কিশোর মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
জবানবন্দিতে তিন আসামিই হত্যার দায় স্বীকার করলেও ঘটনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মিলছে না। গ্রেফতার চার আসামির মধ্যে ফাহাদ ও কামরুলকে গতকাল রবিবার গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সংশোধনাগারে এবং তুহিন ও সিয়ামকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ছেলে অপ্রতিম হত্যার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করেছে বলে মনে করছেন মা নাহিদা বেগম। তাঁর সন্দেহ, কিছুদিন আগে অপ্রতিমের ব্যবসায়ী বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের প্রতিষ্ঠানে একজন কিশোরের চাকরি নেওয়ার সঙ্গে হত্যার যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে পুলিশে দেওয়ার বিষয়টিও এই হত্যার নেপথ্যের কারণ হতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রেফতার দুই আসামির প্রকৃত বয়স নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। এই সন্দেহের বিষয়গুলো এক সহকর্মীকে জানিয়েছেন তিনি।
নাহিদা-ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র ছেলে অপ্রতিম নগরীর কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরিবারের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানায়। রাত পর্যন্ত অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার বাবা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি (জিডি) করেন।
পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। ওইদিনই মধ্যরাতে সদর দক্ষিণ থানায় নিহত অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাটি করেন। এরপর তুহিন এবং দুই কিশোর ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেফতার দেখানো হয়। গ্রেফতার তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সানন্দা এলাকার নূরে আলমের ছেলে। তিনি কুমিল্লা সিটি কলেজ একাদশ শ্রেণিতে পড়তেন।
২০২৫ সালে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর তিনি ড্রপআউট হয়ে যান। ফাহাদ সালমানপুর এলাকার মমিন হোসেনের ছেলে এবং কামরুল সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার মো. আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। তারা দুজনই ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সিয়ামকেও গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। তিনি সদর দক্ষিণের সদর দক্ষিণ মডেল থানার সূধন্যপুর এলাহিপুর (নোয়াবাড়ি) এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে।
জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, অপ্রতিম হত্যায় সরাসরি জড়িত দুই কিশোরকে আদালতের আদেশ অনুসারে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। শিশু আইনে তাদের বিচার হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম জানান, চার আসামিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সরাসরি হত্যায় জড়িত দুই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে আদালত অনুমতি দিলে সেখানে পাঠানো হয়। অন্য দুজন কুমিল্লা কারাগারে থাকবেন।
তথ্য গোপন করায় গ্রেফতার সিয়াম
জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, সিয়াম সরাসরি অপ্রতিম হত্যায় অংশ নেননি। তবে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে জানার পরও তা গোপন করেছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, সন্দেহভাজন হিসেবে মো. সিয়ামকে আটক করা হয়েছিল। হত্যার মূল হোতা তুহিন শুক্রবার অপ্রতিমকে খুনের পর ওই দিন রাত নয়টার দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সিয়ামের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। তাঁরা সম্পর্কে বন্ধু। সিয়ামকে তুহিন হত্যার বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিয়াম ওই সব কথা গোপন রাখেন। এজন্য তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে প্রথমে আটক ও পরে গ্রেফতার করা হয়। সিয়াম ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে ঘটনার সময় তিনি আশেপাশে থেকে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন কি না, সেটি যাচাই করছে পুলিশ।
মায়ের সন্দেহ: দুই কারণ
এই হত্যার নেপথ্যের কারণ নিয়ে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের সন্দেহ, কিছুদিন আগে অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একজন কিশোরের চাকরি নেওয়ার সঙ্গে হত্যার যোগসূত্র থাকতে পারে। এ ছাড়া সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে পুলিশে দেওয়ার বিষয়টিও এই হত্যার নেপথ্যের কারণ হতে পারে। অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদে ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে তাঁর এই সন্দেহ তুলে ধরেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাঁর অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও তিনি কয়েকটি সন্দেহের কথা এখানে জানাতে বলেছেন। তাঁর পক্ষ হয়ে সেগুলোই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে ওই মানববন্ধন ও শোকমিছিল হয়। সেখানে অপ্রতিমের মায়ের বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেফতার বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিল। অপ্রতিমের মা মনে করেন, ওই কিশোরের অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ নেওয়ার সঙ্গে হত্যার ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। কামরুন নাহার বলেন, নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কুমিল্লার স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে পুলিশে দিয়েছিলেন। ওই কিশোর গ্যাং দলের নেতৃত্ব মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন দিতেন বলে অপ্রতিমের মা দাবি করেছেন।
ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা। গ্রেফতার দুই আসামির প্রকৃত বয়স নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অপ্রতিমের মা। তাঁর বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, মামলায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে দুজনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাদের প্রকৃত বয়স যাচাই করে নিশ্চিতেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। এজন্য প্রয়োজন হলে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বয়সসংক্রান্ত বিষয়টি নিশ্চিতের কথাও তিনি বলেছেন। এ ছাড়া অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে প্রয়োজনে আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইউট্যাব কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক মো. শাহাদাৎ হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অপ্রতিম হত্যায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের পাশাপাশি অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে বলেও জানান শাহাদাৎ হোসেন। এর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক শামীমা নাসরিন বলেন, অপ্রতিমের হত্যা শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নয়, এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংকটেরও প্রতিফলন।
প্রশাসনকে এ ঘটনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শামীমা নাসরিন বলেন, অপ্রতিমের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু দেশের আরও অনেক অপ্রতিমের জন্য এভাবে কথা বলার কেউ নেই। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব প্রশাসনের। অপ্রতিম হত্যা মামলার বিচার দ্রুত দেখতে চান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘অপ্রতিম আমাদের সন্তান। আমরা আর কত মানববন্ধন করব? শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।’ মানববন্ধনে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও হলের প্রভোস্টরাও। মানববন্ধনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোকমিছিল করেন শিক্ষকেরা।
হত্যার নেপথ্যে অসম বন্ধুত্ব?
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি ছিল পুলিশের। তাদের ভাষ্য, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতীমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নেওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তুহিন এবং তার সঙ্গী ফাহাদ ও কামরুল।
রবিবার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আইফোনটি গ্রেফতার হওয়া একজনের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ওইদিন রাতেই তাদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। তিনজনই এই নির্মম হত্যার পেছনে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিমের বাধা দেওয়া ও ধস্তাধস্তির ঘটনাকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে, নিছক আইফোনই নয়, বয়সে বড় বখাটে কিশোর-তরুণদের সঙ্গে অসম বন্ধুত্ব এবং টাকা-পয়সার লেনদেন, বিশেষ করে পাঁচ হাজার টাকার পাওনাও এর পেছনে দায়ী বলেও উঠে আসছে।
একটি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে, শুরুতে এমনই ভেবেছিল পুলিশ। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, সামনে এসেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে ক্ষোভ, বয়সে বড়দের সঙ্গে তার ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের ঘটনা। হত্যার তদন্তে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সটি কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর সঙ্গে গ্রেফতারকৃতদের আলাদা স্বার্থ ও ক্ষোভও কাজ করে থাকতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা অপ্রতিমের সঙ্গে গ্রেফতার হওয়াদের সম্পর্ককে বলছেন ‘অসম বন্ধুত্ব’। কারণ, সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অপ্রতিমের সঙ্গে যাঁদের ওঠাবসা ছিল, তাঁরা তার সহপাঠী নন; বয়সেও বড়। তদন্তে তাঁদের একসঙ্গে তোলা ছবি ও ভিডিও এবং টিকটকের জন্য তৈরি বিভিন্ন ভিডিওর তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকেল পৌনে তিনটা থেকে পরবর্তী প্রায় তিন ঘণ্টা অপ্রতিমকে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও এ সময়টাতে তারা কোথায় কী করছিলো, সে সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তুহিনের সঙ্গে ওই সন্ধ্যায় পাহাড়ে অপ্রতিমের যাওয়ার মূল কারণ নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।
ঘটনাস্থল সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড় লোকালয় থেকে প্রায় ২০ মিনিটের হাঁটা পথ। জঙ্গলঘেরা এই নির্জন পাহাড়ে বিকেলের পর মূলত মাদকসেবীদের বিচরণ থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাধারণ কোনো পর্যটক বা দর্শনার্থীকে সেখানে কখনো ঘুরতে কিংবা ছবি তুলতে দেখা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তুহিনের সঙ্গেই লোকালয়ে ছিলেন অপ্রতিম। হত্যার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে ধারণ পাওয়া যায় অভিযুক্ত তুহিনের মায়ের বক্তব্যেও। তিনি জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় তুহিন বাসায় ফিরেছিলেন, তবে রাত আটটার দিকে আবারও বাসা থেকে বের হয়ে যান। তুহিনের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কৌশলে নিজের এক বন্ধুর মোটরসাইকেল ছিনতাই করেছিলেন তুহিন। ওই ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ভুক্তভোগীকে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
অপ্রতিমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে খোদাই করা তার নামের ওপর শ্রদ্ধা জানিয়ে ফুল দিয়ে রেখেছে সহপাঠীরা। অপ্রতিম বয়সে ছোট হলেও সমবয়সীদের চেয়ে জ্যেষ্ঠদের সঙ্গেই বেশি চলাফেরা করত বলে জানিয়েছেন তার সহপাঠীরা।
অন্যদিকে, শোকার্ত বাবা আক্ষেপ করে বলেন, একই এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বেড়ে ওঠার কারণে ছোট-বড় সবার সঙ্গেই অপ্রতিমের বেশ সুসম্পর্ক ও মেলামেশা ছিলো। সেই সুসম্পর্কের ইতি এমন নৃশংসভাবে ঘটবে, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবার।
ঘটনার দিন শুক্রবার অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মুঠোফোনের খুদে বার্তার। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেদিন অপ্রতিমের কাছে থাকা ফোনে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন তুহিন। বাসা থেকে বের হতে বলছিলেন। একপর্যায়ে বলা হয়, অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোনটি দিয়ে তাঁরা টিকটকের জন্য ভিডিও বানাবেন, ছবি তুলবেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপ্রতিম শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। পরিবারও আগে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের ফোনটি নিয়ে বের হয়েছিল অপ্রতিম। পরে আর বাসায় ফেরেনি। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে। ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, অপ্রতিম ও তুহিন পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে, কথা বলছে।
তাদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। একটি ফুটেজে তাদের পেছনে আরও দুজনকে যেতে দেখা গেছে। অন্য একটি ফুটেজে চারজনকেই একসঙ্গে পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে একজনকে দেখা গিয়েছিল। ওই ফুটেজই প্রথম সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
অপ্রতিমকে হত্যা করা হয় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে কাঁচা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় সেখানে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিম ও তুহিনকে হেঁটে পাহাড়ের দিকে যেতে দেখা গেছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, পরে সেখানে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দুই কিশোর। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুসারে, শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে বাধা দিলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি।
তুহিন প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন এবং পরে অন্যরাও আঘাত করে। অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার ফোনটি নিয়ে তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ জানতে পেরেছে, এলাকাটি বেশ নির্জন। এ কারণে বাইরে থেকে সহজে সেখানে কী ঘটছে, তা বোঝার সুযোগ কম। অপ্রতিমের মরদেহে মাথার গুরুতর আঘাতের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এর কিছু ক্ষত মৃত্যুর পর তৈরি হয়ে থাকতে পারে। রাতে শিয়াল মরদেহ টানাটানি করেছিল। এ বিষয়ে ময়না তদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যও পর্যালোচনা করছে পুলিশ।
অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে শান্ত, মিশুক ও পড়াশোনায় ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছে। স্কুলে কোনো ঝামেলায় তাকে জড়াতে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান।
অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তুহিন বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় বয়সে কম কয়েকজনকে নিয়ে চলাফেরা করতেন এবং একটি দল তৈরি করেছিলেন। একসময় অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
তবে রবিবার সংবাদ সম্মেলনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গ্রেফতাদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। রবিবার সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। তাদের সঙ্গে এই ছেলের (অপ্রতিম) সম্পর্ক ছিল, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স নিহত শিশুটির চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি। পুলিশের কাছে অবশ্য অপ্রতিম ও ওই ব্যক্তিদের একসঙ্গে চলাফেরা, ছবি তোলা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্য রয়েছে। এই বয়স ও সামাজিক অবস্থানের ব্যবধানের সম্পর্ককেই তদন্তকারীরা বলছেন ‘অসম বন্ধুত্ব’।
পাঁচ হাজার টাকার আরেক হিসাব
তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত গ্রেফতার হওয়া কামরুল। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল ওই কিশোর। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দেওয়া সময়রেখা অনুসারে, শনিবার সকাল নয়টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনো জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা জানতেন না যে অপ্রতিম মারা গেছে। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর তাঁদের কাছে পৌঁছায়।
তদন্তকারীরা বলছেন, শুরুতে তুহিন হত্যায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছিলেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত আটটার দিকে তিনি ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তখনো অন্যদের নাম বলতে চাইছিলেন না তুহিন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য, অন্যদের নাম প্রকাশ না করতে তিনি ‘ওয়াদাবদ্ধ’।
কিন্তু তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর মোবাইল ফোনে বারবার ফোন আসছিল। ফোন করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোর কামরুল। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, আটকের সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। ওই কিশোরকে আটকের খবর পাওয়ার পর তুহিন আরেক কিশোর ফাহাদের নামও জানান। এরপর তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
ঘটনার আগে থেকেই নিজেদের অবস্থান আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ১৫ বছর বয়সী কিশোর কামরুল মুঠোফোন ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখত। ঘটনার দিন নিজের মোবাইল ফোন সঙ্গে নেয়নি সে। পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, পরে মোবাইল ফোনের অবস্থান যাচাই করা হলে যেন ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি ধরা না পড়ে, সে জন্যই এমনটি করা হয়েছিল। তবে এর পক্ষে প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য আলামত আরও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওই কিশোরের বাবাকে ঘটনার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
হত্যার পর অপ্রতিমের আইফোনটি নিয়ে চলে যান তুহিন—এমনটাই বলছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও তুহিনের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ফোনটি পরে তাঁর বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয়। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ সদর দক্ষিণ মডেল থানার সানন্দার বাড়িতে গেলে তুহিনের মা শিরিনা আক্তার বিছানার তোশকের নিচ থেকে ফোনটি বের করে দেন।
তুহিনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগেই তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। তখন তাঁর ছোট ভাই তুষারকে ফোনটি সাবধানে লুকিয়ে রাখতে বলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









