সূর্যের মৃত্যুর প্রায় ১০০ কোটি বছর পরই সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলো চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় পতিত হবে—নতুন এক গবেষণায় এটি উঠে এসেছে, যা গ্রহগুলোর অনুমিত স্থায়িত্বের সময়সীমাকে একশো কোটি গুণ কমিয়ে দিয়েছে। পূর্বের অনুমান অনুযায়ী ধারণা করা হতো যে, প্রকাণ্ড এই গ্রহগুলোর কক্ষপথের স্থায়িত্ব প্রায় এক কুইন্টিলিয়ন বছর পর্যন্ত বজায় থাকবে, যা মহাবিশ্বের বর্তমান বয়সের চেয়েও অনেক বেশি। ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (ক্যালটেক)-এর গবেষকরা এটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন যে, সূর্যের ধীরগতির মৃত্যু কীভাবে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনসহ বাইরের গ্রহগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে।
আইজ্যাক নিউটনসহ অনেক বিজ্ঞানীরই এতদিন বিশ্বাস ছিল যে, সূর্য ধীরগতিতে ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে মসৃণভাবে তার ভর হ্রাস করবে; প্রথমে একটি ‘রেড জায়ান্ট’ (লোহিত দানব) এবং পরে একটি ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ (শ্বেত বামন)-এ রূপান্তরিত হবে। সূর্য যখন প্রসারিত হয়ে রেড জায়ান্টে পরিণত হবে, তখন পৃথিবী, শুক্র এবং বুধ গ্রহ প্রথম গ্রাস বা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর মঙ্গল গ্রহ অনেকটাই দূরে অবস্থান করার কারণে এই গ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র গ্রহ হতে পারে।
পূর্ববর্তী গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছিল যে, বাইরের গ্রহগুলো এই প্রক্রিয়া কাটিয়ে বেঁচে থাকবে এবং সূর্যের ভর কমার সাথে সাথে তাদের কক্ষপথ প্রায় দ্বিগুণ প্রশস্ত হয়ে যাবে। তখন ধারণা করা হতো যে, কোনো নক্ষত্র পাশ দিয়ে অতিক্রম করার ফলেই প্রায় ৩০ থেকে ১০০ বিলিয়ন (৩,০০০ থেকে ১০,০০০ কোটি) বছরের মধ্যে কেবল এগুলো ভেঙে যেতে পারে। তবে নতুন এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগের সেই ধারণাটি ভুল ছিল। তার পরিবর্তে, সূর্য শ্বেত বামনে পরিণত হওয়ার প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) বছর পর বাইরের গ্রহগুলো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে—যদিও সেই ঘটনা ঘটতে এখনো কয়েক বিলিয়ন বছর বাকি রয়েছে।
সূর্য যখন শ্বেত বামনে পরিণত হবে, এটি দ্রুত শীতল হয়ে বর্তমান আকারের অর্ধেকে নেমে আসবে। তবে পূর্বের ধারণার মতো এই প্রক্রিয়াটি অতটা মসৃণ বা শান্ত হবে না। গবেষণায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, নক্ষত্রটি শান্ত ও ধারাবাহিক মুক্তির পরিবর্তে ‘স্টোকাস্টিক কিকস’ (Stochastic kicks) নামে পরিচিত তীব্র ও আকস্মিক শক্তিশালী নির্গমনের মাধ্যমে তার ভর হারাবে।
নতুন তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পূর্বের ধারণাটি ভুল ছিল। সূর্য শ্বেত বামনে পরিণত হওয়ার প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) বছর পর বাইরের গ্রহগুলো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে, যা ঘটতে এখনো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর বাকি।
আমাদের সৌরজগতের বয়স ৪.৫৭ বিলিয়ন বছর এবং সূর্য লোহিত দানবে পরিণত হওয়ার আগে আরও প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর সময় বাকি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে মনে করে আসছিলেন যে দানবীয় গ্রহগুলো কল্পনাতীত দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যকে টিকিয়ে রাখবে বা এর চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকবে।
এই গবেষণাটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সুপারকম্পিউটার এবং শত শত উন্নত ‘N-body’ সংখ্যাসূচক সিমুলেশনের সাহায্যে পরিচালনা করা হয়েছিল, যেখানে কোনো এআই (AI) সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়নি। গবেষকরা সূর্য, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনকে অন্তর্ভুক্ত করে সৌরজগতের একটি ভার্চুয়াল মডেল প্রোগ্রাম করেছিলেন। এরপর সুপারকম্পিউটারগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে এগুলোর গতি এবং অবস্থান গণনা ও সিমুলেট করে দেখায়।
চলতি বছরের এই বিশ্লেষণটিকে পূর্বের গবেষণাগুলো থেকে যা আলাদা করেছে, তা হলো—সূর্যের মৃত্যুর সাথে সাথে আকস্মিক, সহিংস ও ধারাবাহিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে এর ভর হারানোর প্রক্রিয়াটি চিত্রায়িত করা। একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য শত শত ভিন্ন ভিন্ন মডেলের পুনরাবৃত্তি পরীক্ষা করা হয়েছিল।
‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ প্রকাশিত ‘টার্মিনাল ইনস্ট্যাবিলিটি অফ দ্য সোলার সিস্টেম ট্রিগার্ড বাই স্টোকাস্টিক সোলার মাস লস’ (Stochastic Solar Mass Loss দ্বারা সৃষ্ট সৌরজগতের চূড়ান্ত অস্থিরতা) শীর্ষক একটি গবেষণায় এই ফলাফলগুলো প্রতিবেদন করা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









