তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রিপাবলিকানদের আধিপত্যের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী সাফল্যের আশা দেখছেন ডেমোক্র্যাটরা।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অঙ্গরাজ্যজুড়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে কোনো পদে যেতে পারেননি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পও টেক্সাসে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
তবে আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটির একটি মার্কিন সিনেট আসন ও গভর্নর পদে লড়াইকে ঘিরে পরিস্থিতি এবার ভিন্ন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের জন্য এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থের পক্ষে অবস্থান এবং রাজনৈতিক বিভেদ কমিয়ে ঐক্যের আহ্বান—এই তিন বিষয়কে সামনে রেখে তিনি ভোটারদের আকৃষ্ট করছেন। ফলে দেশজুড়ে আলোচিত সিনেট নির্বাচনগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে টেক্সাসের এই লড়াই।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান প্রার্থী ও অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন তালারিকো। জরিপে তালারিকোর সমর্থন ৫০ শতাংশ এবং প্যাক্সটনের ৪৭ শতাংশ। তবে জরিপের সম্ভাব্য ত্রুটিসীমার বিবেচনায় ব্যবধানটি খুব বেশি নয়।
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউমাস লওয়েল) আরেকটি জরিপে দুই প্রার্থীর সমর্থন সমান দেখা গেছে।
প্রেসবিটেরিয়ান ধর্মতত্ত্বে অধ্যয়নরত তালারিকো ট্রাম্পের প্রতি হতাশ স্বতন্ত্র ভোটার ও রিপাবলিকানদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান তিক্ত বিভাজনের চেয়ে টেক্সাসের মানুষের মধ্যে মিলই বেশি।
তালারিকো বলেছেন, ‘আমি সব সময় যেকোনো রাজনৈতিক দলের আগে টেক্সাসকে প্রাধান্য দেব।’
অন্যদিকে প্যাক্সটনের পক্ষে জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন ট্রাম্প। সম্প্রতি সান আন্তোনিওতে এক সমাবেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, সিনেটের আসনটি হারালে রিপাবলিকানদের সামান্য ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিপদে পড়তে পারে।
তালারিকোকে ব্যঙ্গ করে ‘তালাফ্রিকো’ নামে অভিহিত করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত আবার উন্মুক্ত করে দিতে চায়।
ট্রাম্প বলেন, ‘কংগ্রেসে এটি বড় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াবে, কারণ সেখানে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। আমরা এমনটা হতে দিতে পারি না।’
প্যাক্সটনের বিতর্কিত অতীত
রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের একটি বড় কারণ কেন প্যাক্সটনের বিতর্কিত অতীত। এ কারণেই দলটির কয়েকজন নেতা আশঙ্কা করেছিলেন, তাকে প্রার্থী করা হলে সিনেটের আসনটি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
প্রাথমিক নির্বাচনে বর্তমান সিনেটর জন কর্নিনকে হারিয়ে প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কর্নিনকে ঘিরে রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিরোধের পর প্যাক্সটন দলীয় মনোনয়ন পান।
২০২৩ সালে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে টেক্সাসের রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন প্যাক্সটন। তবে পরবর্তী সময়ে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
এদিকে, ঘটনাটিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ড্যান কগডেল। প্যাক্সটনের অভিশংসন-সংক্রান্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় তার পক্ষে লড়াই করা এই আইনজীবী পরবর্তী সময়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী তালারিকোকে সমর্থন দিয়েছেন।
সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত বছরের শেষ দিন প্যাক্সটন দুবাইয়ে এমন দুই মার্কিন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা খাতে কথিত জালিয়াতির অভিযোগে মামলা রয়েছে। ওই দুই ব্যবসায়ীই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
তবে এসব বিতর্কের পরও ট্রাম্প-সমর্থক রক্ষণশীল ভোটারদের একটি অংশের কাছে প্যাক্সটনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ প্রার্থীকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও তাকেই সমর্থন দেওয়ার কথা বলছেন।
ট্রাম্পের সান আন্তোনিওর সমাবেশে ৫৮ বছর বয়সী মার্ক অ্যাপোন্টে এএফপিকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় না তিনি সবচেয়ে ভালো প্রতিনিধি। তবে এই মুহূর্তে আমাদের সামনে যে বিকল্প দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে তিনিই সেরা।’
তিনি বলেন, জননিরাপত্তা ও খ্রিষ্টানদের অধিকার রক্ষাসহ নিজের পছন্দের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে প্যাক্সটনকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেন তিনি।
ট্রাম্পের ভোটার জোটে ফাটলের ইঙ্গিত
প্যাক্সটনের ব্যক্তিগত বিতর্কের বাইরেও অভিবাসননীতি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছেন ডেমোক্র্যাটরা।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেক্সাসে ট্রাম্পের বড় জয়ের পেছনে লাতিনো ভোটারদের কাছ থেকে পাওয়া উল্লেখযোগ্য সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে মেক্সিকো সীমান্তসংলগ্ন অঙ্গরাজ্যটির দক্ষিণাঞ্চলে তিনি আগের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
তবে এখন সেই ভোটারদের একটি অংশ নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন।
অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং নির্মাণ ব্যবসার মালিক বেনি মেলেন্দেজ ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী অভিযানে তার ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মেলেন্দেজ এএফপিকে বলেন, ‘আমার কাজ, মুনাফা ও কর্মীসংখ্যা—সবই অর্ধেকে নেমে এসেছে।’
অভিবাসন অভিযান ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক এবং পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনাও তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে বলে জানান তিনি।
টেক্সাস, কানসাস ও ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের গবাদিপশু শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও সতর্ক করেছে, অভিবাসনবিরোধী অভিযান কৃষি ও পশুপালন ব্যবসায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। এর ফলে বৈধভাবে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে এবং গরুর মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
লাতিনো জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইউনিদোসইউএসের মে মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া টেক্সাসের প্রতি পাঁচজন লাতিনো ভোটারের একজন সুযোগ পেলে এবার আর তাঁকে ভোট দেবেন না।
গভর্নর নির্বাচনেও বাড়ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের এই অসন্তোষ গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করে তুলেছে।
টেক্সাসের তিন মেয়াদের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবার অপ্রত্যাশিতভাবে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা জিনা হিনোজোসা।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটকে প্রচারের প্রধান বিষয় করেছেন হিনোজোসা। ডেমোক্র্যাটদের প্রচলিত ভোটারগোষ্ঠীর বাইরেও সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
মেলেন্দেজের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রতি হতাশাই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পকে পছন্দ করতাম বলে তাকে ভোট দিইনি। বাইডেনকে শাস্তি দিতেই ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলাম। আর এবার একই কারণে ট্রাম্পকে শাস্তি দিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেব।’
সূত্র: এএফপি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









