দেশে এখন কাগজে-কলমে লোকসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। ধনীদের খাদ্যের অভাব নেই। মধ্যবিত্তেরও চলে যায় কোনোমতে। আর খাদ্যের অভাব টের পায় অতিগরিবরা। অনেকের দিন কাটে খেয়ে না-খেয়ে। তবে অবাক করা বিষয়, এই টানাপড়েনের দেশেও প্রতিদিন নষ্ট হয় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি মানুষের খাবার! বিশ্বব্যাংকের ‘ফুড লস অ্যান্ড ওয়েস্ট ডায়াগনস্টিক’গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য।
দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাবারের একটি বড় অংশ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ফসল কাটার পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ, বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও পরিবহন করতে না পারা এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ফল ও সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অভাবে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ আরো বাড়ছে। আবার পরিবার, হোটেল ও রেস্তোরাঁসহ ভোক্তা পর্যায়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার তৈরি এবং অব্যবহৃত খাবার ফেলে দেওয়ার কারণেও হচ্ছে খাদ্য অপচয়। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি ও খাদ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের ‘ফুড লস অ্যান্ড ওয়েস্ট ডায়াগনস্টিক’গবেষণা অনুযায়ী, এই ক্ষতির আর্থিক মূল্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের সমান। একই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যে খাদ্য শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না, তা উৎপাদনে দেশের ২৭ শতাংশ জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৩ শতাংশ এই ক্ষতির সঙ্গে জড়িত। ফলে খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের বিষয়টি শুধু খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার, অর্থনীতি এবং পরিবেশেরও সম্পর্ক রয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে দৈনিক এদিনকে বলেন, খাদ্য অপচয় মানে শুধু খাদ্য নয়, বরং পানি, জমি ও শ্রমের মতো দুর্লভ সম্পদের অপচয়। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য খাদ্য অপচয় কমানো অপরিহার্য।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নাজিম উদ্দিন দৈনিক এদিনকে বলেন, দেশে একদিকে মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, অন্যদিকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট ও অপচয় হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন খাবার নষ্ট বা অপচয় হয়। যা মোট উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের মহাপরিচালক মাহবুব রহমান এদিনকে বলেন, খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকের আয় বাড়ানো ও টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি কমিয়ে উৎপাদিত খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্য অপচয় কমাতে কৃষি উন্নয়ন নীতি, জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি, সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কোল্ড চেইন উন্নয়নের মতো উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বারির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী এদিনকে বলেন, দেশে খাদ্য অপচয় কমাতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হয়েছে। বারিতে ফসলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমাতে প্রায় ২৫ ধরনের প্রযুক্তি এবং ১৫০টির বেশি প্রযুক্তি রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের প্রক্রিয়াজাতকরণে তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই ফল ও সবজির অপচয় কমানো সম্ভব। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা গেলে কাঁচা আম, আমড়া, জলপাইসহ বিভিন্ন ফল দীর্ঘ সময় ব্যবহারযোগ্য রাখা যায়।
তিনি আরো বলেন, ফসল সংগ্রহের পর সঠিকভাবে বাছাই, গ্রেডিং, ধোয়া, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ না করার কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। কৃষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তার জন্য ভিন্ন মাত্রার প্রযুক্তি নির্বাচন করতে হবে।
উৎপাদনের পরই বড় ক্ষতি
ফসলের ক্ষেত্রে ক্ষতির বড় অংশই হয় উৎপাদনের পরের ধাপগুলোতে। এর মধ্যে ফসল কাটার পর সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারা; বাছাই ও গ্রেডিং না করা; উপযুক্ত প্যাকেজিংয়ের অভাব ও পরিবহনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অন্যতম কারণ। এফএওর সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে করা গবেষণায় কৃষক থেকে মিলার পর্যন্ত ধানের ফসল-পরবর্তী ক্ষতি ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কৃষক পর্যায়েই ক্ষতি প্রায় ১৪ শতাংশ। একই গবেষণায় গমের ক্ষতি ১৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ, আমে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ, আলুতে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং টমেটোতে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ ফসল কাটার পর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ নষ্ট বা অপচয়ের পরিমাণ দেশের বর্তমান সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী ড. লতিফুল বারী। এদিনকে তিনি বলেন, ‘দেশে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি ৩০ বা ৩৩ শতাংশের মতো। আর এই ক্ষতি আস্তে আস্তে আমাদের ক্যাপাসিটির বাইরে চলে যাচ্ছে।’
উদ্যানতত্ত্ববিদ ড. সাহাবুদ্দিন আহমেদ এদিনকে বলেন, ‘সায়েন্টিফিক কাল্টিভেশন, হারভেস্ট, ম্যানেজমেন্ট, স্টোরেজ— কোনোটাই আমাদের মানসম্মত নয়। আর সে কারণেই সবসময় বেশি ক্ষতি হয়।’তিনি বলেন, ‘ফল ও সবজি কাঁচা অবস্থায় তুলে তাজা খাওয়া হয় বলে শুকিয়ে সংরক্ষণের সুযোগ থাকে না। বাজারদরের সঙ্গেও এ ক্ষতির সম্পর্ক রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী এদিনকে বলেন, ‘ফসলের দাম কমে গেলে শ্রম দিয়ে তা তোলা সম্ভব হয় না। তখন ১০০ শতাংশই অপচয় হয়।’
পরিবহনেও নষ্ট হচ্ছে খাদ্য
শুধু মাঠ ও সংরক্ষণ পর্যায়েই নয়; খাদ্য নষ্ট কিংবা অপচয়ের ঘটনা ঘটছে পরিবহনের সময়ও। এর মধ্যে উৎপাদন এলাকা থেকে শহরের বাজারে আনার পথে তাপমাত্রা, আঘাত, অতিরিক্ত চাপ ও উপযুক্ত পরিবহনের অভাবে বিভিন্ন কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। একই ঘটনা ঘটছে প্রাণিজ খাদ্যের বেলাতেও। এতে একদিকে খাদ্যের সরবরাহ কমছে, অন্যদিকে পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও পড়ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার এই দুর্বলতার কারণে খাদ্যের প্রকৃত মূল্যও বেড়ে যায়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মাহবুব রহমান এদিনকে বলেন, ‘এখানে গুড গভর্নেন্সেরও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে এর ঘাটতির কারণে এমন কিছু “হিডেন কস্ট”তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি চোখে দেখা যায় না। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও পড়ছে। বিশেষ করে একটি শ্রেণির মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা ক্রমেই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
কৃষি প্রযুক্তি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বিধান চন্দ্র নাথ এদিনকে বলেন, “ফল ও সবজির ক্ষেত্রে পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে ক্ষতি কমানো সম্ভব। ফল ও সবজির অব্যবহৃত বা পচে যাওয়া অংশও সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ ক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত মডেল হতে পারে ‘ওয়েস্ট টু ভ্যালু’অর্থাৎ বর্জ্যকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করা। এজন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত হাব তৈরি করা দরকার।”
সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় ক্ষতি কমানো সম্ভব
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত বেগুনের প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তবে বাছাই, গ্রেডিং, ধোয়া ও উন্নত প্যাকেজিংসহ সমন্বিত ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা করা হলে এই হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। অর্থাৎ এ ব্যবস্থাপনায় বেগুন নষ্ট হওয়ার পরিমাণ ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমে। গবেষকদের হিসাবে, এর মাধ্যমে এক হাজার কেজি বেগুন বিক্রি করা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সাপ্তাহিক বাড়তি আয় হতে পারে ১৭ হাজার ১৯০ টাকা। ওই গবেষণা অনুযায়ী, আমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হওয়া কমানো সম্ভব হয়েছে। উন্নত আম পাড়ার যন্ত্র, প্লাস্টিক ক্রেট, বোঁটা ছাঁটা, ডিল্যাটেক্সিং ও ৫৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পাঁচ মিনিট গরম পানিতে শোধনসহ সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় বিক্রয়-অযোগ্য আমের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ বিক্রয়-অযোগ্য আমের পরিমাণ প্রায় ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ কমে। গবেষকদের হিসাবে, এর মাধ্যমে ৪ হাজার কেজি আম বিক্রি করা একজন ব্যবসায়ীর সাপ্তাহিক বাড়তি মোট আয় হতে পারে ৭১ হাজার ৯৩৭ টাকা।
এ ধরনের কম খরচের ব্যবস্থার কথা জানিয়ে বারির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, ‘মাঠ থেকে ফসল তোলার পর তাপমাত্রা কমাতে পারলে শেলফ লাইফ প্রায় দ্বিগুণ হয়। অথচ এ সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা নেই। প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণে তেমন কোনো যন্ত্রপাতি বা অর্থের বিনিয়োগেরও প্রয়োজন নেই।’ কাঁচা ফল গরম পানিতে শোধন করে লবণ-ভিনেগারের দ্রবণসহ জীবাণুমুক্ত পাত্রে রাখলে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ছয় থেকে আট মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ সম্ভব বলে জানান তিনি।
ফসল নষ্ট হওয়া কমতে পারে নতুন জাত উদ্ভাবনে
ফসল নষ্ট হওয়া কমাতে সংরক্ষণ প্রযুক্তির পাশাপাশি নতুন জাত উদ্ভাবনের সুযোগও রয়েছে। জাত উদ্ভাবনের সময় ফসল কতদিন ভালো থাকে, কিভাবে সংরক্ষণ করা যায় ও বাজারে কত দিন পর্যন্ত মান বজায় রাখা সম্ভব- এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং বাজারজাত করার সময়ও বাড়বে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর সবজি ও ফলের ক্ষেত্রে সংরক্ষণক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী লতিফুল বারী বলেন, ঢ্যাঁড়শের মতো স্পর্শকাতর সবজির অল্পক্ষণেই রং পরিবর্তন হয়ে যায়। ফ্রিজ-ড্রাইং প্রযুক্তিতে পানি সরিয়ে নিলে পুষ্টিগুণ বজায় থাকে এবং তা স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়।
নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রসঙ্গে উদ্যানতত্ত্ববিদ ড. সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, জাত উদ্ভাবনের পর্যায় থেকেই সংরক্ষণক্ষমতা বিবেচনায় নিলে পরবর্তী সংরক্ষণ ও বিপণনের খরচ কমানো সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি বারির চেরি টমেটোর কথা বলেন, যা ‘ফিউ উইকস, ইভেন ওয়ান মান্থ’ খাওয়ার উপযোগী থাকে।
পরিবার ও রেস্তোরাঁয়ও হচ্ছে খাদ্য অপচয়
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিবারগুলোতে বছরে ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়, যা মাথাপিছু বছরে প্রায় ৮২ কেজি। ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এই হিসাব ছিল মাথাপিছু ৬৫ কেজি এবং মোট ১ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার টন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসানের ঢাকা ও ময়মনসিংহের ১৭৫টি পরিবারের তথ্য নিয়ে করা গবেষণাতেও উচ্চ-আয়ের পরিবারে সপ্তাহে দুই কেজির বেশি খাবার ফেলে দেওয়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এ-প্লাস এবংএ শ্রেণির রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে ২১ থেকে ৪০ শতাংশ এবং কমিউনিটি সেন্টারে উদ্বৃত্ত খাবারের হার ৫ থেকে ৩০ শতাংশ পাওয়া যায়।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিধান চন্দ্র নাথ বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং পারিবারিক ও শহুরে পর্যায়ে ‘ব্যাপক পরিমাণে’খাদ্য অপচয় কিংবা নষ্ট হয়। বারির ফেরদৌস চৌধুরী একে ‘কনজাম্পশন লস’উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশে আপ্যায়নে নানা ধরনের খাবার পরিবেশন করা হলেও কতটুকু খাওয়া হয় আর কতটুকু নষ্ট হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। তবে এই হিসাব নিয়ে দেশের ভেতর ভিন্নমত আছে। গত ৮ জুন জাতীয় সংসদে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টন খাদ্য অপচয়ের কথা জানান।
নষ্ট খাবার থেকেও তৈরি হতে পারে নতুন পণ্য
খাবার নষ্ট হওয়ার পর সেটিকে পুরোপুরি বর্জ্য হিসেবে না দেখে পুনর্ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে তৈরি হওয়া উপজাত থেকে জ্বালানি, সার, পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। গবেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ছোট আকারের উদ্যোগ গড়ে তোলা গেলে নষ্ট হয়ে যাওয়া বিভিন্ন উপাদান কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরি করা যায়। এতে একদিকে খাদ্য অপচয় কমবে, অন্যদিকে এসব উপাদান থেকে অর্থনৈতিক মূল্যও তৈরি হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগে বড় অবকাঠামোর পরিবর্তে ছোট আকারের অবকাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বিজ্ঞানী লতিফুল বারী। তাঁর মতে, নষ্ট হয়ে যাওয়া মাছ ফারমেন্টেশন করে ফিশ সস তৈরি করা যেতে পারে। এ প্রক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ থেকে পোল্ট্রি ও পশুখাদ্য তৈরির সুযোগও রয়েছে। মাছের আঁশও ফেলে না দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
চিংড়ির খোসা থেকেও কাইটিন ও কিটোসানের মতো উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে জানিয়ে ড. বারী বলেন, এসব উপাদান থেকে তৈরি কিটোসান প্রসাধনীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। একইভাবে ডিমের খোসায় থাকা ক্যালসিয়াম কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরির সম্ভাবনার কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, জৈব উৎসের প্রতিটি উপাদানকে আলাদাভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে।
এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এফপিএমইউর ড. মাহবুবুর রহমান দৈনিক এদিনকে বলেন, এসডিজির ১২.৩ লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য নষ্ট কিংবা অপচয় অর্ধেকে নামাতে হবে। সমন্বয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষে খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয় রোধ এবং খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান এককভাবে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’ তাই সরকারি সহায়তা, লজিস্টিক সাপোর্ট ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করতে হবে। খাদ্য, কৃষি, বাণিজ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে এক ছাতার নিচে আসার প্রস্তাবও দেন তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









