দেশের বিলাসবহুল ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি ব্যবসায় পরিচিত নাম মো. হাবিব উল্লাহ ডন। দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি আমদানির ব্যবসার পাশাপাশি খাতভিত্তিক সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন—বারভিডার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের স্পনসর পরিচালক হিসেবেও তাঁর অবস্থান ছিল। ফলে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী সংগঠনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা এবং ব্যাংক পরিচালক—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় একই ব্যক্তির মধ্যে থাকায় তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাস্টমসের বড় অঙ্কের জরিমানা, দুবাইভিত্তিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পণ্য আমদানি, বিদেশে সম্পদ থাকার অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলা। বাদ যায়নি আলোচিত মডেল পিয়াসা কান্ডেও তাঁর নাম। তবে বারবারই নানা কৌশলে পার পেয়ে গেছেন। অনেকটা হিন্দি ‘ডন’ সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়লগের মতো- ‘ডনকো পাকাড়-না মুশকিলই নেহি, নামুনকিন হ্যায়।’
জানা গেছে, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুল্লাহ ডন । একসময় যার নুন আনতে পান্তা ফুরাত, এখন তিনি অঢেল সম্পদের মালিক। আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে সুবিধাভোগী গাড়ি ব্যবসায়ী তিনি। আলোচিত মডেল পিয়াসা-কাণ্ডেও ছিল তাঁর নাম। তাঁর মালিকানাধীন গুলশানের গাড়ির শোরুম অটো মিউজিয়ামে চোরাই গাড়ি বিক্রি হয় বলে তখন আইনশৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা জানিয়েছিলেন। মডেল পিয়াসা ওই চোরাই গাড়ি সিন্ডিকেটের সদস্য। অটো মিউজিয়াম থেকে পিয়াসার সহযোগী মিশুর চুরি করা একটি গাড়িও উদ্ধার করেছিল র্যাব।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ওই সময় গ্রেফতারকৃতদের মোবাইল ফোন ও ফেসবুক আইডি তল্লাশি করে প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ীর সাথে পিয়াসা, পরীমণিসহ অনেক উঠতি মডেলদের যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল । সিআইডি সূত্র আরো জানায়, ফেরারি ব্র্যান্ডের এফ-৪৩০ সিরিয়ালের ৬ হাজার সিসির গাড়ি জব্দ করা হয়েছিল। এ ধরনের উচ্চ সিসির গাড়ি বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ। এ কারণে সেগুলোর বৈধভাবে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। অটো মিউজিয়াম থেকে উদ্ধার গাড়িটিতে যে নম্বর প্লেট লাগানো ছিল, সেটিও ছিল জাল। বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এত কিছুর পরও বহাল তবিয়তে রয়েছে বিতর্কিত এই ব্যবসায়ী।
সব আমলেই হাবিবুল্লাহ ডন দুধের মাছি। তিনি এতটাই কৌশলী যে সরকার বদলায়, দেশ বদলায় কিন্তু তিনি বদলান না। এতকিছুর পরও থেকে যান স্বপদে-স্বমহিমায়। বারভিডার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সদস্য বলেন, এতদিন শুনেছি তিনি আওয়ামী লীগের বড় নেতা আর এখন শুনি তিনি বিএনপি নেতা আব্দুল আওয়াল মিন্টুর উপদেষ্টা। তার রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেতে চান রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা।
ডনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করছে তাঁর তিনটি পরিচয়ের সমন্বয়—আমদানিকারক, খাতের সংগঠনের নেতা এবং ব্যাংক পরিচালক। একদিকে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করেছেন। অন্যদিকে বারভিডার নেতৃত্বে থেকে একই খাতের শুল্ক ও আমদানি নীতিতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আবার তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে যে ব্যাংকে এলসি খোলা হয়েছে, সেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও তাঁর অবস্থান ছিল।
ডনের ব্যবসার বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্ট অভিযোগটি হচ্ছে কাস্টমস-সংক্রান্ত। নথি অনুযায়ী, অটো মিউজিয়াম লিমিটেডের আমদানি করা দুটি বিলাসবহুল গাড়িকে ‘মাইল্ড হাইব্রিড’হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় গাড়িগুলো নন-হাইব্রিড হিসেবে শনাক্ত হয়। এরপর শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মোট ১৩.১৭ কোটি টাকা জরিমানা করে। ডনের ব্যবসা ঘিরে অনুসন্ধানে আরো যে বিষয় সামনে এসেছে তা হলো- ফিটনেস সরঞ্জাম আমদানিতে দুবাইভিত্তিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, অটো মিউজিয়ামের নামে ফিটনেস সরঞ্জামের কয়েকটি চালান ইতালি ও স্লোভেনিয়ার বন্দর থেকে বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু বাণিজ্যিক কাগজপত্রে দুবাইভিত্তিক একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ২০২৩ সালে অটো মিউজিয়াম লিমিটেডের নামে এক্সিম ব্যাংকের গুলশান শাখায় পাঁচটি এলসি খোলা হয়। এসব এলসির মোট মূল্য ৪৮ হাজার মার্কিন ডলারের কিছু বেশি। একই সময়ে ডন ব্যাংকটির স্পনসর পরিচালক ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। নথিপত্র থেকে আরো জানা গেছে, কম মূল্য ঘোষণা করে পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে মূল্য-পার্থক্যের অর্থ বিদেশে রেখে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের পদ্ধতিকে সাধারণভাবে ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, কুয়ালালামপুরের বারজায়া টাইমস স্কয়ারে ডনের একাধিক সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে মালয়েশিয়ার ভূমি নিবন্ধন বা কোম্পানি রেজিস্ট্রির প্রত্যক্ষ নথি যাচাই করা হয়নি। তথ্য বলছে, গাড়ি আমদানি খাতের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ডনের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। বারভিডার সভাপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে গাড়ি আমদানির শুল্ক, অবচয় সুবিধা, হাইব্রিড গাড়ির নীতিমালা ও আমদানি-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি তুলে ধরেছেন। ২০২৩ সালে বারভিডার সভাপতি হিসেবে তিনি আমদানি সংকট, এলসি সমস্যা এবং গাড়ির শুল্ক কাঠামো নিয়ে বক্তব্য দেন। ২০২৪ সালেও রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে অবচয় সুবিধা বাড়ানোর দাবি নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ অবস্থানে থেকে তিনি ছিলেন একদিকে গাড়ি আমদানি খাতের অন্যতম নীতিগত অংশীজন, অন্যদিকে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানও একই বাজারের বড় ব্যবসায়ী। তাঁর প্রতিষ্ঠানের গাড়ি আমদানি নিয়েই যখন কাস্টমসের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হয়, তখন স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি সামনে আসা স্বাভাবিক। ব্যবসায়ী হিসেবে ডনের প্রভাব শুধু গাড়ি আমদানির খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেছেন। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে থাকার কারণে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ ও অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। এছাড়াও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ ডন দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘কাস্টমসে কখনোই আমার কোনো জরিমানা হয়নি। সেখানে আমার নামে কোনো অভিযোগ নেই।’ টাকা পাচারের বিষয়ে বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো ব্যাংক থেকে এক টাকাও লোন নেইনি। কখনো সুদের ব্যবসার সাথে জড়িত হইনি।’ তাঁর দাবি, তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। সুদের সাথে কিংবা হারামের সাথে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বারভিডার সভাপতি হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্ক কমানোর বিষয়ে সরকারের সাথে বৈঠক করেছেন। শেখ হাসিনা ও সালমান এফ রহমানের সাথে দেখা করেছেন। হত্যা মামলার প্রসঙ্গে বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহারে সরকারের কাছে আবেদন করবেন তাঁরা। মডেল পিয়াসা কিংবা চিত্রনায়িকা পরীমণির সাথে তাঁর কোনো পরিচয় নেই। তাঁদের মোবাইল নম্বরও তাঁর কাছে নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









