আধুনিক আলো ঝলমলে জৌলুস আর কৃত্রিমতার এ যুগে নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়ায় যেন বসেছে আবহমান গ্রাম-বাংলার রূপকথা। বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ইট-কাঠের শহরের বুকে দেশীয় ও প্রাকৃতিক উপাদানের নিপুণ কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অনাবিল বাঙালিয়ানা।
কুলা, চাটাই, তালপাখা, মাটির তৈরি সরা, হাঁড়ি আর কড়ির বিন্যাসে সেজে উঠেছে আমলাপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপ। আর এ অনুষঙ্গগুলোর ভেতরে পরম মমতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধন, ‘মা’।
নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া গলিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে নজরকাড়া দৃশ্য, প্রবেশপথ থেকে শুরু করে প্রতিমার বেদি পর্যন্ত যেন প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে মাতৃত্বের গল্প। দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে বিশাল এ আয়োজন ইতিমধ্যেই পুরো নারায়ণগঞ্জ শহর জুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে। এবারের মণ্ডপসজ্জার মূল প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘মা‘। শুধু স্বর্গীয় দেবী দুর্গা নয়, বরং যে গর্ভধারিণী মায়ের জঠরে মানুষের জন্ম, যাঁর পরম স্নেহে সন্তান বেড়ে ওঠে, সেই মায়ের অসীম ত্যাগ ও জীবনযাত্রার চিত্র ভেসে উঠেছে মণ্ডপের দেয়ালগুলোতে।
মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে তুলে ধরা হয়েছে বিশেষ কিছু বার্তা ও উপদেশবাণী। সেখানে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, মায়ের নির্দেশিকা ও পরামর্শ মেনে যেন সন্তানরা পথ চলে। বিশাল ও বৈচিত্র্যময় এ মণ্ডপটি দাঁড় করাতে সময় লেগেছে প্রায় তিন মাস।
আয়োজকেরা জানান, প্রথম দুই মাস খোলা মাঠে আলাদাভাবে কাজ করার পর শেষ এক মাস ধরে আমলাপাড়ার মণ্ডপে দিন-রাত পরিশ্রম করে পুরো মণ্ডপ সাজিয়ে তোলা হয়েছে।
আমলাপাড়া সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির কোষাধ্যক্ষ সানি সাহার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা প্রতিবছর নতুন কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করি, এবারও সেই চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমরা আনন্দঘন পরিবেশে পুরো পূজা উদযাপন করতে পারব বলে আশাবাদী। আমাদের শহর সম্প্রতির শহর, আমাদের মণ্ডপের পাশেই একটি মসজিদ এবং মাদ্রাসা রয়েছে।

আমরা এভাবে পাশাপাশি অবস্থানেই আমাদের দুর্গাপূজা করে আসছি। পূজার সময় তারাও আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করে থাকেন। আমরাও নামাজের সময়ে বাদ্য বাজনা বন্ধ রাখি, তাদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ের সুযোগ করে দেই। এভাবেই আমাদের পারস্পারিক সম্প্রীতির মাধ্যমেই সবকিছু হয়ে আসছে বছরে পর বছর। আমাদের এখানে পুরো মণ্ডপসহ আশ পাশের এলাকাগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। সরকার থেকে দেওয়া পুলিশ ও আনসার সদস্যের পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব প্রায় দেড়শ’ স্বেচ্ছাসেবী রয়েছে।
বন্ধুদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরেছেন নিতাইগঞ্জের বাসিন্দা দীপ্ত দেবনাথ। তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমলাপাড়া পূজামণ্ডপ অনেক পুরাতন, ছোটবেলা থেকেই পূজার সময় এখানে আসি। এ পূজামণ্ডপে সবসময়ই ব্যতিক্রম কিছু করে। আমাদেরও দেখার আগ্রহ থাকে। এ বছরও ভিন্নভাবে সাজিয়ে তুলেছে তাদের পূজামণ্ডপ। মায়ের চিত্রের সাথে কিছু শিক্ষণীয় বার্তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বাহিরের আলোকসজ্জাও বেশ ভালো হয়েছে।
আমলাপাড়া পূজামণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রবীর কুমার সাহা বলেন, নারায়ণগঞ্জের এ ঐতিহ্যবাহী মণ্ডপে ১৪৪ বছর ধরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এ মণ্ডপে পূজা শুরু করেছিলেন। প্রতি বছর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার পাশাপাশি আমরা বিশেষ কিছু থিম নিয়ে কাজ করি। এরই ধারাবাহিকতায় এবার আমরা মাতৃত্বের প্রতি সম্মান জানাতে ‘মা’ থিম বেছে নিয়েছি। আমাদের মণ্ডপে মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন আমাদের সার্বিকভাবে সহায়তা করছে এবং নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করেছে। এই সহযোগিতার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কৃত্রিমতার ভিড়ে শিকড়কে ছোঁয়ার এ ব্যতিক্রমী প্রয়াস দেখতে হাজারো দর্শনার্থীর ঢল নামছে আমলাপাড়ার এ গলিতে। আলোকোজ্জ্বল নগরীতে মায়ের ভালোবাসার এই অনন্য বার্তা দর্শনার্থীদের হৃদয়ে আলাদা এক আবেগের সুর বাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









